সিয়াচেন হিমবাহ আবারও নিজের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে. গত রবিবারে ভোর রাতে এক শক্তিশালী তুষার ধ্বস নেমে সিয়াচেনের ভারতীয় সামরিক বাহিনীর পোস্ট চাপা দিয়ে চলে গিয়েছে, তাতে জীবন্ত অবস্থায় তুষারে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন সাত জন যোদ্ধা. এই বছরের এপ্রিল মাসে সেখানেই তুষার ধ্বসে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিলেন ১৪০ জন পাকিস্তানের সেনা. সিয়াচেনের নিহতদের সংখ্যা বাড়তেই থাকছে. ১৯৮৪ সাল থেকে হিমালয়ের এই উঁচু পাহাড়ী ও বিতর্কিত অঞ্চলে তুষার ধ্বস, শৈত্য প্রবাহ, উঁচু জায়গায় থাকার কারণে রোগ থেকে আট হাজারেরও বেশী ভারতীয় ও পাকিস্তানের যোদ্ধা প্রাণ দিয়েছেন. এটা দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধে প্রাণ হারানো লোকের চেয়েও সংখ্যায় বেশী, যা এই বিতর্কিত এলাকায় নানা সময়ে জ্বলে উঠেছিল.

বিষয় নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

যখন সিয়াচেনে আবার একটি মানবিক ট্র্যাজেডি উত্পন্ন হয়, তখন ভারত ও পাকিস্তানে আবার করে লোকে ভাবতে বসেন দুটি মূল প্রশ্ন নিয়েই – কেন ভারত ও পাকিস্তানের প্রয়োজন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ী বিতর্কিত এই এলাকার অধিকার ও এই সমস্যার কি কোন রকমের সমাধান হতে পারে?

হিমবাহের এলাকা প্রায় সাতশো স্কোয়ার কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে. এখানের আবহাওয়ার পরিস্থিতি খুবই চরম, আর শীতের মাস গুলিতে এখানে তাপমাত্রা নেমে গিয়ে হয়, মাইনাস ষাট ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের নীচে. এখানে বরফের আস্তরণ প্রায় দশ মিটারের বেশী পুরু ও প্রায়ই এই হিমবাহকে বলা হয়ে থাকে তৃতীয় মেরু নামে. সিয়াচেন মানুষের বসবাসের উপযুক্ত নয়. কিন্তু এখান থেকে দুই দেশের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ রেখার অপর পারে নজরদারি করা সহজ, যা এই হিমবাহের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানের স্বপক্ষে বলতে সাহায্য করে.

বেশ কয়েক দশক ধরেই ভারতীয় ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই বিতর্কিত এলাকা নিয়ে একে অপরের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত রয়েছে. হিমবাহের এলাকায় ও সব মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর কাশ্মীরে একাধিকবার গোলা গুলি বর্ষণ হয়েছে. ১৯৯৯ সালে কারগিল এলাকায় এক যুদ্ধ বেঁধেছিল, যার পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল.

সিয়াচেন হিমবাহের সমস্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিকবার দিল্লী ও ইসলামাবাদের মধ্যে চেষ্টা হয়েছে. ১৯৮৮ সালেই দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সহযোগিতা জোটের (সার্ক) শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী প্রকাশ করেছিলেন এক অপরের সঙ্গে আরও বেশী করে বন্ধুত্ব মূলক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য, তার মধ্যে সিয়াচেন সমস্যা সমাধানেরও ইঙ্গিত করা হয়েছিল. কিন্তু এই ও আরও অনেক প্রচেষ্টা শেষ অবধি কাগজেই সমঝোতার প্রয়াস হয়ে থেকে গিয়েছে.

তাও সিয়াচেনের সমস্যা সমাধানের অযোগ্য নয় বলেই মনে করা হয়ে থাকে, এই কথা উল্লেখ করে মস্কোর কার্নেগী সেন্টারের বিশেষজ্ঞ পিওতর তোপীচকানভ বলেছেন:

“সিয়াচেনের সমস্যা সমাধানের একটি উপায় হল – স্রেফ এটাকে আলাদা করে ফেলে রাখা, কিছু সময়ের জন্য তা নিয়ে আলোচনা বন্ধ রাখা, অর্থাত্ তার আইন সঙ্গত অবস্থান নিয়ে কোনও প্রশ্ন না করা. একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া উচিত্, যা কাশ্মীরের বিতর্কিত এলাকায় অর্থনৈতিক দিক থেকে জোট বাঁধতে সহায়তা করে, অর্থাত্ পরিবহনের ব্যবস্থা তৈরী করা, বাণিজ্যে উত্সাহ দেওয়া ও ভিসা ব্যবস্থা সহজ করা”.

এই কাজই বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তান করছে. গত সপ্তাহে ভারতে এসেছিলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রেহমান মালিক, যিনি ভিসা ব্যবস্থা সহজ করা নিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে গেলেন. এর আগে দুই দেশই একে অপরকে সবচেয়ে ভাল সুযোগের ব্যবস্থা করে দিয়েছে বাণিজ্য ক্ষেত্রে. ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে, মানবিক যোগাযোগ বাড়ছে. ভারত ও পাকিস্তান প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরী করতেই পারে, যাতে তাদের পক্ষে বিতর্কিত বিষয় নিয়ে যৌথ সমাধান পাওয়া সম্ভব হয়, তার মধ্যে সিয়াচেনের সমস্যাও রয়েছে.