রাশিয়া ও ভারতঃ একবিংশ শতকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্পর্কে নতুন দিগন্ত

ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক 'দ্যা হিন্দু' পত্রিকার পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষন করার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত. নয়া দিল্লিতে আসন্ন সরকারি সফরের পূর্বে আমি আগামীর রুশ-ভারত কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে বলতে চেয়েছিলাম.

এবছর আমাদের দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৬৫ বছর পূর্ণ হয়েছে. বিগত কয়েক দশকে আমরা একসাথে কাজ করার অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যও পেয়েছি. রাজনৈতিক যুগের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু দুই পক্ষের যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলো একই ধারায় রয়েছে- একে অপরের প্রতি সমান বিশ্বাস ও সমঅধিকার. আমি উল্লেখ করে বলতে চাই, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছেঃ ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা. আমরা দৃড় বিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি যে, তা অসাধারণ বৈশিষ্ট বহন করছে.

ঐতিহাসিক একটি দিক হচ্ছে ২০০০ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত সহযোগি রাষ্ট্রের ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করা. একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের উন্নয়নশীল ঘটনা বিবেচনা করেই ওই চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের প্রধান গুরুত্ব নিহিত রয়েছে. যদিও আজ আমাদের সামানে এমনকি আমাদের সব সভ্যতার সমানেই দাঁড়িয়ে আছে ভয়াবহ হুঁশিয়ারি সংকেত. এগুলো হচ্ছে- অসম গ্লোবাল উন্নয়ন, অর্থনীতি ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি ও নিরাপত্তা.

এই বিবেচনায় রাশিয়া ও ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বদানের উদাহরণ প্রদর্শিত করছে.

আমাদের অভিন্ন উদ্দেশ্য. আর তা হচ্ছে, যে পৃথিবীতে আমরা বসবাস করছি তাকে আরও ন্যায্য, গনতান্ত্রিক ও নিরাপদ রুপে গড়ে তোলা. মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমস্যাবলী একসাথে সমাধানের চেষ্টা করা.

উল্লেখ করছি যে, “ব্রিকস” এর সদস্য রাষ্ট্র হওয়ায় আমাদের একযোগে কাজ আরও সক্রিয় গতিতে এগিয়ে চলছে. সময়ের সাথে সাথে এই সংস্থার মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে. এবং তা হচ্ছে সাধারণ নিয়মেই. আমরা যে পদক্ষেপ নেয়েছিলাম সেই নতুন কাঠামো আজ বহুবিদ মেরুর উন্নয়নের দিকে ধাবিত করছে .

আমাদের এমন গঠনমূলক যৌথ কাজের প্রতিফলন ঘটছে সাংহাই সহযোগি সংস্থাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে. জি-২০ জোটের রাশিয়ার সভাপতিত্ব শুরু হওয়ায় তা নিয়েও ভারতীয় পক্ষের সাথে আলোচনা করা হবে.

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিলিত হয়ে কাজ করা, শান্তিময় বানিজ্য করার পন্থায় অংশগ্রহণ, এবং বৈজ্ঞানিক-প্রযুক্তি ও মানবিক সম্পর্ক এ সব কিছুই হচ্ছে নতুন রুপে সহযোগিতার পথে প্রবেশ করা.

বিশেষকরে উল্লেখ করতে চাই দুই দেশের বানিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে. রাশিয়া ও ভারতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তা উভয় পক্ষের ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল. বিশ্ব মন্দা থাকা সত্বেও ২০১২ সালে আমাদের জন্য রেকর্ড পরিমান সূচক অপেক্ষা করছে এবং এ বছর বার্ষিক লেনদেনের পরিমান ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে. আমাদের পরবর্তি লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে, আগামী ২০১৫ সাল নাগাদ তা ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা.

এর জন্য প্রয়োজন সবটুকো মজুদ ব্যবহার করা, ব্যাবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ককে সমর্থন করা, কার্যকরী বিনিয়োগ তৈরীকরণ, প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নয়ন. এছাড়া জ্বালানী খাত, সবার পূর্বে পারমানবিক ক্ষেত্র.

এ খাতে শীর্ষ ও যুগান্তকারী একটি প্রকল্প হচ্ছে “কুদানকুলাম” পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ যা করা হচ্ছে পূ্র্ণ নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে. এ কেন্দ্রের প্রথম ব্লকটি চালু হলে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিদ্যুত ঘাটতি হ্রাস পাবে এবং ২য় ব্লকটি চালু হলে এ সমস্যা পুরোপুরি দূর হবে. আমরা আশা করছি যে, খুব শ্রিঘ্রই ভারতে নতুন পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করা হবে.

