১৯৭৯ সালের ২৪শে ডিসেম্বর সোভিয়েত দেশের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তরের প্রধান মার্শাল নিকোলাই অগারকভ এক ঘোষণা পাঠ করেন, যেটি অনুযায়ী ২৫শে ডিসেম্বর সোভিয়েত বাহিনী বাধ্য হয়েছিল আফগানিস্তানের সীমান্ত পার হয়ে অনুপ্রবেশ করতে. এই দিন থেকেই শুরু হয়েছিল আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর সামরিক উপস্থিতির হিসাব শুরু. এই বিষয় নিয়ে “রেডিও রাশিয়ার” সমীক্ষক পিওতর গনচারভ লিখেছেন, যিনি ছিলেন এই সমস্ত ঘটনার সাক্ষী ও মনে রেখেছেন কি পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল.

পশ্চিমে, আর এটাও ঠিক যে, পূর্বেরও কিছু জায়গায় মনে করা হয়ে থাকে যে, সোভিয়েত দেশ ভূ রাজনৈতিক অবস্থানের বিরল ব্যতিক্রম বিচার করে শুধু স্বপ্নই দেখেছিল, কি করে আফগানিস্তান দখল করা যেতে পারে. কিন্তু এটা কি সত্যই তাই ছিল.

প্রথমে সোভিয়েত সেনা বাহিনী অনুপ্রবেশ নিয়ে কথা হয়েছিল ১৯৭৮ সালে ডিসেম্বর মাসে, যখন তারাকি ও আমিন এসেছিলেন মস্কো সফরে. তখন লিওনিদ ব্রেজনেভ সঙ্গে সঙ্গেই সোভিয়েত সেনা বাহিনীর আফগানিস্তানে অনুপ্রবেশের যে কোন রকম ধরণকেই বাতিল করে দিয়েছিলেন. তারপরে এই প্রশ্নে আবার ফিরে আসা হয়েছিল ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে, যখন আফগানিস্তানের গেরাট শহরে বিরোধী পক্ষের দলে এক সম্পূর্ণ সেনাদল চলে গিয়েছিল. কিন্তু তখনও ব্রেজনেভ একেবারেই বিপক্ষে বক্তৃতা দিয়েছিলেন. সেই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে হয়েছিল পরিবর্তনের চরম সময়, যখন প্রশাসনের শীর্ষে চড়েছিলেন হাফিজুল্লা আমিন. কিন্তু তখনও বাহিনী পাঠানোর বিরুদ্ধে ছিল সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তর. অবশ্যই আফগানিস্তানের ভূ- রাজনৈতিক বিরল অবস্থান সামরিক বাহিনীর প্রধান ও তাঁর সহকর্মীরা বোঝেন নি এমন নয়. আর তা স্বত্ত্বেও তাঁরা ছিলেন বিরোধী. তাঁরা কি ধরনের যুক্তি ভেবে তখন কথা বলেছিলেন?

সেই সময়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক গোষ্ঠীর উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান কর্নেল জেনারেল লেভ গরিয়েলভ, যিনি বেশ অনেকবার কাবুল থেকে মস্কো উড়ে এসেছিলেন আফগানিস্তান নিয়ে বিশেষ পরিষদের বৈঠকে যোগ দিতে, তাঁর কথামতো, সোভিয়েত সেনা বাহিনী অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে যুক্তি ছিল এই রকমের: প্রথমতঃ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর উপস্থিতি শুধু সামাজিক বিরোধকেই বৃদ্ধি করবে. দ্বিতীয়তঃ, আফগানিস্তানের জাতীয় সেনা বাহিনীর ক্ষমতা ছিল নিজেরাই স্বয়ং সম্পূর্ণ ভাবে যুদ্ধ করার. তিনি বলেছেন:

“১০ ডিভিশন বাহিনী, ৬০০ ট্যাঙ্ক, ৩৫০ যুদ্ধ বিমান, সাড়ে তিন লক্ষ সশস্ত্র সৈন্য, আর তারই সঙ্গে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ছিল আফগানিস্তানের, তাই আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীই এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিল. আমি এখনও তাই মনে করি”.

আরও একটা কারণ ছিল, যা কেন্দ্রীয় দপ্তর উল্লেখ করেছিল এই অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে. আর সেটা হল যে, আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনাবাহিনী উপস্থিত হলে, তা অবধারিত ভাবেই লড়াইয়ের প্রথম সারিতে উপস্থিত হবে ও তাদের যুদ্ধ করতে বাধ্য হতে হবে. আর ঠিক সেটাই হয়েছিল. তাই তাহলে এত জেনেও এই ধরনের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল? এই বিষয়ে ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা ইনস্টিটিউটের সভাপতি কর্নেল জেনারেল লিওনিদ ইভাশভের মত তিনি নিজেই বলেছেন:

“প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর ও সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তরের প্রধানের কাছে দুটি করে আলাদা দলিলের ভাগ ছিল, তার মধ্যে একটি ছিল নীল রঙের – যাতে সোভিয়েত বাহিনী অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে যুক্তি সঞ্চিত ছিল আর অন্যটা ছিল লাল রঙের – তাতে ছিল স্বপক্ষে যুক্তি. এক সময়ে যুক্তির মোট ফলাফল ছিল “প্রায় সমান”. দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধানদের মধ্যে ও কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় পরিষদের নেতৃত্বেও যেমন, তেমনই সামরিক ক্ষেত্রেও অবস্থান নিয়ে দ্বিমত ছিল. কিন্তু এই সব যুক্তির মধ্যে অনুপ্রবেশের “স্বপক্ষের” যুক্তিই শেষ অবধি বিজয়ী হয়েছিল”.

১৯৭৯ সালের শেষে আফগানিস্তানে বড় রকমের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৬টির মধ্যে ১৮টি রাজ্য জুড়েই. আর মস্কোতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল: যদি আমরা এখন আফগানিস্তানে সেনা বাহিনী না পাঠাই, তবে এই আমাদের সঙ্গে মিত্র সুলভ দেশে অবশ্যই বিপর্যয় হবে. তা সত্যই হয়েছিল, তবে সেটা পরে, যখন “শুরাভি” (আফগানিস্তানে সোভিয়েত দেশের লোকদের এই নামেই ডাকা হত)চলে গিয়েছিল.