সিরিয়ার সঙ্কট আরও এক বছরের জন্য বেড়ে গিয়েছে. ২০১১ সালের বসন্তে প্রথম সেই দেশে রাজনৈতিক সংশোধনের দাবীতে মিছিল হয়েছিল, যা খুবই দ্রুত বেড়ে চরমপন্থী বিরোধী পক্ষের দিক থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহে বাস্তবে গৃহযুদ্ধের দিকেই চলে গিয়েছে. গত ১২ মাসে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয়ের মধ্যে একটি অন্যতম ছিল সিরিয়ার সঙ্কট.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার মন্তব্য যে, সিরিয়ার জনগনের সমস্ত দুর্দশার অন্ত হবে রাষ্ট্রপতি বাশার আসাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই, তা শুনতে লেগেছে একটা হুমকিরই মত. যে রকম – হয় সিরিয়ার লোকেরা পশ্চিমের কাছে নত হতে না চাওয়া আসাদের থেকে বাদ চলে যাবে, অথবা তাদের কষ্ট পেতে হবে. নিজেদের হুমকি পশ্চিম কিন্তু কার্যকরী করেই চলেছে – তারা সিরিয়ার বিরুদ্ধে এই অঘোষিত যুদ্ধে নিজেদের জোটের সঙ্গীদের নিয়ে বিদ্রোহীদের হাতে অবাধে তুলে দিচ্ছে গ্রেনেড লঞ্চার, মেশিনগান, আর এখন আবার সঙ্গে জুড়েছে মোবাইল রকেট লঞ্চার. ভাড়া করে আনা সৈন্যদের জন্য অর্থেরও কোনও অভাব নেই. অর্থাত্ সবই হচ্ছে লিবিয়াতে যুদ্ধ শুরুর আগে যা হয়েছিল, সেই রকমই.

মস্কো শহরে একাধিকবার ঘোষণা করা হয়েছে যে, লিবিয়ার চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি করতে দেওয়া হবে না. সিরিয়ার নিকট ও সুদূরের প্রতিবেশীরা এই দেশকে সঙ্কট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সাহায্য করতে বাধ্য, তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নয় যে, কি করে তাদের পরবর্তী কালে বেঁচে থাকতে হবে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন:

“নিজেদের দেশের ভাগ্য সেই দেশের লোকদেরই ঠিক করা দরকার. বাইরের দেশের ক্রীড়নকদের উচিত্ হবে খুবই যত্ন নিয়ে কাজ করা, আলোচনাকে উত্সাহ দেওয়া উচিত্, কোন রকমের প্রেসক্রিপশন হাতে ধরিয়ে দেওয়া নয়. এই অর্থে লিবিয়ার সঙ্কট, লিবিয়ার মডেল আমাদের জন্য এক ধরনের উদাহরণ স্বরূপ হয়েই রয়েছে. আমরা মনে করি যে, এই ধরনের অবস্থান থেকে অন্য পরিস্থিতির দিকে আসা, প্রাথমিক ভাবে সিরিয়ার দিকে আসা একেবারেই চলতে পারে না”.

রাশিয়া ও চিন সরাসরি সামরিক অনুপ্রবেশের প্রচেষ্টায় সবুজ সঙ্কেত দেওয়ার মতো রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে তিন বার ভেটো প্রয়োগ করেছে. ভেটো প্রয়োগের পরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়েছিল এবং এমনকি বলা হয়েছিল যে, রাশিয়া আসাদকে সমর্থন করে বিরোধকে দীর্ঘায়িত করছে. “কেন রাশিয়া রক্তাক্ত প্রশাসনকে সমর্থন করছে”? – মস্কোর দিকে এই প্রশ্ন একাধিকবার করা হয়েছে. বছরের শেষে এক ফলাফল নিয়ে করা সাংবাদিক সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন আবারও ব্যাখ্যা করেছেন – রাশিয়া উদ্বিগ্ন আসাদের ভাগ্য নিয়ে নয়, বরং, তাই নিয়ে যে, তার পতনের পরে এই দেশে কি হতে চলেছে, এই কথা উল্লেখ করে ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন:

