0উত্তর কোরিয়া কিম চেন ইরের স্মৃতিতে তিন মিনিট মৌন্যতা পালন করেছে. তিনি নিজের দেশে আরও একটি পর্যবেক্ষণ সফরের সময়ে ২০১১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর দেহত্যাগ করেছিলেন. তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাশিয়া, চিন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড থেকে কোরিয়ার লোকদের প্রতিনিধি দল পিয়ংইয়ং শহরে এসেছেন. দক্ষিণ কোরিয়ার বেশ কিছু সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কিম চেন ইরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করা হলেও উত্তরের উপর থেকে মানবিক যোগাযোগের বিষয়ে সিওলের পক্ষ থেকে ট্যাবু হঠিয়ে নেওয়া হয় নি.

স্মৃতির অনুষ্ঠান বিশেষ সেই ট্রেন ছাড়া করা যায় নি. তাতে করে কিম চেন ইর ঐতিহ্য মেনেই রাশিয়া ও চিনে সফরে যেতেন. এবারে পিয়ংইয়ং শহরে বিশেষ ট্রেনে চড়ে আনা হয়েছে একদল বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিদকে. এঁরা সেই সমস্ত লোক, যাঁরা কিম চেন ইরের বাত্সরিকের পাঁচদিন আগে দেশকে বিশ্বের মহাকাশ বিজ্ঞানে উন্নত দশটি দেশের তালিকায় তুলে দিয়েছেন. কিম চেন ঈন তাঁদের মহাকাশের কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনের জন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন, যা করা হয়েছে কিম চেন ইরের উইলের সঙ্গে মিল রেখেই.

বহু বিশেষজ্ঞই, তাঁদের নিজেদের ইচ্ছা না থাকা স্বত্ত্বেও এই উড়ানকে বলেছেন “উত্তর কোরিয়ার বিস্ময়” বলেই. কারণ – এই কৃত্রিম উপগ্রহ উড়ান হয়েছে প্রায় ১০ ঘন্টা পরেই, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার গুপ্তচর সংস্থা যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য রকেট পরিবাহক খুলে নেওয়ার খবর দিয়েছিল. এই প্রসঙ্গে জ্বালানী ভরা নিয়ে কোন সংবাদ একেবারেই দেওয়া হয় নি.

সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, এই ঘটনা এমনকি চিনের জন্য ধাঁধা হয়েই রয়ে গিয়েছে. এই সম্বন্ধে পরোক্ষ ভাবে চিনের ইংরাজী ভাষার সংবাদপত্র “গ্লোবাল টাইমস” বুঝতে দিয়েছে. রকেট উড়ানের পরে তা উল্লেখ করেছে যে, চিনের এই এলাকার দেশ গুলির উপরে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ. সকলেই এখানে নিজেদের ভূমিকা পালন করছে, এমন ভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের নিজেদের জন্যই লাভজনক. যদিও তারা চিনের সহযোগী তবুও এটা উত্তর কোরিয়া সম্বন্ধেও একই রকম মনে করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর সুদূর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ইয়াকভ বেরগের বলেছেন:

“উত্তর কোরিয়ার উপরে চিনের প্রভাব ফেলার মতো মাধ্যম খুবই সীমিত সংখ্যক. তারা নিজেদের স্বাধীন, স্বয়ং নির্ভর ও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে যত্নশীল রাষ্ট্র বলেই প্রমাণের চেষ্টা করছে. এখানে চিন বা অন্য কোনও দেশ উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বকে বোঝাতে সক্ষম হবে না যে, কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না. তা স্বত্ত্বেও, উত্তর কোরিয়া সেই সমস্ত প্রক্রিয়ার উপরেই মনোযোগ দিয়ে থাকে, যা চিনের উদ্বেগের কারণ হতে পারে, আর একটা স্তর অবধি নিজেদের কাজকর্মের বিষয়ে চিনের সঙ্গে সহমতে থাকার চেষ্টা করে”.

এটা কোন স্তর অবধি, তা আপাততঃ, সম্পূর্ণ ভাবে বোঝা সম্ভব হচ্ছে না. যদি সেই গ্রীষ্মকালের শেষেই কিম চেন ঈনের চিন সফর সম্বন্ধে খবর পাওয়া গিয়ে থাকে তবুও সেই সফর এখনও বাস্তবায়িত হয় নি. তখন বেজিংয়ের কূটনৈতিক মহলের নাম জানাতে অনিচ্ছুক এক সূত্র থেকে খবর দেওয়া হয়েছিল যে, সফর স্থগিত হয়েছে গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের অষ্টাদশ পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তুতির জন্যই. কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন – বেজিংয়ে আলোচনা হচ্ছে পিয়ংইয়ং এর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সংশোধন নিয়ে. যেহেতু খুবই জেদী এই সহযোগী দেশ কিছুতেই চিনের মতো করে সংশোধন করতে চাইছে না ও খুব মন দিয়ে তাদের “বড় ভাইয়ের” উপদেশ শুনছে না, তাই সম্ভবতঃ, তাদের স্বাধীন ভাবে উড়তে ছেড়ে দেওয়াই ভাল ও এই সম্পর্ককে স্রেফ তাত্ক্ষনিক বা প্রত্যুত্পন্নমতিত্ত্ব অনুযায়ী সম্পর্ক হিসাবেই দেখা উচিত হবে কি? কিছু দিন আগে ঠিক এটাই চিনের ইংরাজী ভাষার “গ্লোবাল টাইমস” সংবাদপত্রে সমর্থন করা হয়েছে, তাতে স্বীকার করা হয়েছে যে, চিনের স্ট্র্যাটেজি বর্তমানে সেই প্রশ্নে দ্বিধায় ভুগছে যে, চিনের কোরিয়া উপদ্বীপ এলাকা নিয়ে কি নতুন করে নীতি বিন্যাসের প্রয়োজন পড়েছে.

কিম চেন ঈন খুবই যত্ন সহকারে তাঁর পিতার উত্তরাধিকারকে পালন করছেন. কিন্তু এটা তাঁর অবস্থানকে শক্ত করার জন্য কোন কারণ হয়ে দাঁড়ায় নি. উত্তর কোরিয়ার বহু লোকই বর্তমানের পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন. আর সেটা যেমন সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক উচ্চ মহলে, তেমনই বিশেষ করে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গাতেও. আর এর মানে হল যে, মার্শাল পদ ও দেশের সবচেয়ে বড় পদে আসীন থাকলেও কিম চেন ঈনের অবস্থান প্রশ্নাতীত ভাবে সুদৃঢ় নয়. আর সম্ভবতঃ, এই দিয়েই সেই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে যে, তিনি আপাততঃ তাঁর প্রথম বিদেশ সফরই করে উঠতে পারেন নি, যদিও চিনের অষ্টাদশ সম্মেলন একমাস আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে. আর কিম চেন ঈনের বেজিং সফর এমনকি সেই উপগ্রহ সমেত রকেট উড়ানের পরেই দ্বিতীয় ঘটনাও হতে পারত, যা প্রতীক হিসাবে পিয়ংইয়ং শহরে স্মৃতি সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অব্যবহিত আগেই খুব উল্লেখ যোগ্য হতে পারত.