চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্য অনুযায়ী আলোচনার মঞ্চকে এবারে সক্রিয় করতে চেয়েছে, যাতে পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মতবিরোধ আগে থেকেই রোধ করা সম্ভব হতে পারে, এই আশা নিয়ে. ১৮-১৯ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে শুরু হতে চলেছে চিন-আমেরিকা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিষদের বৈঠক. এটা বাণিজ্য ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি প্রথম আলোচনা চালু রাখার ব্যবস্থা. প্রথমবার তা সক্রিয় করা হয়েছিল সেই ১৯৮৯ সালে.

এই আলোচনার প্রাক্কালে চিনের বাণিজ্য সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের সরকারি প্রতিনিধি শেন দানিয়ান ঘোষণা করেছেন যে, এর আগে পরিষদের ২২টি আলোচনায় সফল হয়েছিল. তারই মধ্যে এই সমস্ত সাক্ষাত্কারের সময়েই আমেরিকার উচ্চ প্রযুক্তি চিনে রপ্তানীর সম্বন্ধে সমস্ত চেষ্টাই আমেরিকার কঠোর অবস্থানের গায়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিহত হয়েছে. তারই সঙ্গে চিনের এই দেওয়ালের মধ্যে কোন রকমের ছিদ্র তৈরী করার চেষ্টাও, যা আমেরিকার লোকরা তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সমস্ত ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরী করে রেখেছে.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে চিনের অর্থনীতিতে সত্যিকারের বিনিয়োগের পরিমান প্রায় সাত হাজার কোটি ডলার. আর চিনের আর্থিক ও অন্যান্য বিনিয়োগ, যা আমেরিকায় রয়েছে তা এক হাজার কোটি ডলারেরও কম.

চিন আশা করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় ভাবে চিনের পক্ষ থেকে করা উদ্বেগের সম্বন্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, এই কথাই চিনের বাণিজ্য মন্ত্রকের সরকারি মুখপাত্র ঘোষণা করেছেন. তা খুবই দ্রুত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারের সময়ে. তখন দুই প্রার্থীই চিনকে আহ্বান করেছিলেন বাজারে নিয়ম মেনে খেলতে ও ইউয়ানের বিনিময় মূল্য নিয়ে কৃত্রিম ভাবে নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে. এই সময়েই আবার চিনের দুই টেলিযোগাযোগ কোম্পানী হুয়াওয়েই ও জেডটিই কে জড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে গুপ্তচর বৃত্তি নিয়ে স্ক্যান্ডাল করা হয়েছিল. চিন নিজেদের দিক থেকে আমেরিকার বিরুদ্ধে বিষোদগারের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল, এই কথা উল্লেখ করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর সুদূর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার লারিন বলেছেন:

“দুই পক্ষই এর মধ্যে অনেকবার একেবারেই মিত্র সুলভ নয় এমন সব বক্তৃতা বিনিময় করেছে. সব দেখে শুনে মনে হয়েছে, যে, দুই পক্ষের মধ্যেই এই ধরনের পরিবেশ এখনও বজায় রয়েছে, আর সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে আরও খারাপই হবে”.

এই ধরনের মূল্যায়নের স্বপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় গুপ্তচর বিভাগের তরফ থেকে করা সাবধান বাণীও বলে দিচ্ছে, ২০৩০ সালে চিনের অর্থনীতি খুব সম্ভবতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পার হয়ে যাবে ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হবে. এই ধরনের পূর্বাভাস, তার মধ্যে আবার অনেক বেশী সাহসী, এর আগেও অনেকবার করা হয়েছে. কিন্তু এই বারের মূল্যায়ণ যে মার্কিন গুপ্তচর বিভাগের তরফ থেকে করা হয়েছে, সেটাকে অনেকে বিশেষজ্ঞই মনে করেছেন চিনকে আটকে রাখার জন্য একটা ইঙ্গিত হিসাবেই. এই প্রসঙ্গে মস্কোর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আলেক্সেই ভস্করেসেনস্কি বলেছেন:

“এখানে মনোযোগ দেওয়া দরকার শুধু একটি বাস্তব বিষয়ের দিকেই. এই রিপোর্ট তৈরী ও পেশ করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিশ্লেষণ বিভাগের তরফ থেকে, যা রাষ্ট্রের পরবর্তী কালের দিক ও গতি প্রকৃতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিক কাজকর্ম নিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল – অর্থনীতি, সামরিক নীতি, রাজনীতি, সমস্ত ক্ষেত্রেই. মনে হচ্ছে, এর পরে বাস্তব সিদ্ধান্তই নিতে দেখা যাবে. তা না হলে, এই রিপোর্ট এই সংস্থা প্রচার করত না”.

যাতে চিনকে আটকে রাখা সম্ভব হয়, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুবই সক্রিয় হয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার জন্য. গত দুই বছরে তারা চিন নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় এত বেশী অভিযোগ রপ্তানী বিষয়ে চিনের তরফ থেকে বাড়তি সুবিধা ও ছাড় দেওয়া নিয়ে করেছে, তা এর আগের আট বছরে কখনও করা হয় নি. প্রসঙ্গতঃ, এর মধ্যে প্রথম তিনটি অভিযোগই চিনের তরফ থেকে রেয়ার আর্থ মেটাল সংক্রান্ত কোটা নির্ধারণ, সোলার ব্যাটারি বিক্রীর বিষয়ে ড্যাম্পিং ও আমেরিকার মোটর গাড়ী আমদানীর সম্বন্ধে চিনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে করা হয়েছে, যা এখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মীমাংসা পরিষদ বিচার করে দেখছে.

চিন তারই সঙ্গে বাধ্য হয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যেতে, নিরপেক্ষ সালিশ সংক্রান্ত সভায় আবেদন করতে. তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রায় তিরিশটি মামলা দায়ের করেছে, তাদের বাণিজ্য সংক্রান্ত সংরক্ষণশীলতা ও নিজেদের উত্পাদকদের আলাদা করে অর্থ সাহায্য করা নিয়ে. আর এটা আমেরিকার বাজার থেকে চিনের জিনিষ বের হয়ে যেতে বাধ্য করছে – সাধারন তালা থেকে গাড়ীর টায়ার পর্যন্ত অনেক কিছুই.

এই রকমের পরিস্থিতিতে চিন-আমেরিকার ব্যবসা-বাণিজ্য পরিষদের ওয়াশিংটনে হতে যাওয়া বৈঠক হতে পারে যে, একেবারেই স্রেফ নিয়ম মেনে করা অনুষ্ঠানের মতো. হাত মেলানো হবে- চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের প্রধান আর্থ-বাণিজ্য সহযোগী দেশ. কিন্তু সন্দেহ রয়েছে যে, এই করমর্দন মোটেও অকপট ভাবে ও মজবুত হবে না.