রবিশঙ্করের মৃত্যু রাশিয়াতে খুবই গভীর শোকের কারণ হয়েছে. তাঁকে আমাদের দেশে ভাল করেই লোকে জানেন ও ভালও বেসেছেন. রবিশঙ্কর একাধিকবার রাশিয়াতে এসেছেন. তাঁরই কল্যাণে বহু রুশ মানুষ ভারতীয় সঙ্গীত সম্বন্ধে জানতে ও তা ভালবাসতে পেরেছেন. রবিশঙ্কর ও তাঁর সঙ্গীতের সঙ্গে প্রত্যেক বারের সাক্ষাত্কারই মানুষের জন্য এক বিরাট উত্সবে পরিণত হয়েছিল, তাঁরা সত্যিকারের ভারতকে এর মধ্যে দিয়েই চিনেছেন. রবিশঙ্করের সেতারের উপরে অসামান্য দখল সকলকে স্রেফ হতবাক করে দিয়েছে. আমাদের দেশে রবিশঙ্করকে মনে করা হয়েছে সেতারের রাজা বলেই, এই কথা উল্লেখ করে ভারত অনুসন্ধান কেন্দ্রের ডিরেক্টর তাতিয়ানা শাউমিয়ান বলেছেন:

“সত্যই উনি ছিলেন এক মহান ব্যক্তিত্ব, মহান সঙ্গীত শিল্পী, যিনি সারা বিশ্বেই ছিলেন বিখ্যাত. তিনি ভারতীয় দেশী সঙ্গীত এমন ভাবেই পেশ করতেন, যা যেমন ভারতীয় তেমনই তাদের চেয়ে একেবারেই অন্য সংস্কৃতির মানুষরা, যাঁরা ইউরোপ, রাশিয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত, তাঁরাও শুনতে পারতেন. তাঁর মধ্যে থেকেই একটা অনুপ্রেরণা উত্সারিত হত. যা তাঁর প্রতিই মনোযোগ ও গভীর আগ্রহের সৃষ্টি করত. যদিও তিনি ঐতিহ্য মেনেই বাজাতেন, তাও তিনি নিজে ছিলেন খুবই আধুনিক. শুধুশুধুই বিশ্বের বহু সঙ্গীত শিল্পীই, তা সেই বীটলস দল থেকে শুরু করে আমাদের দেশের সঙ্গীত শিল্পীরা পর্যন্ত তাঁর কাছে গুরু মেনে নিয়ে আসতেন না, তাঁর কাছে শিখতে যেতেন না. এই মানুষটি এক বিশাল প্রভাব ফেলতেন. যখন রবিশঙ্কর আমাদের কাছে রাশিয়াতে আসতেন, তখন বহু লোকের ভীড় সেই সমস্ত হলের বাইরে অপেক্ষা করে থাকত একটি বাড়তি টিকিট পেয়ে প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশের আশায়. তাঁর অনুষ্ঠান শোনার জন্য অধীর হয়ে থাকতেন ও স্বপ্ন দেখতেন তাঁর সঙ্গীত শোনার. এই সব ভোলা যায় না”.

ষাট বছর ধরে ভারতের এই বহু গুণান্বিত শিল্পী মঞ্চে বাজিয়েছেন ও তিনি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে রয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশী দিন ধরে পেশাদার সঙ্গীত পরিবেশনের কারণেই. সংবাদ মাধ্যম তাঁর নাম দিয়েছে “ভারতীয় মোত্সার্ট” বলে. রবিশঙ্কর রাশিয়া ও পশ্চিমে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করার জন্য বিরাট কাজ করে গিয়েছেন. তাঁর কাছ থেকে সেতার বাজানোর শিক্ষা নিয়েছেন এক সময়ে বীটলস দলের প্রাক্তন গিটার বাদক জর্জ হ্যারিসন. পরে তিনি রবিশঙ্করকে নাম দিয়েছিলেন “বিশ্ব সঙ্গীতের গড ফাদার” বলে. ১৯৬৯ সালে রবিশঙ্কর বিখ্যাত উডস্টক রক- ফেস্টিভ্যালে বাজিয়ে ছিলেন, আর ১৯৮০র দশকে আমেরিকার বেহালা বাদক ও সঙ্গীত পরিচালক ইহুদী মৈনহুইনের সঙ্গে বেশ কিছু কনসার্টে বাজিয়েছেন.

বিশেষ করে উষ্ণ অনুভূতি নিয়ে তিনি সব সময়েই নিজের রাশিয়া ভ্রমণ নিয়ে বলতেন, আমাদের দেশের মানুষদের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়া নিয়ে বলতেন. সম্ভবতঃ এই ধরনের স্মৃতিই তাঁর মনে রুশ নাম আন্না অথবা যা আমাদের দেশে আদর করে আন্নুশকা বলা হয়, সেটাই রয়ে গিয়েছিল. এই নাম তিনি নিজের এক মেয়েকে দিয়েছিলেন – অনুষ্কা শঙ্কর, প্রায়ই যিনি তাঁর বাবার সঙ্গে বিগত কিছু বছরে বাজাতেন. বহু লোকই রাশিয়াতে রবিশঙ্করকে মহান রুশ কবি আলেকজান্ডার পুশকিনের মতো দেখতে বলে মনে করতেন. তাঁর প্রথম বারের রাশিয়া ভ্রমণের সময়ে সেই ১৯৫৪ সালে একজন রুশ চিত্র পরিচালক তাঁকে পুশকিনের ভূমিকায় সিনেমাতে অভিনয় করার প্রস্তাবও করেছিলেন, যা তিনি সেই সময়ে তৈরী করার পরিকল্পনা করছিলেন. রবিশঙ্কর এই নিয়ে তাঁর নিজের আত্মজীবনী “আমার সঙ্গীত- আমার জীবন” বইতে লিখেছেন.

রবিশঙ্করের সৃষ্টি রাশিয়ার সাংস্কৃতিক জগতের বহু বিখ্যাত লোকের মনেই গভীর প্রভাব ফেলেছে. জানাই আছে যে, যেমন মিখাইল ফোকিন রচিত “শাহেরজাদা” ব্যালেতে, তেমনই ইউরি গ্রিগরোভিচের “লিজেন্ড অফ লাভ” নাটকে সঙ্গীত তৈরী হয়েছিল রবিশঙ্করের সেতারে বাজানো সঙ্গীতে প্রভাবিত হয়ে. বিখ্যাত রক গ্রুপ “কিনো” (সিনেমা)র লিড সিঙ্গার ভিক্টর ত্সই তাঁর সম্বন্ধে একটি গানে লিখেছিলেন: “কে এটা নিয়ে বাজিয়েছে? কার এই সেতার? এই সেতারে বাজিয়েছেন নিজে রবিশঙ্কর”.

নিজের দীর্ঘ ও উজ্জ্বল জীবনে রবিশঙ্কর বহু পুরস্কার পেয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে তিনটি “গ্র্যামি” পুরস্কারও. তাদের মধ্যে রাশিয়ার পুরস্কার – “পিটার দ্য গ্রেটের” নামাঙ্কিত জাতীয় পুরস্কার.

রাশিয়ার লোকরা এই মহান ভারতীয়ের দেহাবসানে গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করছে সমস্ত ভারত ও ভারতবাসীর উদ্দেশ্যেই.