“আমরা স্রেফ চাই না যাতে আজকের বিরোধী পক্ষ, প্রশাসনে এসে, বর্তমানের প্রশাসনের সঙ্গে লড়াই শুরু করুক, যারা তখন বিরোধী পক্ষে পরিণত হবে, আর যাতে এটা অনন্তকাল ধরে চলতে না থাকে. আমাদের অবশ্যই আগ্রহ রয়েছে এই এলাকায় রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে. কিন্তু তার থেকেও বেশী আগ্রহের বিষয় আমাদের স্বার্থ নয়, যা এমনিতেই সেখানে খুব একটা বেশী কিছু নয়, - আসাদ মস্কোর চেয়ে প্যারিসে ও অন্যান্য ইউরোপের রাজধানী গুলিতেই বেশী গিয়েছেন. আমরা সেই উদ্দেশ্যেই বক্তব্য জানিয়েছি, যাতে এই সমস্যার একটা সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়, যা এই অঞ্চল ও এই রাষ্ট্রকে খণ্ডিত হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে ও গৃহযুদ্ধের অবসান করতে পারে”.

বিরোধের পক্ষ গুলিকে আলোচনাতে ঠেলে দেওয়া – এটাই রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও আরব লীগের সিরিয়ার সঙ্কট নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্ধারিত বিশেষ প্রতিনিধি লাখদার ব্রাহিমির কাজ. এই পদ সৃষ্টি হয়েছিল ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে. তাতে প্রথমে অধিষ্ঠিত ছিলেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রাক্তন মহাসচিব কোফি আন্নান. ছয় মাস পরেই তিনি এই পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন. কোফি আন্নান স্বীকার করেছিলেন যে, এই সঙ্কট সমাধানের জন্য কিছু দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাই কম পড়েছিল.

সিরিয়া নিয়ে কাজের গোষ্ঠীর সম্মেলন একটি দিক পরিবর্তনের উপযুক্ত মুহূর্ত যেমন হতেও পারত, তেমনই তা হওয়াও উচিত্ ছিল, যখন জেনেভা শহরে সেই সমস্ত পক্ষই জমায়েত হয়েছিল, যাদের বলা হয়ে থাকে “বাইরের ক্রীড়নক” বলেই – রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র, তুরস্ক, ইরাক, কুয়েইত, কাতার, ইউরোপীয় সঙ্ঘের প্রধান প্রতিনিধিরা এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও আরব লীগের মহা সচিবরা. তাঁরা সকলেই আহ্বান করেছিলেন সেই দেশে অন্তর্বর্তী কালীণ সরকার গঠনের জন্য, যাতে যেমন বর্তমানের প্রশাসনের প্রতিনিধিরা, তেমনই বিদ্রোহী পক্ষের প্রতিনিধিরাও থাকতে পারবেন. কিন্তু কথা থেকে কাজে সেই যাওয়া হয়ে ওঠে নি.

রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও আরব লীগের বিশেষ প্রতিনিধির পদে কোফি আন্নানের জায়গা নিয়েছেন আলজিরিয়ার প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী লাখদার ব্রাহিমি. তিনিও স্বীকার করেছেন যে, জেনেভা শহরে করা সমঝোতার কোন ব্যতিক্রম হতে পারে না. কিন্তু পশ্চিমে ও কিছু আরব দেশেও কোন আলোচনাই করতে চাওয়া হচ্ছে না, আর চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাজী ধরে হিসাব চালিয়ে যাওয়া, আসাদের প্রশাসনের পতনের আর কত দেরী রয়েছে. এই প্রসঙ্গে আরও বেশী করেই বিশেষজ্ঞরা সেই ধারণাতেই একমত হচ্ছেন যে, এমনকি আসাদ চলে যাওয়ার পরেও এই দেশে পরিস্থিতি এত দ্রুত স্বাভাবিক হবে না. তাই রাজনৈতিক ভাবে সমাধানের পথে এখনই চলা শুরু করা উচিত্.