ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরের সময়ে ও পরে যে সমস্ত মন্তব্য করা হয়েছে, তাতে প্রধান মনোযোগ দেওয়া হয়েছে সামরিক প্রযুক্তি সংক্রান্ত সহযোগিতার ক্ষেত্রে. এই নিয়ে বলার কিছু নেই – এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, কিন্তু শুধু সামরিক প্রশ্নেই সহযোগিতা শেষ হয়ে যাচ্ছে না.

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, যা এই সফরের সময়ে স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা অবশ্যই করা হয়েছে সামরিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে – তাদের মিলিত মূল্য প্রায় তিনশো কোটি ডলারের সমান, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এটা কোন গোপন খবর নয় যে, বিগত বছর গুলিতে এই ক্ষেত্রে প্রচুর জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে. এখানে যথেষ্ট হবে ভারতের পক্ষ থেকে ফরাসী যুদ্ধবিমান “রাফালে” নির্বাচনের প্রসঙ্গ ও জাতীয় টেন্ডার থেকে রুশ “মিগ” যুদ্ধবিমানের বাদ পড়া অথবা এখনও অবধি রাশিয়ার বিমানবাহী জাহাজ “অ্যাডমিরাল গর্শকভ” (এখন যেটিকে ভারতবর্ষে নাম দেওয়া হয়েছে “বিক্রমাদিত্য”) চুক্তি অনুযায়ী হস্তান্তর করা নিয়ে সমস্যা সম্বন্ধে. অনেক পর্যবেক্ষকই বলে উঠেছিলেন, যে ভারতের বাজার থেকে রাশিয়াকে পশ্চিমের থেকে অস্ত্র আমদানী দিয়ে হঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেই. সব দেখে শুনে মনে হয়েছে এই সফরের শেষে যে, সেই সব বিশেষজ্ঞরা একটু নিজেদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বড্ড তাড়াহুড়োই করে ফেলেছিলেন”.

এই সফরের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য – পারমানবিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে এহ বাহ্য ধরনের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি. পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র কুদানকুলামের প্রথম রিয়্যাক্টর বাস্তবে কাজ করার জন্য তৈরী রয়েছে. দ্বিতীয় রিয়্যাক্টরের কাজও শতকরা নব্বই ভাগ শেষ হয়েছে. পারমানবিক ক্ষেত্রে পরবর্তী উন্নতির বিষয়ে কোন রকমের শর্তহীণ আশাবাদী মন্তব্য শুনতে পাওয়া গিয়েছে দুই দেশের নেতাদের কাছ থেকে. এখনই খুব নিকট ভবিষ্যতে নতুন পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরীর কাজ শুরু হওয়া দরকার, যা তৈরী করা হয়েছে সবচেয়ে নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে এবং য়া ভারতের বিদ্যুতের চাহিদাকে সম্পূর্ণ ভাবেই মেটাতে সক্ষম. এই আশাবাদের সাক্ষ্য হতে পারে ভারতীয় আইন সংক্রান্ত সমস্ত সমস্যা সমাধান বা প্রায় সমাধান, যা পারমানবিক ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের উপরে প্রয়োগ করা হয়েছিল. মনে করিয়ে দিই যে, এই আইন গৃহীত হয়েছিল ২০১০ সালে, আর কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের তৃতীয় ও চতুর্থ রিয়্যাক্টর সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছিল তার চেয়ে দুই বছর আগে. তাই খুবই বিস্ময়কর লেগেছিল ভারতীয়দের পক্ষ থেকে এই আইনের প্রসার আগে হওয়া চুক্তির উপরে করতে চাওয়া.

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা খুব কমই পর্যবেক্ষকের চোখে পড়েছে তা উচ্চ প্রযুক্তি বিষয়ে সহযোগিতার প্রশ্নে সম্মতি. ভারতকে রাশিয়ার বহু লোকই সেই সব বাঁধা ধরা ধারণার সঙ্গে জুড়ে নেন, যেমন চা, ভারতীয় সিনেমা, ভারতীয় নৃত্য, হাতি, যোগ ব্যায়াম ইত্যাদি... এই সবই ভাল, কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, ভারত প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও একটি অত্যন্ত উন্নত রাষ্ট্র, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর ভারত সফরের আগে “দ্য হিন্দু” পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে, রুশ- ভারত সম্পর্কের গোড়ায় রয়েছে “বিজ্ঞান প্রযুক্তি সংক্রান্ত ক্ষেত্রে সহযোগিতায় আরও গভীরে প্রবেশ, যৌথ উত্পাদিত পণ্যের বিশ্ব বাজারে প্রচার, পরবর্তী কালে উচ্চ অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্য যুক্ত পণ্যের বিনিময়ের পরিমান বৃদ্ধি”. এখানে প্রধান বাক্য – “বিজ্ঞান সমৃদ্ধ ক্ষেত্র”, “যৌথ উত্পাদিত পণ্য”, “উচ্চ অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্য যুক্ত পণ্য”. অর্থাত্ এখানে কথা হচ্ছে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতায় সমানাধিকারের. এটা দিক নির্দেশ ব্যবস্থা গ্লোনাসস, বহুকর্মক্ষম যুদ্ধ বিমান ও বহুমুখী পরিবহন বিমানের নির্মাণ, রাশিয়া ও ভারতের নির্মাতাদের যৌথ ভাবে তৈরী করা যুদ্ধজাহাজ বিধ্বংসী রকেট ব্যবস্থা “ব্রামোস””.

রাশিয়া ও ভারতের সহযোগিতা বর্তমানের খুবই জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে একটি স্থিতিশীলতার কারণ হয়েছে. রাষ্ট্রপতি পুতিন নিঃশর্ত ঘোষণা করেছেন ভারতের তরফ থেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় সম্পূর্ণ সদস্য পদ পাওয়ার সমর্থনে, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আজ, যখন আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো জোটের সৈন্যদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুই বছরের চেয়েও কম সময় রয়েছে, আর এই দেশ এক অস্থিতিশীলতার কেন্দ্র হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে, তখন খুবই তীব্র ভাবে আঞ্চলিক দেশ গুলির আফগানিস্তানের যুদ্ধ পরবর্তী নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভূমিকা বৃদ্ধির কথা উঠেছে. আর এই ক্ষেত্রে রাশিয়া ও ভারত, একই সঙ্গে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অন্যান্য সহকর্মী দেশ গুলির সঙ্গে এক সমাধান মূলক ভূমিকা নিতেই পারে, যাতে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি আবার সেই নব্বইয়ের দশকের মতো “সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধে” পরিণত না হতে পারে”.

রাশিয়া ও ভারতের সহযোগিতা সব রকমের ক্ষেত্রেই সত্যিকারের শক্তি কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, যা সেই এক কেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা ও “নিয়ন্ত্রণ যোগ্য মাত্স্যান্যায়ের” ধারণা, যা আমেরিকার স্ট্র্যাটেজির রূপকাররা প্রচার করছেন, তার সত্যিকারের এক বিকল্প. এই রকমই মনে করেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.