প্রিয় শ্রোতারা ও পাঠকবৃন্দ! শুরু করছি আমাদের নিয়মিত সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান – ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’.

অনুষ্ঠানটি সংকলন করেছেন নিনা রুকাভিশনিকোভা, আর ‘রেডিও রাশিয়া’র স্টুডিও থেকে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছে ল্যুদমিলা পাতাকি ও জামিল খান.

এই অনুষ্ঠানে আপনাদের পাঠানো প্রশ্নাবলীর উপর ভিত্তি করে আমরা রাশিয়া সম্পর্কে জানিয়ে থাকি.

তাই আমরা আমাদের ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরিশাসের পাঠকদের অনুরোধ জানাচ্ছি যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন আমাদের পাঠানোর জন্য. কোন বিষয় সম্পর্কে আপনারা জানতে আগ্রহী – সে সম্মন্ধে লিখুন. আমাদের অনুষ্ঠানের সক্রিয় ভাগীদার হোন!

আজ আমরা আপনাদের নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলির উত্তর দেবঃ

রুশবাসীরা কি কুসংস্কারে বিশ্বাস করে? – প্রশ্নটি করেছেন নয়াদিল্লীর বাসিন্দা দীপক কুমার.

পাকিস্তানের লাকি মারওয়াত থেকে আমাদের নারী শ্রোতা লায়লা বিবি জানতে চেয়েছেনঃ কোন কোন পশু বাড়িতে পোষে আমাদের দেশবাসীরা. আজ আমরা আপনাদের গৃহপালিত টিয়াপাখির গল্প শোনাবো.

নয়াদিল্লী থেকে দীপক কুমার জানতে চাইছেনঃ রুশবাসীরা কুসংস্কারে বিশ্বাস করে কিনা.

আমরা এই প্রশ্নটির উত্তর যাতে যথাসম্ভব বাস্তবের কাছাকাছি হয়, সেজন্য আমাদের বন্ধুবান্ধব ও চেনাপরিচিতদের এই প্রশ্নটা করেছিলাম. তাদের কাছ থেকে উত্তর পেলাম – “এটা হাস্যকর! আমরা যে একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছি! কুসংস্কার আজকাল কোথা থেকে আসবে”! তখন আমরা জিজ্ঞাসা করলামঃ নববর্ষের সাথে সম্পর্কিত কোনো সংস্কার কি ওরা মানে? তার উত্তরে চনমনে হয়ে উঠে তারা বলতে লাগলো – “এটা পুরোপুরি অন্য ব্যাপার! নববর্ষ হল সাংকেতিক সীমারেখা, যেটাকে অতিক্রম করে লোকে জীবনে শুভ পরিবর্তন আসার প্রত্যাশা নিয়ে, পুরনো সমস্যাবলীর নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার আশা করে. অবশ্যই আমরা বিশ্বাস করি এসবে”! আজ ঐরকম কুসংস্কার নিয়েই আমরা আপনাদের জানাবো.

প্রথমতঃ এখানে সকলেরই দৃঢ়বিশ্বাস – যেভাবে নতুন বছরকে বরন করবে, সেভাবেই তাকে বিদায় জানাতে হবে. তাই রুশবাসীরা ৩১শে ডিসেম্বর পেরিয়ে ১লা জানুয়ারীতে পদার্পণ করা রাতটা হাসি-আনন্দের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করতে চায়. যে বাড়িতে বাচ্চারা আছে, সেখানে আসল বা কৃত্রিম ফারগাছ সাজানো হয় রঙবেরঙের খেলনা দিয়ে. দেওয়াল সাজানো হয় রঙীন কাগজের মালা দিয়ে. সবাই পরে সুন্দর সুন্দর নতুন বেশভুষা, আর ভোজের টেবিল উপচে পড়ে ফলমূলে, মিষ্টিতে, বিভিন্ন বাদামে ও নানারকমের দামী সুস্বাদু খাবারদাবারে. রুশবাসীরা বিশ্বাস করে, যে নববর্ষে ভোজের টেবিল যদি দামী সুস্বাদু খাবারদাবারে উপচে পড়ে, তাহলে সারা বছর ধরে পরিবারে সমৃদ্ধি বজায় থাকবে.

রুশীরা বিশ্বাস করে, যে এই উত্সবের প্রাক্কালে কোনো ধারদেনা করা ঠিক নয়, তাহলে সারা বছর ঋণ কাঁধে নিয়ে চলতে হবে. ঐ একই কারনে কাউকে দুঃখ দেওয়া একেবারেই উচিত নয় এবং অবশ্যই যে তোমাকে মনে ব্যথা দিয়েছে, তাকে বিনাশর্তে ক্ষমা করা অপরিহার্য.

