ভ্লাদিমির পুতিনের বড় প্রেস কনফারেনস শুধু রাশিয়াতেই নয়, তার সীমানার বাইরেও বহু অনুরণন তুলেছে. সারা বিশ্বের বিশেষজ্ঞরাই খুব মনোযোগ দিয়ে রাশিয়ার নেতার বক্তব্য শুনেছেন. নিজেদের মনোভাব তাঁরা “রেডিও রাশিয়ার” সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন.

ভ্লাদিমির পুতিনের বড় সাংবাদিক সম্মেলন – একটা বিশ্ব রাজনীতির বিরল ঘটনা. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির খুব কমই বিদেশী সহকর্মী শুধু কয়েক ঘন্টা ধরে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে সক্ষম ও এই প্রসঙ্গে এত বেশী রকমের নানা বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন. এই ধরনের মন্তব্য করেছেন সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর আঞ্জেলো সেগ্রিল্লো, তিনি বলেছেন:

“প্রথমে যা আমার জন্য পুতিনের সাংবাদিক সম্মেলনে বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে, - তা এর সময়ের বিষয়ে দৈর্ঘ্য. আমি বরং বলবো এটা একটা অতিকায় সাক্ষাত্কার, যা চার ঘন্টার বেশী সময় ধরে হয়েছে. আর এখানে আগ্রহের সঞ্চার করে এই ব্যাপার, যে, সাংবাদিক সম্মেলনের সময়ে খুবই বৃহত্ সংখ্যক বিষয় স্পর্শ করা হয়েছে ও তার প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে”.

পুতিনের সাংবাদিক সম্মেলনের একটি মন্তব্য করা হয়েছিল জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে. কুরিল দ্বীপপূঞ্জের অধিকার নিয়ে বিতর্কের জন্যই মস্কো ও টোকিওর মধ্যে এখনও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে নি. কিছু দিন আগে জাপানে পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়ে গিয়েছে. এই নির্বাচনে জয়ী দলের নেতা মস্কোর সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনার ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছেন. ভ্লাদিমির পুতিন এই ঘোষণায় মন্তব্য করেছেন যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত, যা রাশিয়া খুবই উচ্চ পর্যায়ে মূল্যায়ণ করেছে. এই কথা রাশিয়ার নেতার কাছ থেকে শোনা হয়েছে ও বোঝা হয়েছে যে, দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতার সম্ভাবনা বেড়েছে, এই রকমই বলেছেন জাপানের “নিহন কেইদ্জাই” সংবাদপত্রের সমীক্ষক ওদা তাকেসি.

চিনেও রাশিয়ার নেতার সাংবাদিক সম্মেলন মন দিয়ে শোনা হয়েছে. প্রসঙ্গতঃ, বেজিং শহরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির ও চিনের উচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টিকোণ বিশ্বের বহু প্রশ্নের ক্ষেত্রেই একই রকমের. এই বিষয়ে “রেডিও রাশিয়াকে” জানিয়েছেন চিনের সমাজ বিজ্ঞান একাডেমীর তথ্য ও জনসংযোগ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর চ্ঝান শুখুয়া, তিনি বলেছেন:

“মস্কোর সাংবাদিক সম্মেলনে পুতিন খুব উচ্চ মূল্যায়ণ করেছেন রুশ- চিন সম্পর্ককে, তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানে তা সবচেয়ে ভাল সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছে. চিনে সম্পূর্ণ ভাবে এই মূল্যায়নের সঙ্গে সম্মত হওয়া গিয়েছে. বহু প্রশ্নের ক্ষেত্রেই আমাদের দুই দেশের মধ্যে একই রকমের দৃষ্টিকোণ রয়েছে. সমাজের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের ক্ষমতাসীন দল গুলির মধ্যে ভাল অভিজ্ঞতার আদান প্রদান চলছে”.

রাশিয়ার সিরিয়া সংক্রান্ত অবস্থান হয়েছে একটি সবচেয়ে সঠিক অবস্থান, এই কথা “রেডিও রাশিয়াকে” বলেছেন প্যালেস্টাইনের রাজনীতিবিদ আবদাল্লা ইসা. তিনি এই ভাবেই ভ্লাদিমির পুতিনের নিকটপ্রাচ্য নিয়ে মন্তব্যকে ব্যাখ্যা করেছেন. সাংবাদিক সম্মেলনের সময়ে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন যে, সিরিয়ার সমস্যা সমাধান করা উচিত্ শুধু শান্তির পথেই. সমস্ত অন্য দেশ গুলি সিরিয়াকে নিজেদের স্বার্থেই অনুসরণ করছে, যা রাশিয়া করছে না, এই রকমই মনে করেছেন আবদাল্লা ইসা. প্রসঙ্গতঃ, তাঁর কথামতো, এই পরিস্থিতি সেই অবস্থারই পুনরাবৃত্তি করছে, যা ইরাকে একবার হয়েছিল, তাই তিনি বলেছেন:

“আমি নিজেই ইরাক থেকে, আর আমার মতে তা বহু লক্ষ ইরাকের লোকও একই রকম করে ভাবেন. যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে এসেছিল, তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু গণতন্ত্র তৈরী করাই নয় অথবা ইরাকের জনগনকে বিকাশের পথে বের হওয়ার জন্য সাহায্য করাও নয়. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে দরকারি ছিল ইরাকের খনিজ তেল, ইরাকের সম্পদ ও ইরাকের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান. তারা চেয়েছিল ইরাককে দুর্বল করে দিতে, যাতে তা কোনদিনও আর শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত না হতে পারে. সিরিয়া সম্বন্ধে যে পরিকল্পনার কথা রাষ্ট্রপতি পুতিন বলেছেন, তা খুবই বুদ্ধি সঙ্গত ও খুবই সঠিক. তিনি আরও একবার তাঁর সমর্থন দিয়েছেন যে রাশিয়ার সেখানে কোনও বড় স্বার্থ জড়িয়ে নেই ও তারা নিজেরা সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাশার আসাদের ব্যক্তি স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়, বরং তারা সেই প্রশ্নই করে চলেছে, যদি আসাদ সরে যান তাঁর জায়গা থেকে সামরিক পথে, তবে সেখানে একটা মাত্স্যন্যায় ও গৃহযুদ্ধ শুরু হবে”.

ভ্লাদিমির পুতিন দুর্নীতি মোকাবিলার প্রশ্নেও আলাদা করে উত্তর দিয়েছেন. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির মতে দুর্নীতির জন্য শাস্তিকেও কঠোর করতে হবে. তিনি স্বীকার করেছেন যে, রাশিয়ার জন্য এটা সমস্যা ঐতিহ্য মেনেই রয়ে গিয়েছে, তা স্বত্ত্বেও দুর্নীতির সঙ্গে খুবই সিরিয়াস ভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে. ভ্লাদিমির পুতিন একই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, দুর্নীতি প্রসঙ্গে সমস্যা দেশের উন্নয়নের সঙ্গেই সরাসরি ভাবে যুক্ত. বাস্তবে প্রায় সমস্ত উন্নতিশীল বাজার অর্থনীতির দেশেই সমাজ এই রোগে কম বেশী ভুগছে. এর সঙ্গে লড়াই করা দরকার. তা দরকার জেদ ও পরম্পরা মেনেই. আর শাস্তি বাড়ানো দরকার. আর এমন করা দরকার, যাতে যে কোন ধরনের অধিকার লঙ্ঘনের জন্য এড়িয়ে যাওয়ার অযোগ্য শাস্তি হয়.

রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির এই মতের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভাবে একমত হয়ে ভ্লাদিমির পুতিনের এই সাংবাদিক সম্মেলন মন দিয়ে লক্ষ্য করে ভারতের রাজনীতি সমীক্ষক বিক্রম বাহল মন্তব্য করেছেন:

“এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়. দুর্নীতি স্বাভাবিক ও সত্ জীবনের একেবারে গোড়াতেই ঘুণ ধরিয়ে দেয়. এখানে কথা হচ্ছে সরাসরি ভাবে লোক ঠকানোর, যা বাস্তবে দুর্নীতি. আর এই রকমের হয়ে চলেছে বাস্তবে বহু দেশেই. সরকারি প্রতিষ্ঠান, যেখানে লোকে আসেন, নিজেদের কাজ নিয়ে, তারা অনেক সময়েই নিজেদের দায়িত্ব ততক্ষণ অবধি পালন করে না, যতক্ষণ না তাদের ঘুষ দেওয়া হচ্ছে. তাই আমি মনে করি এটা এক ধরনের লোক ঠকানো. লোককে বাস্তবে বাধ্য করা হয় অর্থ দিতে, যাতে তাদের সমস্যার সমাধান হয়. এই ধরনের অবস্থা খুবই দরকার রয়েছে পাল্টানোর আর এটা সরকারি দপ্তরের কাজের ক্ষেত্রে এক ধরনের বিপ্লবের সূচনাই তৈরী করবে. কারণ অনেক প্রশ্নেরই, যার সমাধান করা দ্রুত কর্তব্য, তা কৃত্রিম ভাবে ফেলে রাখা হচ্ছে, যা অনেকাংশই কাজের ক্ষতি করছে. তাই আমি মনে করি এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ. আর রাষ্ট্রপতি পুতিন এই বিষয়ে গুরুত্ব উল্লেখ করেই সরাসরি ও স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন”.

ভ্লাদিমির পুতিনের বড় সাংবাদিক সম্মেলনে চার ঘন্টা তেত্রিশ মিনিট সময় ধরে ৬২ জন সাংবাদিকের ৮১টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়েছে. তা যেমন ছিল দেশের আভ্যন্তরীণ, তেমনই দেশের বাইরের রাজনীতি নিয়েও. আর তারই সঙ্গে তোলা হয়েছে দেশের সবচেয়ে বেদনা দায়ক সামাজিক সমস্যা গুলির কথাও.