অধীর আগ্রহ নিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি দীর্ঘমেয়াদি নানা প্রকল্পের. এর মধ্যে রয়েছে ধাতবশিল্প, কয়লা উত্তলন, গাড়ি ও বিমান নির্মাণ, রাসায়নিক শিল্প, ঔষধ শিল্প এবং তথ্য ও বায়ো টেকনোলোজি প্রভৃতি. আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান, তথ্য ও উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে দির্ঘমেয়াদী একসারি প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে. এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে- আমাদের দুই দেশের বিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি, যন্ত্র ও উপকরণ তৈরী করা.

রাশিয়ার গ্লোনাস নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেমের উভয় দেশের ব্যবহার নতুন সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে. দুই পক্ষের মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তিপত্র ইতিমধ্যে স্বাক্ষর করা হয়েছে. এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে এখন ব্যাবহারিক জীবনে পারস্পরিক সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন.

রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি স্বাক্ষী হচ্ছে দুই দেশের মাঝে সামরিক-প্রযুক্তি সম্পর্ক. এ খাতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নিবন্ধিত অস্ত্র সরবরাহ ও নতুন প্রযুক্তির অস্ত্র নির্মাণ নিয়ে গবেষণা করা. শুধু সামরিক উদ্দেশ্যেই অস্ত্র বিক্রি করাই মূল লক্ষ্য নয়.

এছাড়া গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বহুবিদ ব্যবহারযোগ্য যুদ্ধ ও যাত্রীবাহি বিমান তৈরী করা. ক্ষেপনাস্ত্রবিরোধী রকেট “বিরামস” এর প্রাথমিক সব পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে আমাদের প্রকৌশলীরা এবং এখন তাঁরা এটি বিমানে প্রয়োগ করা নিয়ে কাজ করছেন.

বিশ্বাস করছি যে, এ ধরণের বহুবিদ প্রকল্প তা আমাদের দুই দেশকে শুধুমাত্র শীর্ষ প্রযুক্তিতে প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়তেই সাহায্য করবে না বরং তৃত্বীয় বিশ্বের দেশগুলোর বাজারে নিজেদের পণ্যের বিকাশ ঘটানো যাবে.

রাশিয়া ও ভারত রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্ব হচ্ছে, দুই দেশই অসাধারণ সাংস্কৃতিক পরিচিতি বহন করে এবং একে অপরের মধ্যে মানবিক খাতে সম্পর্ক রয়েছে. দিল্লী, আগ্রা ও মোম্বাই শহরে মহান সব স্মৃতিস্তম্ভ ও স্থাপত্যশৈলী এবং ভারতের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি যা অসাধারণ আকর্ষনীয় শক্তির প্রকাশ ঘটায়. অন্যদিকে, ভারতীয়রা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে রুশী সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পরের সাথে পরিচিতি লাভ করছে. এ বছরে ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়া রুশ সাংস্কৃতিক উৎসব ও সর্বরাশিয়া আধুনিক চলচিত্র ও সাংস্কৃতি উৎসব তা পূনরায় এ সম্পর্ক প্রমানিত করেছে.

শিক্ষা ও আগ্রহপূর্ণ প্রকল্পে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করা দরকার. সেই সাথে পর্যটন ও তরুনদের নিয়েও কর্মসূচি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন.

এ সবই আমাদের দুই দেশের নাগরিকদের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করছে এবং নতুন “মনুষ্য মাপকাঠি”কে পরিপূর্ণ ঘটাচ্ছে. এ সবই আজকের দিনে অনেক বেশি গুরুত্ব ও চাহিদা বহন করছে.

নয়া দিল্লীতে রুশ-ভারত সম্মেলন যা ব্যাপক তৎপরতা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে. আগামীর দিনে একত্রে কাজ করার জন্য প্রধান গুরুত্ব পাওয়া বিষয়বলী তুলে ধরা হবে. আমার বিশ্বাস, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক যা বরাবরের মতই গঠনমূলক হবে এবং চুড়ান্তভাবে কৌশলগত সম্পর্ককে আরও নতুন উদ্বীপার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে. স্বভাবতই রাশিয়া ও ভারতের জনগনের জন্য সুফল বয়ে আনবে. তা হবে পৃথিবীর আগ্রহ, ইউরো-এশিয়াকে স্থিতিশীল ও আমাদের পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য.

একবিংশ শতাব্দিতে রাশিয়া ও ভারতের কৌশলগত সম্পর্কের সম্ভাবনা প্রণয়ন করতে পেরেছি. এ সম্পর্ক হচ্ছেঃ ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, একে অপরের প্রতি গভীর বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক বাজারে মিলিত পণ্যের প্রসার, উচ্চমূল্যের পরও পণ্য বিনিময় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে রাশিয়া ও ভারতের যৌথ কার্যকরী অবদান বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক ও মানবিক খাতে যোগাযোগ সর্বোচ্চ খোলামেলা রাখা.

বন্ধুত্বপূর্ণ ভারতের জনগনের প্রতি শান্তি, সমৃদ্ধি ও নতুন নতুন হৃদয়গ্রাহী সাফল্য কামনা করছি.