যখন ৩১শে ডিসেম্বর ঠিক মাঝরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়, তখন মনে মনে কিছু কামনা করলে, তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে.

এটা আর এমন কি! রাশিয়ায় এমন জটিল পদ্ধতিতে বিশ্বাস করা হয়, যা ভাগ্যকে একান্ত আন্তরিক কামনা পূরণ করতে বাধ্য করবে! প্রায় সব গৃহস্থবাড়িতেই টিভি আছে, তাই ঠিক মধ্যরাতে সবাই টিভির সামনে জড়ো হয়ে মস্কো ক্রেমলিনের টাওয়ারে বসানো বড়ঘড়ির ঘন্টাধ্বনি শোনে. কারো কারো বিশ্বাস এই, যে ঘড়ির ঘন্টা বাজতে বাজতেই টিস্যু পেপারের এক টুকরোয় নিজস্ব মনোবাসনা লিখে দেশলাই দিয়ে সেটায় আগুন জ্বেলে জ্বলন্ত অবস্থাতেই শ্যাম্পেনে ভরা পানপাত্রে সেটাকে ফেলে যদি পান করে শ্যাম্পেন নিঃশেষ করা যায়, তাহলে মনোবাসনা পূর্ণ হবেই হবে. ঘড়ির ঘন্টা ১২ বার বাজে, তারমানে প্রায় ১২ সেকেন্ড সময় থাকে মনোবাসনা পূরণ হওয়ার শর্ত মেটানোর জন্য. অল্পবয়সীরা কখনো সখনো এটা পারে.

যুবতী ও মহিলাদের সুপারিশ করা হয় মাঝরাতের আগে কাঁধে শাল চড়ানোর ও মাঝরাত অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে সেটা ছুঁড়ে ফেলার. লোকবিশ্বাস, যে তাহলে সব বিপদআপদ ও অসুখবিসুখ নাকি আগের বছরেই থেকে যাবে.

আমি এরকম কুসংস্কার সম্পর্কে এই প্রথমবার শুনছি.

আমিও তাই. তবে আমি কোন একটা পত্রিকায় পড়েছিলাম এই সম্পর্কে. আমার কাছে সিরিয়াস ম্যাগাজিন ‘প্রকৃতি ও মানুষ -একবিংশ শতাব্দীতে’র সর্বশেষ সংখ্যাটা রয়েছে. সেখানে আরও একটা সংস্কারের উল্লেখ করা হয়েছে- নববর্ষ উদযাপন করার সময় নাকি হাঁচি দিতে হয়. কমকরেও ৭ বার হাঁচি দিলে নাকি নতুন বছরে টাকাপয়সার বাড়বাড়ন্ত হয়.

আমরা নববর্ষে একে অপরকে উপহার দিতে ভালোবাসি, বিশেষতঃ বাচ্চাদের ও বিশ্বাস করি, যে যত বেশি উপহার আমরা দেব, ভাগ্যের কাছ থেকে তত বেশি উপহার আমরা পাব নতুন বছরে.

প্রিয় পাঠকবৃন্দ ও শ্রোতারা! আসন্ন নতুন বছরে আপনাদের সুস্বাস্থ্য, সুখ ও সৌভাগ্য কামনা করি.

আপনাদের পরিবারের সবাই নিরোগ থাকুক. আপনাদের সবাইকে জানাই সুখ ও সমৃদ্ধিলাভের শুভেচ্ছা.

এবার নববর্ষ সম্মন্ধে আপনাদের একটা গান শোনার প্রস্তাব দিচ্ছি.

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠানটি পড়ছেন বা শুনছেন আপনারা. পাকিস্তান থেকে লায়লা বিবি জানতে চানঃ রুশবাসীরা বাড়িতে কোন সব পশু পালন করতে ভালোবাসে?

