খ্রীষ্টের জন্মদিনের উত্সব, যাকে প্রায়ই শীতের সময়ের ইস্টার বলে মনে করা হয়ে থাকে, তা আজ রাশিয়ার সমস্ত অর্থোডক্স খ্রীষ্টান ধর্মে বিশ্বাসীরা পালন করছেন. সাত তারিখের ভোর রাত থেকেই রাশিয়ার সমস্ত অর্থোডক্স গির্জায় উত্সবের প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়েছে. প্রধান বড়দিনের প্রার্থনা হয়েছে মস্কোর ক্রাইস্ট দ্য সেভিয়্যরের গির্জায় ও তাঁতে পৌরহিত্য করেছেন রাশিয়ার অর্থোডক্স গির্জার প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল.

দেশের সবচেয়ে বড় ক্যাথেড্রাল – ক্রাইস্ট দ্য সেভিয়্যরের গির্জায় একসঙ্গে প্রার্থনা করতে পারেন প্রায় দশ হাজার লোক, আর সেখানে রাতের প্রার্থনা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই ভর্তি ছিল ধার্মিক জনতার ভীড়ে. গির্জার বছরের এক প্রধান উত্সবে অংশ নিতে শুধু মস্কো শহরের বাসিন্দারাই আসেন নি, বরং যোগ দিয়েছেন রাশিয়ার অন্য বহু শহর থেকে আসা মানুষরা ও এমনকি কাছের ও দূরের দেশ গুলি থেকে আসা লোকরাও. বড়দিনের উত্সব আমাদের সকলকেই ঐক্যবদ্ধ করে – এই রকমের কথা বলে সমস্ত উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে রাশিয়ার অর্থোডক্স ধর্মের প্রধান কিরিল বলেছেন:

“এই উত্সব আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে – বেথলেহেম শহরে ঈশ্বরের পুত্র ও মানব সন্তান ভগবান যীশু খ্রীষ্টের জন্ম হয়েছিল – যিনি এই বিশ্বের পরিত্রাতা. একটি মাত্র কথা ত্রাণকর্তা আমাদের সামনে তাঁর জন্মের রহস্য উন্মুক্ত করে, তাঁর বিশ্বে আগমন ও তাঁর কর্মের লক্ষ্যকেও. ত্রাণ করা – এটা সেই কাজ, যা প্রত্যেক মানুষই জীবনের বিভিন্ন অবস্থায় স্বপ্ন দেখে থাকে. ভগবান আমাদের উদ্ধার করতে এসেছিলেন. আর তাঁর ত্রাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে মুখ্য হল যে, তিনি আমাদের মন্দকে জয়ের শক্তি দেন, আর তার মানে হল যে, ভগবানের রাজ্যকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া”.

ধর্মীয় কর্মীরা এই দিনে অন্যান্য বড়দিনের ঐতিহ্য মেনেই সাদা ও সোনালী রঙের পোষাক পরে ছিলেন, ফার গাছ ও ধূপের গন্ধ ছিল বাতাসে, ফার গাছের গন্ধ ভেসে আসছিল গির্জার চারপাশের সার দিয়ে থাকা ফার গাছ গুলি থেকেই, গির্জার ভিতরে হয়েছে উত্সব উপলক্ষে ধর্মীয় সঙ্গীতের বৃন্দগান... এক অবর্ণনীয় আনন্দের পরিবেশ এই প্রার্থনার সময়ে বিশ্বাসীদের উজ্জ্বল চোখকে যেন পরিপূর্ণ করে দিচ্ছিল. এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় উত্সব, যা আমি প্রত্যেক বছরই পালন করে থাকি, সে আমি যেখানেই থাকি না কেন, এই রকম কথা বলে আমাদের সঙ্গে নিজের ধারণা ভাগ করে নিয়েছেন এক উপস্থিত মহিলা, যিনি নিজের নাম বলেছেন ভগবানের দাসী লিউবোভ বলে:

“আমি যতদূর নিজের ছেলেবেলা মনে করতে পারি, আমরা সব সময়েই বড়দিনের উত্সব পালন করেছি. সব সময়েই বড়দিনের উপলক্ষে ফার গাছ সাজিয়েছি, আর এই দিনে পেয়েছি অনেক উপহার. আমার প্রথম উপহার মনে পরে ছোটই ছিল. ফার গাছের নীচে রাখা ছিল ছোট শীতের জুতোর মত জিনিষের মধ্যে ছিল অনেক লজেন্স ও টফি. মনে করতে পারি এখনও যে, আমরা তখন গান গেয়েছিলাম আবার প্রার্থনাও করেছিলাম একসাথে”.

