ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ একটি নতুন রাজনৈতিক পরিভাষা বিশ্বের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, এটা “ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা”. এই পরিভাষা তিনি ব্যবহার করেছেন দিল্লী শহরে হওয়া ভারত- আসিয়ান শীর্ষ বৈঠকে. এই পরিভাষা ভারত- প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ধারণাকে প্রসারিত করে ও বিশেষ করে ভারতের এই এলাকা নিয়ে নিজেদের আগ্রহ বৃদ্ধির কথাই বলে.

এই শীর্ষ বৈঠক বহু কারণেই ছিল খুবই সংজ্ঞাবহ. ১৯৯১ সালে ভারত ঘোষণা করেছিল যে, তাদের পররাষ্ট্র বিষয়ে রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হতে চলেছে “পূর্বের দিকে তাকাও” নীতি. আর ঠিক কুড়ি বছর আগে, ১৯৯২ সালে ভারত ও আসিয়ান জোট নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি করেছিল. কিন্তু তার পর থেকে এই জোটের সমস্ত শীর্ষ বৈঠকই ভারতের অংশ গ্রহণে হয়েছে আসিয়ান জোটের সাধারন শীর্ষ বৈঠক গুলিতেই, অর্থাত্ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলির রাজধানী গুলিতে. এই বারের শীর্ষ বৈঠকই প্রথম, যা করা হয়েছে ভারতের এলাকায়.

শীর্ষ বৈঠকের সময়ে কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে অর্থনীতি ক্ষেত্রে, আ এবারের প্রধান সাফল্য হয়েছে দুই বছর আগে করা স্বাধীন বাণিজ্য চুক্তির পরিসর বর্ধনে. এখন থেকে তা শুধু জিনিষ পত্র নিয়ে বাণিজ্যের প্রশ্নেই নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং তার সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিষেবা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রও. ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সলমন খুরশিদ যেমন উল্লেখ করেছেন যে, “এই প্রশ্নে কোন রকমের কোটা, কোন রকমের তীক্ষ্ণ কর্কশ কোনা আর পড়ে নেই”. প্রসঙ্গতঃ, তাও কিছু সমস্যা এই প্রশ্নে রয়ে গিয়েছে – যেমন, ফিলিপাইনস ও ইন্দোনেশিয়া নিজেদের জন্য বিশেষ শর্ত বলে নিয়েছে, বাহ্যতঃ, তারা ভয় পেয়েছে তাদের বাজারে ভারতের তরফ থেকে বেশী সক্রিয় অনুপ্রবেশের.

এই পরিস্থিতির প্যারাডক্স হল যে, যদিও মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল অর্থনীতি সংক্রান্ত প্রশ্ন গুলি, তবুও আসলে এই বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা আরও অনেক বেশী প্রসারিত প্রশ্নের কথা মাথায় রেখেছেন, এটাই উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এটা প্রাথমিক ভাবে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগ স্থলের জলসীমায় নিরাপত্তার প্রশ্ন ও বিশেষ করে দক্ষিণ চিন সাগরের নিরাপত্তার প্রশ্ন. এই প্রসঙ্গে যদিও চিন কথাটা বক্তৃতার সময়ে বাস্তবে একেবারেই শোনা যায় নি, তবুও সকলেরই – তা যেমন এই শীর্ষবৈঠকের অংশগ্রহণকারীরা, তেমনই পর্যবেক্ষকরাও – একেবারেই স্পষ্ট করে দেখতে পেয়েছেন যে, এখানে চিনের সঙ্গেই পারস্পরিক সম্পর্ক প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা রাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সমস্ত সমস্যাকেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছে”.

ফিলিপাইনস ও ভিয়েতনামের প্রতিনিধিরা দক্ষিণ চিন সাগরের এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধির কথা বলেছেন. কিন্তু ভারতের প্রতিনিধিরা এই সমস্যা থেকে নিজেদের আলাদা করে নিতে. ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সলমন খুরশিদ উল্লেখ করেছেন যে, “কিছু একেবারেই গোড়ার সমস্যা রয়েছে, যা ভারতের হস্তক্ষেপ দাবী করে না, আর তারই সঙ্গে যোগ করেছেন যে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আগ্রহী দেশ গুলিরই উচিত্ হবে সমাধান করা”.

তা স্বত্ত্বেও, সরাসরি চিনের উল্লেখ না করেও, ভারতের মনমোহন সিংহ বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষার কাজে সহযোগিতার কথা. “সামুদ্রিক দেশ হিসাবে ভারত ও আসিয়ান দেশ গুলির নিজেদের শক্তি প্রয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে সমুদ্রে নিরাপত্তা বৃদ্ধির কাজে ও সমস্ত সামুদ্রিক এলাকা সংক্রান্ত প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শান্তি পূর্ণ ভাবেই সমাধান করার দরকার রয়েছে”.

এই ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগে যেমন ভারত, তেমনই আসিয়ান জোটে তাদের সহযোগী দেশ গুলির – এই এলাকার সমস্ত তীক্ষ্ণ সমস্যা গুলির বিষয়ে এই পরিস্থিতির সমস্ত বিপরীতধর্মীতাই প্রতিফলিত হয়েছে, বলে মনে করে বরিস ভলখোনস্কি উল্লেখ করেছেন:

“এক দিক থেকে ভারত যেমন, তেমনই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলির জন্যেও চিন বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক নম্বর সহযোগী দেশ হয়েছে, আর তাই তাকে রাগিয়ে দেওয়া চলে না. অন্য দিক থেকে – যেমন ভারত, তেমনই আসিয়ান জোটের দেশ গুলি উদ্বিগ্ন, চিনের আরও বেশী করে তাদের জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে সক্রিয়তার কারণেই”.

কোন একটি দেশও, এমনকি আসিয়ান জোটও নয়, যারা কম বেশী একটি সম্পূর্ণ জোট, একা চিনের প্রসার বাধা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না. তাই সমস্ত রকমের তীক্ষ্ণ ভাবেই এবারে জোটের সঙ্গী খোঁজার প্রশ্নের উদয় হয়েছে. মনে হতে পারে যে, এই ধরনের সহযোগী দেশ গুলির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও থাকতে পারে. মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি মুখপাত্র একেবারেই কোন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইঙ্গিত করেছেন এই এলাকার সমস্যা সমাধানে ওয়াশিংটনের যোগ দেওয়ার ইচ্ছা সম্বন্ধে. কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিছনে তাদের আফগানিস্তানে, ইরাকে ও লিবিয়ার কাজকর্মের খুবই অপ্রিয় ছায়া চলে এসেছে. দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেও এখনও ভিয়েতনামের যুদ্ধের স্মৃতি অমলিন ও তারই সঙ্গে যা সরাসরি লাওস ও কম্বোডিয়াতে ঘটেছিল, তাও মনে রয়েছে – যা কোন না কোন ভাবেই এই এলাকার সমস্ত দেশের উপরেই প্রভাব ফেলেছিল.

ভারতের পিছনে এই ধরনের কোন ছায়া নেই, উল্লেখ করেছেন বরিস ভলখোনস্কি. আর সুতরাং, একটা সম্পূর্ণ নতুন বাস্তব গড়ে উঠছে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মতো দুটি বৃহত্ রাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বজোড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে – তখন এক নতুন শক্তির ভরকেন্দ্র তৈরী হচ্ছে, যা কোন রকমের শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যোগ দিচ্ছে না, বরং বর্তমানের অশান্ত পরিস্থিতিতে সত্যিকারের ভারসাম্যই সৃষ্টি করছে.