আমাদের দেশে বাড়িতে সাধারনতঃ থাকে কুকুর ও বেড়াল. তবে পাখিও অনেকে পোষে বাড়িতে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে টিয়াপাখি. গোশা ও কেশাকে আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের নিশ্চয়ই ভালো লাগবে. ভারতে, বাংলাদেশে ও পাকিস্তানে কথা বলতে পারা টিয়াপাখি দিয়ে কাউকে অবাক করার চেষ্টা বৃথা. আমরা ভারততত্ত্ববিদেরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষার উপর দখল বাড়ানোর বিভিন্ন কোর্স করাকালীন আমাদের ভারতীয় বন্ধুবান্ধবদের বাড়িঘরে দেখতাম সবুজ রঙের টিয়াপাখি, যারা বাংলা, হিন্দী বা উর্দু ভাষায়, মানে যে ভাষায় বাড়ির মালিকরা কথা বলতো, সেই ভাষায় পুনরুচ্চারণ করতো তাদের বলা কথাবার্তা.

এবার আসা যাক গোশা নামক টিয়াপাখিটির কথায়. ওর সম্পর্কে আমরা পড়েছি ‘পশুদের জগতে’ নামক রুশী পত্রিকায়. গোশা জানতো কয়েকটি শব্দ ও বাক্য, যেগুলো স্থানকালের বিচার না করেই আউড়ে যেতো. একদিন সকালে গৃহকর্ত্রী তার খাবারের বাটিতে খাবার ঢালতে গিয়ে ঘটনাচক্রে সেটা হাত থেকে ফেলে দেয় মেঝেতে. পাখিটা খাঁচা থেকে দৃশ্যটা লক্ষ্য করে বলে উঠেছিল, হায় ভগবান, একি অন্যায়! এর আগে গোশা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বহুবার গৃহকর্ত্রীর মুখ থেকে শুনেছে ঐ বাক্যটা বিরক্ত হয়ে গিয়ে. গোশা তার মর্ম বুঝতে পেরে সঠিক জায়গায় বাক্যটা প্রয়োগ করেছিল.

কেশা সম্পর্কে গল্পটি ছাপিয়েছিল ‘প্রকৃতি ও মানুষ একবিংশ শতাব্দীতে’ পত্রিকা ‘পশুপাখিরা কি নিয়ে ভাবে’ - এই শীর্ষনামায়. কেশা থাকতো একজন মস্কোবাসীর বাড়িতে, যে ধৈর্য ধরে তাকে বুলি শেখাতো. ফলশ্রুতিতে টিয়াপাখিটা তিনশোরও বেশি শব্দ আওড়াতে শিখেছিল এবং সব বুলি জায়গামতন ব্যবহার করতো. বাড়ির ছেলে আলিওশা স্কুল থেকে ফিরলে কেশা বলতো – “আলিওশা স্কুল থেকে ফিরলো” ইত্যাদি. কে একজন গৃহকর্তাকে পরামর্শ দিয়েছিল টেপ-রেকর্ডারে টিয়াপাখির বকবকানি তুলে রাখতে. গৃহকর্তা নিয়মিত রেকর্ড করতে লাগলো আর যখন রেকর্ড করা শেষ হল, তখন সে ভাবলো – “আচ্ছা, টিয়াপাখিটাকে নিজেকেই ওর বকবকানি শুনতে দিলে কেমন হয়?” কেশা চুপ করে নিজের কন্ঠস্বর শুনলো ও রেকর্ড শেষ হওয়ার পরে আচমকা বলে উঠলো – “এবার নতুন কিছু একটা ভেবে বার করা দরকার...”. বাড়ির সবাই সে কথা শুনে তাজ্জব হয়ে গেছিল তখন.

আপনারা, ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীরা যদি মানুষের সাথে পশুপাখির জগতের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আরও জানতে চান, তাহলে আমরা এ বিষয়ে আরও জানাবো. রুশভাষী পত্রপত্রিকা মাঝেমাঝে পশুপাখিদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও দয়ামায়ার আশ্চর্যজনক বিভিন্ন বর্ণনা দেয়. আপনারা জানতে চান? তাহলে সেসম্পর্কে আমাদের লিখুন.

আর এবার শুনুন নববর্ষ প্রসঙ্গে আরও একটা গান.

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠানটি আজ এখানেই শেষ করছি. রাশিয়া সম্মন্ধে নতুন নতুন প্রশ্নসমেত আমরা আপনাদের কাছ থেকে চিঠিপত্রের অপেক্ষায় থাকবো. আমাদের ঠিকানাঃ ভারত ও পাকিস্তানে সম্প্রচার বিভাগ, বেতার কেন্দ্র ‘রেডিও রাশিয়া’, ২৫ নম্বর, প্যাতনিত্স্কায়া স্ট্রীট, মস্কো, রাশিয়া-১১৫৩২৬. ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানাঃ letters a ruvr.ru.