রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ২৪শে ডিসেম্বর সরকারি সফরে ভারত যাচ্ছেন. এই বিষয়ে ক্রেমলিনের তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে খবর দেওয়া হয়েছে. বিষয় নিয়ে কিছু বিশদ মন্তব্য করেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইটে সোমবারে প্রকাশিত এই খবরে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে, দিল্লী শহরে ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা সংক্রান্ত যে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল, তাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, স্ট্র্যাটেজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে স্থিতিশীল বিকাশ লক্ষ্য করা সম্ভব হয়েছে. আমাদের সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয়ে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে. এই বছরে দুই পক্ষই ভিসা সংক্রান্ত ব্যবস্থাকে সহজ করেছে.গত বছরের তুলনায় এই বছরের জানুয়ারী থেকে অক্টোবর মাসে পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমান বেড়েছে শতকরা তিরিশ ভাগ.

কিন্তু শেষ হতে চলা বছর আমাদের দেশ গুলির সহযোগিতার ক্ষেত্রে মোটেও সহজ ছিল না. বেশ কিছু যৌথ প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমে গিয়েছে খুব একটা কম সংখ্যক নয় এমন সব প্রশ্ন. কিছু চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সময় সীমা পার হয়ে গিয়েছে. এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য সমস্ত সমস্যা, যা বোঝাই যাচ্ছে যে, এই সফরের সময়ে আলোচনা করা হবে. এই কথা উল্লেখ করে মস্কোর কার্নেগী সেন্টারের বিশেষজ্ঞ পিওতর তোপীচকানভ বলেছেন:

“এই সমস্ত সমস্যাই সমাধানের উপযুক্ত. আমি মনে করি যে, ক্রেমলিন খুবই ইতিবাচক ভাবে এই সব সমস্যার সমাধানের জন্য মনোভাব দেখিয়েছে. অংশতঃ, ভারতীয়রা বলছেন যে, আমাদের সম্পর্ক “বিক্রমাদিত্য” বিমানবাহী জাহাজের হস্তান্তরে দেরী হওয়ার জন্য ম্লান হয়েছে. কিন্তু আমি বলব যে, এটা খুবই জটিল প্রকল্প, আমাদের জন্য এটা আগে কখনও করা হয় নি. কিন্তু আমি নিশ্চিত যে, এই প্রকল্প শেষ অবধি করা হবেই”.

ভারতীয় পক্ষকে বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ “বিক্রমাদিত্য” হস্তান্তরের সময় সীমা সেই সমস্যার জন্যই হয়েছে, যা তা পরীক্ষা করার সময়ে ধরা পড়েছে. এখন এই জাহাজের ইঞ্জিনের তাপ নিরোধক ব্যবস্থা বদলে দেওয়া হচ্ছে ও আগামী বছরের শেষে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে এই যুদ্ধ জাহাজ তুলে দেওয়া হবে.

সব মিলিয়ে রুশ- ভারত সামরিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা খুবই সফল ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে. ২০১২ সালে ভারতে নানা ধরনের লক্ষ্যভেদের ক্ষেত্রে খুবই বেশী রকমের নিখুঁত অস্ত্র ও রসদ এবং যুদ্ধবিমান সু-৩০ এমকাই দেওয়ার জন্য তিনশ কোটি ডলারের বেশী অর্থের চুক্তি করা হয়েছে. তার ওপরে অক্টোবর মাসে চুক্তি করা হয়েছে পাঁচশো কোটি ডলারের, যা এই সু- ৩০ এমকাই বিমানের ইঞ্জিন আএল – ৩১ এফপে ভারতে লাইসেন্স সহ নির্মাণের জন্য ব্যবস্থা করে দেবে. পুতিনের দিল্লী সফরের সময়ে সম্ভবতঃ আরও ৪২টি এই ধরনের বিমানের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে.

আগামী আলোচনায়, বোঝাই যাচ্ছে যে, পারমানবিক জ্বালানী ক্ষেত্রেও সহযোগিতা নিয়ে কথা হবে. রাশিয়ার সহযোগিতায় ভারতে নির্মিত কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র ব্যবহারের জন্য তৈরী তার প্রথম রিয়্যাক্টরে পারমানবিক জ্বালানী ভরার কাজ হয়ে গিয়েছে. বাস্তবে দ্বিতীয় ব্লকও তৈরী, কিন্তু সমস্যা রয়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ শক্তি ব্লক নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে. তা ভারতের দায়িত্ব সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে জড়িত. এই আইন ২০১০ সালে গৃহীত হয়েছিল, তা কোন রকমের নেতিবাচক ঘটনার ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ক্ষতিপূরণ করার জন্য পারমানবিক কেন্দ্রের নির্মাতা কোম্পানীর উপরে ন্যস্ত করে, যদিও ব্যবহারের দায়িত্ব থাকে সম্পূর্ণ অন্য কোম্পানীর উপরে. এখানেই একটা জটিল আইন সংক্রান্ত প্রশ্ন রয়েছে – কতদূর অবধি এই কেন্দ্রের নির্মাতা কোম্পানীর দায়িত্ব থাকবে সেই সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য, যা সম্পূর্ণ অন্য কোম্পানীর তরফ থেকে এই কেন্দ্র ব্যবহারের সময়ে উদ্ভব হতে পারে.

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রশ্ন ছাড়াও ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ সমস্ত প্রধান আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে নিজেদের অবস্থান যাচাই করে দেখবেন. দ্বিপাক্ষিক ভাবে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ছাড়াও রাশিয়া ও ভারত সক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও সহযোগিতা করছে, তার মধ্যে সেই সমস্ত আন্তর্জাতিক জোট রয়েছে, যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ, অর্থনৈতিক ভাবে বড় কুড়িটি দেশের জোট, ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা. রাশিয়া ভারতকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদ দেওয়ার বিষয়ে আহ্বান করেছে আর তারই সঙ্গে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থারও স্থায়ী সদস্য পদ পাওয়ার বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছে.

এই বছরে ভারত ও রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৬৫ বছর পালন করছে. যেমন বলা হয়ে থাকে যে, এখনই প্রকৃষ্ট সময়, যখন পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখা যেতে পারে কি করা হয়েছে ও ভবিষ্যতে কি করা হতে চলেছে.