রাশিয়ার অর্থোডক্স বিশ্বাসীদের সাথে শিশু খ্রীষ্টের জন্মদিন পালন করেছেন বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থোডক্স খ্রীষ্টানরাও, যাঁরা এখনও পুরনো জুলিয়ান পঞ্জিকা মতেই এই দিনকে পালন করেন. তাদের মধ্যে রয়েছে সের্বিয়ার, জেরুজালেম ও জর্জ্জিয়ার গির্জাও. তবে এই কথাও সত্য যে, রাশিয়াতে ত্রাণ কর্তার জন্ম দিন উপলক্ষে প্রার্থনা হয়েছে অন্যান্য খ্রীষ্টান ধর্ম মতের গির্জাতেও সেই ২৫শে ডিসেম্বরে, যাঁরা রোমান গ্রেগোরিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী মানেন.

মস্কো শহরে উত্সবের প্রার্থনা হয়েছে বিশ্বের এক প্রাচীনতম অর্থোডক্স গির্জা অ্যান্টিওখ গির্জাতেও. রাজধানীর এর বাসিন্দা ভ্লাদিমির তিনি জন্ম সূত্রে আর্মেনিয়ার লোক হলেও নিজের জন্যই অভাবনীয় ভাবে এই গির্জার এক নিয়মিত সেবক হয়ে গিয়েছেন. তিনি বলেছেন যে, আমি মনে করি না যে, এটা একটা অন্য কোনও গির্জা, আমার এটা খুব মনের কাছের মন্দিরের মতই, তাই তিনি যোগ করেছেন:

“এই গির্জায় আমি বোধহয় ভগবানের ইচ্ছাতেই এসে পৌঁছেছি. এখানে ১৯৯২ সালে নিজের মেয়েকে খ্রীষ্ট ধর্মে উপনয়ন করেছিলাম. তারপরে নিজেরা মস্কোতেই পাকাপাকি ভাবে থাকতে চলে আসি. আর একদিন স্রেফ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, যেন পা নিজে থেকেই আমাকে এই দিকে টেনে নিয়ে এসেছিল. শনিবারের সন্ধ্যা ছিল, তখন প্রার্থনার পরে গির্জার প্রধান পোপ সেবকদের ধর্মের কথা শোনাচ্ছিলেন. আমি এসেছিলাম মনে অনেক প্রশ্ন নিয়ে, যেই গুলি নিয়ে আমি কোন উত্তরই খুঁজে পাচ্ছিলাম না. আর নিজের সেই ভাষণে পোপ আমার সমস্ত প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছিলেন, যা আমাকে তখন রীতিমত কষ্টের মধ্যেই ফেলেছিল. আমি এর আগেও অনেক গির্জায় গিয়েছি, কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি যে, এই গির্জাতেই – আমার জন্য জায়গা রয়েছে আর তাই এবারেও এখানে এসেছি এই মহান উত্সব পালন করতে”.

রাশিয়াতে বড়দিনের সঙ্গে শুরু হয়েছে পবিত্র দিন গুলির. এই দিন গুলি হল আনন্দের, নানা রকমের হাসি খুশীর, আত্মীয় বন্ধুদের বাড়ীতে আনাগোনার সময়. এটা চলবে ১২ দিন ধরে আর শেষ হবে ঈশ্বরের উপনয়নের দিনে সেই ১৯শে জানুয়ারীতে, যখন আবারও রাশিয়ার অর্থোডক্স গির্জায় এই কারণে উত্সব করা হবে.