সেন্সরের ভয় দেখিয়ে ইন্টারনেটের উপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও চিনকে নিজেদের একচেটিয়া অধিকার খর্ব করতে দেয় নি. আন্তর্জাতিক বৈদ্যুতিন যোগাযোগ জোটের দুবাই শহরের সম্মেলনে বিশ্ব জোড়া ইন্টারনেট জালের উপরে এই জোট সদস্যদের অধিকারের প্রশ্নে চুক্তি করাই শেষ অবধি সম্ভব হয় নি. গত ১৪৭ বছরের ইতিহাসে এই বিশ্বের টেলিযোগাযোগ জোটের প্রধান সংগঠনের কোন সম্মেলনই এত আবেগ ও সংঘর্ষ দিয়ে শেষ হয় নি, যা এবারে শেষ বৈঠকের সময়ে হয়েছে. তা ১৪ই ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে খুব একটা নির্দিষ্ট নয়, এমন একটা সমঝোতা পত্র দিয়ে, যেখানে বলা হয়েছে ইন্টারনেট ক্ষেত্রে এই জোটের আরও বেশী করে সক্রিয় ভাবে প্রবেশ করা দরকার বলে উল্লেখ করে.

এখানে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া আরও কয়েকটি দেশ স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছে. এর ফলে দলিল কোন কাজেই লাগবে না. রাশিয়া ও চিন প্রস্তাব করেছিল ইন্টারনেটে ঠিকানা ভাগ করে দেওয়ার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ জোটের দেশ গুলির উপরে ভাগ করে দিতে, অথবা রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধীনে আলাদা সংস্থা তৈরী করে তার হাতে দিতে. এখন এটা বাস্তবে আমেরিকার কোম্পানীদের একচেটিয়া অধিকার. প্রাথমিক ভাবে তথাকথিত আন্তর্জাতিক কর্পোরেশনের হাতেই রয়েছে, যার নাম ইন্টারনেট কর্পোরেশন ফর অ্যাসাইনড নেমস. তা স্বাধীন বলা হলেও, বাস্তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন.

রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা এক জোট হয়ে বলেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় না নিজেদের ইন্টারনেটে একচেটিয়া অধিকার খর্ব হতে দিতে. সমস্ত প্রধান রিসোর্সেস, সার্ভার ও ইন্টারনেটে বের হওয়ার প্রোটোকল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই হাতে রয়েছে, তাই এটা মনে করিয়ে দিয়ে রাশিয়া মিডিয়া- এক্সপার্ট আন্তন কারবকোভ- জেমলিয়ানস্কি বলেছেন:

“আন্তর্জাতিক বৈদ্যুতিন যোগাযোগ জোট অনেকদিন আগে থেকেই বলছে যে, নির্দিষ্ট আইন তৈরী হওয়া দরকার. যাতে সমস্ত দেশই একটি নির্দিষ্ট আইনের ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে, যা নিয়ে নিজেরাই একে অপরের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে. যাতে সবই বোধগম্য ও স্বচ্ছ থাকে. কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই এই ধরনের উদ্যোগে সায় দিচ্ছে না ও কারও সঙ্গে চুক্তি করতেই তৈরী নয়, তারা বলছে যে, নিজেরাই সব ঠিক করবে”.

রাশিয়া ও চিনের উদ্যোগ সমর্থন করেছে ব্রিকস দেশ গুলি, স্বাধীন রাষ্ট্র সমূহ, বাহরিন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী ও অন্যান্য দেশ. অনেক দেশেরই ভাল লাগে নি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইন্টারনেটের মতো এত শক্তিশালী মাধ্যম পরিবাহকের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কব্জা করে রেখেছে.

আমেরিকা নিজেদের একচেটিয়া অধিকার বজায় রাখার জন্য লড়াই এই দুবাই সম্মেলনের প্রায় এক বছর আগে থেকেই করেছে. বহু রাষ্ট্রেরই ভাল লাগে নি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিজেদের কাছে রেখেছে ও তাদের পররাষ্ট্র বিভাগ, সেনেট, কংগ্রেস বাণিজ্য মন্ত্রক, সমস্ত রাষ্ট্রদূতাবাস, বাণিজ্য প্রতিনিধি, তাদের ইন্টারনেট রিসোর্সেস এই কাজে নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করেছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুবাই শহরে নিজেদের দেশ থেকে সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে – একশ জনেরও বেশী সরকারি প্রতিনিধি. রাশিয়া ও চিনের প্রস্তাবকে তারা পেশ করেছে যেন বাক স্বাধীনতার উপরে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে, সেন্সর করার চেষ্টা বলে, ইন্টারনেটের উপরে “হাতকড়া লাগানো” বলে.

কিন্তু রাশিয়ার প্রস্তাবে এমনকি এর ধারে কাছেও যেতে পারে এমন কোনও কথাই বলা হয় নি, এই কথা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ ইলিয়া রাচেনিকভ বলেছেন:

“এখানে সেন্সর নিয়ে কথা হচ্ছে না. কথা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়ে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্রেফ চায় এই যন্ত্রকে নিজেদের হাতেই রাখতে. আর সেন্সরের ধারণা এটা স্রেফ একটা ছুতো”.

রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি বিশেষ বিভাগ হল আন্তর্জাতিক বৈদ্যুতিন যোগাযোগ জোট – তাতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ১৯৩ সদস্যের সকলেই রয়েছে. শেষবার এই জোট আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নিয়ম সংশোধন করেছে ১৯৮৮ সালে. তখন বিশ্বে মাত্র ৪৫ লক্ষ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ছিলেন, আর এখন রয়েছেন প্রায় ছয়-শ’ কোটি. আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় সাড়ে চারশো কোটি মানুষ.