ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তে কারাকোরাম পর্ব্বতমালার সিয়াচেন হিমবাহের এলাকায় এই বছর অনেকগুলি ট্র্যাজেডির ঘটনায় সমৃদ্ধ ছিল. এপ্রিল মাসে হিমবাহ থেকে নেমে আসা তুষার ধ্বস প্রায় দেড়শো পাকিস্তানী সৈনিকের উপরে চাপা দিয়েছিল. কিছু লোককে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল, আর মারা গিয়েছিল ১৩৭ জন. আবার ১৭ই ডিসেম্বর এই হিমবাহের শিকার হয়েছে ছয় জন ভারতীয় সেনা. এই ট্র্যাজেডি বাধ্য করেছে ভাবিয়ে তুলতে যে, খুবই উঁচু পাহাড়ের উপরে বরফে ঢাকা ও মানুষের বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য এক তুষার মগ্ন এলাকার অধিকার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বহু বছর ধরে চলে আসা সশস্ত্র যুদ্ধের অর্থ কি হতে পারে.

সিয়াচেন হিমবাহ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অঞ্চল নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হয়ে রয়েছে, যা শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই. অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকায় এই সীমান্ত বিরোধ দ্রুত সশস্ত্র যুদ্ধে পর্যবসিত হলেও, বহু বছর ধরেই সিয়াচেন এলাকা ছিল কূটনৈতিক বিতর্কের অঙ্গ মাত্র. এটার কারণ ছিল স্বাভাবিক: শীতের মাস গুলিতে এখানে তাপমান কমেছে প্রায় মাইনাস ষাট ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত ও বরফের স্তরের প্রস্থ হয়েছে ১০ মিটারেরও বেশী. এই জায়গা মানুষের থাকার জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়. তাই ১৯৭২ সালে ভারত ও পাকিস্তান সীমান্ত সংক্রান্ত এলাকা ভাগ করার সময়ে এই হিমবাহের এলাকায় সীমানা একেবারেই নির্দেশ করে নি.

কিন্তু ১৯৮৪ সালেই যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক তীক্ষ্ণ হতে শুরু করেছিল, তখন দুই পক্ষই সিয়াচেনের উপরে নিজেদের অধিকার ঘোষণা করে. এই এলাকায় সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছিল, শুরু হয়েছিল সশস্ত্র লড়াই. এই যুদ্ধ চলেছিল মিশ্র সাফল্য লাভের মধ্য দিয়েই. ১৯৮৬ সালে ভারতের সেনাবাহিনী বান সিংহের নেতৃত্বে এই এলাকায় পাকিস্তানের একটি সীমান্ত চৌকী দখল করে নেয় ও পরে তার নাম দেওয়া হয় বানা সীমান্ত চৌকী. এই পরাজয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তত্কালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো জেনারেল জিয়াউল হককে ব্যঙ্গ করে বোরখা পরার মতো প্রস্তাব দেন.১৯৮৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলির মধ্যে সহযোগিতা সংক্রান্ত আসিয়ান সংস্থার নিয়মিত বৈঠকে পাকিস্তান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা বেনজির ভুট্টো ও রাজীব গান্ধী সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে তাঁদের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন. সিয়াচেন হিমবাহ নিয়ে প্রশ্নও আলোচ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের জন্য. কিন্তু ১৯৯৩ সালে মার্চ মাসে মুম্বাই শহরে সন্ত্রাস কাণ্ডের ফলে আবারও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়. সিয়াচেন হিমবাহের কাছে ও অন্যান্য বিতর্কিত এলাকায় গোলাগুলি চলা অব্যাহতই থাকে.

সিয়াচেন সমস্যার সমাধানে আবার করে চিন্তা শুরু হয়েছে শুধু ২০১১ সাল থেকে, যখন পাকিস্তান ও ভারত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা আবার করে শুরু করে. ইসলামাবাদ ঘোষণা করেছিল নয়া দিল্লীকে ব্যবসার ক্ষেত্রে “সবচেয়ে সুবিধাভোগী দেশ” বলে মেনে নেওয়া হবে কারণ ভারত তার আগেই পাকিস্তানকে সেখান থেকে আসা পণ্যের জন্য বেশ কিছু ব্যবসায়িক বাধা তুলে নিয়েছিল.

সিয়াচেনে ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে হিমবাহ থেকে ধ্বস নামার পরে ও তার ফলে বহু লোকের প্রাণ যাওয়াতে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৯৮৪ সালের আগের মত করে ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত নির্ধারণ করার জন্য আলোচনা শুরু হোক, অর্থাত্ সিয়াচেন অধিগ্রহণের জন্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের অবস্থানে. আর পাকিস্তানের পদাতিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তরের জেনারেল আশফাক পারভেজ কিয়ানি, এই হিমবাহের নীচের এলাকায় পর্যবেক্ষণে এসে আহ্বান করেছিলেন বিরোধের ইতি করার ও এই হিমবাহকে সামরিক শক্তি মুক্ত করার. আর যদিও তিনি এরই সঙ্গে যোগ করেছিলেন যে, এর অর্থ নয় যে, সিয়াচেন সম্বন্ধে পাকিস্তানের অবস্থান পাল্টাবে আর তারই সঙ্গে বেশ কিছু ভারত বিরোধী রাজনৈতিক দল পাকিস্তানে দেশের সরকারকে ও সামরিক বাহিনীকে দেশদ্রোহিতার ও আগে জয়ী হওয়া জায়গা থেকে পিছিয়ে আসার কারণে অভিযোগ করেছিল. এর পরে দেশের পররাষ্ট্র দপ্তর বাধ্য হয়েছিল ব্যাখ্যা করতে: “আমরা সিয়াচেন এলাকা থেকে এক তরফা ভাবে সামরিক বাহিনী ফিরিয়ে নিয়ে যাবো না. আমাদের প্রস্তাব হল দ্বিপাক্ষিক ভাবেই সামরিক বাহিনীর অবস্থান বদল”. রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের মতে ইসলামাবাদের তরফ থেকে কোন ধরনের ছাড়ই বর্তমানে দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ পাকিস্তানে পার্লামেন্ট নির্বাচন এগিয়ে আসছে, যা ২০১৩ সালের শুরুতে হওয়ার কথা রয়েছে.

0ভারত আপাততঃ জেনারেল কিয়ানির প্রস্তাব ব্যবহার করে সিয়াচেন এলাকা সামরিক বাহিনী মুক্ত করার কথা ভাবছে না. তা স্বত্ত্বেও হিমবাহ এলাকাকে সামরিক বাহিনী মুক্ত করা সম্ভবতঃ মনোযোগ দেওয়ার মতো বিষয়. যেমন ভারতেরই একজন রাজনীতিবিদের মতেও মনোযোগ দেওয়া দরকার: সিয়াচেন হিমবাহ দখল করার জন্য ভারত ও পাকিস্তান মোটেও এই নির্জন এলাকাকে শুধু অধিকারের আবেগেই সংঘর্ষে লিপ্ত নয়. কারণটা হল নিজেদের দেশের বিজয়ের ঘোষণা করা ও মৌলিক অস্তিত্বের ঘোষণার ইচ্ছা, যা এই সীমান্ত বিতর্কে জয়ী হতে পারলে করা যাবে.