মহিলাদের উপরে অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ভারতে আজ দ্বিতীয় সপ্তাহ কিছুতেই কমছে না. শুধু যে কমছে না তাই নয়, বরং তা মনে হচ্ছে আরও বেশী করেই জ্বলে উঠছে. দিল্লী শহরে বাস্তবিক ভাবেই মেট্রো রেলের কাজকর্ম পঙ্গু হয়ে গিয়েছে, নয়া দিল্লী শহরের প্রধান সড়ক গুলি বন্ধ করে রাখা হয়েছে. সমাবেশ- মিছিল হঠানোর জন্য পুলিশ জলের কামান দাগছে ও টিয়ার গ্যাস চার্জ করছে. ইতিমধ্যেই প্রথম হতাহতের খবর আসতে শুরু করেছে – মনিপুর রাজ্যে এক মিছিলের সময়ে এক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন. আর রবিবারে দিল্লীতে সমাবেশের সময়ে সংঘর্ষে আহত পুলিশ কর্মী মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালে মারা গিয়েছেন.

খুবই কঠিন হয়, সেই সব ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করার, যখন তার কারণ হয় মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি. শুধু সেই ২৩ বছর বয়সের ছাত্রীর জন্য সাহস, ধৈর্য্য ও দ্রুত আরোগ্যের কামনাই করা যেতে পারে.

কিন্তু যা ঘটেছে, তা ভারতেরই সমাজের সামনে বহু বেদনাদায়ক প্রশ্নই উপস্থিত করেছে, যার উত্তর দীর্ঘকাল ধরে ও খুবই পরিশ্রম করেই খুঁজতে হবে, কিন্তু যে উত্তর দিতেই হবে.

কারণ এই ধর্ষিতা যুবতী, যে দিল্লী শহরের বাসে এক সপ্তাহ আগে আক্রান্ত হয়েছিল একদল লোচ্চা লোকের হাতে, - সে মোটেও একটা একক ঘটনার শিকার নয়. ভারতের মন্ত্রীসভার তথ্য অনুযায়ী, যা “স্কাই নিউজ” সংস্থা উদ্ধৃত করেছে, ভারতে ধর্ষণ ঘটছে গড়ে প্রতি কুড়ি মিনিটে একটি করে. শুধু দিল্লী শহরেই গত বছরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৬৬১ টি – আর এটা শুধু নথিবদ্ধ ঘটনারই সংখ্যা. আর অনেক বেশী করেই রয়েছে সেই ধরনের ঘটনা, যখন ধর্ষিতা তাঁর পরিবারের লোকজনকেই ধর্ষণের কথা জানাতে লজ্জা পেয়েছে. শুধু ২০১১ সাল ধরেই মহিলাদের উপরে অত্যাচার সংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার. সম্ভবতঃ নিষ্ঠুরতা ও অবজ্ঞা, যা দেখিয়ে দিল্লীতে এবারে ধর্ষণ করা হয়েছে, তা সকলের সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে, আর সমস্ত ক্রোধ ও বিরক্তি দেশের রাস্তায় নেমে পড়েছে.

কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নেরও উদয় হয়: কার জন্য এই ধরনের প্রাথমিক ভাবে শান্তিপূর্ণ মিছিল – মিটিং, যা অত্যাচারের প্রতিবাদে সরকারের দায়িত্বে অবহেলার প্রতি ধিক্কারে যুবক, যুবতী ও নানা আরও বিভিন্ন বয়সের মানুষ করেত এসেছিলেন, সেই গুলিকে রণক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে? কারণ কোন গোপনীয় তথ্য তো নেই, যদি বলা হয় যে, এই ধরনের জনসমাবেশকে প্রায়ই খুব কায়দা করে সেই সমস্ত শক্তিরা ব্যবহার করে থাকে, যাদের আসলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ভাগ্য নিয়ে একেবারে কোন রকমেরই চিন্তা নেই. মনে হয়েছে. এই ক্ষেত্রে এই রকমেরই কিছু একটা হয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এটা সরকারের পক্ষ থেকে খুবই ভরসাযোগ্য নয়, এমন সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ঘটছে. ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ গণ বিক্ষোভের শুরু হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পরেই শুধু প্রথম জাতির উদ্দেশ্যে আহ্বান করেছেন শান্ত হতে ও আশ্বাস দিয়েছেন ন্যায় বিচার করে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার. ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী মহিলা – সোনিয়া গান্ধীর – সময় লেগেছে প্রায় ততটাই, যাতে বিক্ষোভে রত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়. তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, বিক্ষোভের এই ঢেউ কাজে লাগছে শুধু বিরোধী পক্ষের জন্যই, যারা সরকারের দিশেহারা অবস্থায় ভাল করেই রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করছে”.

আরও একটি সমস্যা রয়েছে. গণতান্ত্রিক সংশোধনের জন্য জোটের গবেষণা অনুযায়ী, রাজনৈতিক দল – যেমন ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, তেমনই প্রায় সমস্ত বিরোধী দলও – এই প্রশ্ন বাস্তবে তাচ্ছিল্যই করেছে. অন্ততঃ, অন্য সময়ে, যখন এই সমস্যার প্রতি সমাজের দৃষ্টি এত বেশী করে নিবদ্ধ ছিল না. এই জোটের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন কম করে হলেও ২৬০ জন প্রার্থী, যাদের জীবনের ইতিহাসে মহিলাদের নিয়ে অত্যাচার বা অন্যায়ের বিষয়ে বাস্তব তথ্য রয়েছে. বর্তমানে কর্মরত বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা সদস্যদের মধ্যে ছয়জনের নামে ধর্ষণের অভিযোগ ছিল, আরও ৩৬ জন – মহিলাদের সঙ্গে অন্য অত্যাচার করেছেন. এখানে আবারও বলবো যে, এই সদস্যরা বা প্রার্থীরা বাস্তবে প্রায় সমস্ত রাজ্যেরই বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক দলের লোক. এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিফলিত হয়েছে ভারতীয় সমাজের এক অতি গভীর পারস্পরিক বিরোধের চিত্রই – তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“একদিকে ভারতই বিশ্বকে উদাহরণ জুগিয়েছে, কি করে মহিলারা রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার উপযুক্ত হতে পারেন শুধু পুরুষদের সঙ্গে সমানেই নয়, বরং অনেক সময়েই তাদের চেয়ে অনেক উঁচু অবস্থানে থেকে – আর তা দেশের স্তরেও সব মিলিয়ে দেখা গিয়েছে, যেমন দেখা গিয়েছে আলাদা করে রাজ্য স্তরেও. অন্যদিকে এই সমাজই নিত্য নৈমিত্তিক জীবনে সর্ব স্তরে খুবই গভীরে প্রোথিত পুরুষ প্রাধান্যের পরিচয়ে চিত্রিত হয়েছে”.

এখন ভারতে অনেকেই এই অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দাবী করেছেন – একেবারে মৃত্যুদণ্ড অবধি. তাদের উদাহরণ হওয়ার মতো শাস্তিরও প্রয়োজন রয়েছে. কিন্তু যদি বহু পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার জন্য প্রার্থী, যাদের নিজেদের জীবনেই এই ধরনের গুরুতর অপরাধের ইতিহাস থাকে, তাদের একেবারেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হয়, তবে এমনকি সবচেয়ে কঠিন শাস্তিও মহিলাদের প্রতি গণ অত্যাচারের লজ্জাজনক বাস্তবের কোন ইতি টানতে পারবে না.