রাশিয়া এক বিশাল দেশ যেখানে প্রায় দুশো প্রজাতির মানুষ বাস করেন. এখানে বিদেশী লোকরাও থাকেন: তাঁরা এখানে কাজ করেন, পড়াশোনা করেন ও কখনও বিবাহ সূত্রেও আবদ্ধ হন. এখানের জীবন তাঁদের জন্য স্বাভাবিক হয়ে যায়, যদিও এখানের ঐতিহ্য, জীবন ধারণের নিয়ম ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সকলের জন্য খুব সহজ কাজ নয়. কিন্তু বাংলাদেশের চিকিত্সক শাহরিয়ার শাহ খালেদ এখানে মানিয়ে নেওয়া বিষয়ে কোন জটিলতা বোধ করেন নি. মস্কো থেকে পাঁচশো কিলোমিটার দূরে একটি ছোট শহরে তিনি নিজের প্রেম, বন্ধু ও কাজ সবই খুঁজে পেয়েছেন.

স্থানীয় চিকিত্সা কেন্দ্রে এই বিরল নামের চিকিত্সককে সকলেই চেনেন: তিনি সবার চেয়ে বেশী সময় নিয়ে রোগী দেখে থাকেন. আর তার কারণ এই নয় যে, তিনি খারাপ রুশ ভাষা জানেন অথবা কাজ ভাল করে করতে পারেন না. স্রেফ খালেদ শাহরিয়ার শাহ খুবই মনোযোগী, তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত রোগীকে ছাড়েন না, যতক্ষণ না তার রোগের ইতিহাস ভাল করে পড়ে, খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা শেষ না হচ্ছে. তিনি খুবই শান্ত ও ভদ্র ভাবে, রোগীদের সঙ্গে ভালর জন্যই কথা বলেন, আর তাঁর এই সুন্দর ব্যবহার রোগীদের কাছ থেকেও সমান আগ্রহের সঙ্গেই গৃহীত হয়. আর যদিও শুরুতে অনেকেই খুব একটা ভরসা করতে পারতেন না চিকিত্সকের গুণ সম্পর্কে, তবুও এখন তাঁর ক্যাবিনেটের বাইরেই রোজ রোগীর সারি দিয়ে ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশী.

বহুদিন আগে খালেদ শাহরিয়ার ভরোনেঝ শহরের মেডিক্যাল একাডেমী থেকে পাশ করেছিলেন. এক রুশী মহিলাকে বিয়ে করে তিনি তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে যান.কয়েকবছর আগে তাঁর পরিবার তিনটি শিশু সমেত আবার রাশিয়াতে ফিরে আসে, আর খালেদ এই ছোট প্রাদেশিক শহরের ডাক্তারখানায় কাজ নেন. তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, তাঁর এখানে মানিয়ে নিতে কোনই অসুবিধা হয় নি. এখানের চিকিত্সকদের গোষ্ঠী তাঁকে খুবই উষ্ণ ভাবে গ্রহণ করেছিল. আর কাজও তাঁর জন্য ভালই লাগে. তার ওপরে এখানে বাংলাদেশের তুলনায় কাজও খুব কম. যদি দেশে তাঁকে প্রত্যেকদিন একশো জন করে রোগীর চিকিত্সা করতে হত, তবে এখানে সেটা খুব বেশী হলে মাত্র তিরিশ জন. তাই নিজের কাজ শেষ করে তিনি সহকর্মীদেরও সানন্দে সাহায্য করতে প্রায়ই যান. তিনি এটা খুশী হয়েই করেন – কারণ নিজের কাজকে তিনি খুব ভালবাসেন.

পারিবারিক জীবনেও খালেদ একজন সুখী মানুষ, নিজের স্ত্রী ও বাচ্চাদের তিনি নিজের সমস্ত ফাঁকা সময় দিয়ে থাকেন. তাঁদের বাড়ীতে রুশী ও এশিয়ার ঐতিহ্য সহজেই সুর মিলিয়ে মিশে গিয়েছে. এমনকি প্রত্যেকদিনের খাবারও যেমন রুশী, তেমনই বাঙালী রান্না দিয়ে তৈরী হয়. যেমন প্রথমে রুশী স্যুপ – বোর্শ, তারপরে জিরে হলুদ দিয়ে ভাত হয় দ্বিতীয় পদে. আর যখন বাড়ীতে অতিথি আসেন – তখন তাদের খাওয়ার টেবিল উপচে পড়ে নানা রকমের এশিয়ার খাবার দাবারে.

0প্রসঙ্গতঃ, খালেদের আপন ভাইয়েরাও চিকিত্সক. ভরোনেঝের এই ডাক্তারের বহু দিনের ইচ্ছা – একবার তাঁদের রাশিয়াতে আনানো, নিজের সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গেও আলাপ করিয়ে দেওয়া. তাঁদের রুশী খাবার খাওয়ানো আর রুশ দেশের সৌন্দর্য্য দেখানো. আর যদি তাঁদের হঠাত্ করে ভাল লেগে যায়, তবে তাঁরা যদি এখানেই থেকে যেতে চান? তাহলে তখন স্থানীয় চিকিত্সাকেন্দ্রে একেবারে বাংলাদেশের এক পরিবার ডাক্তার কাজ করতে শুরু করবেন.