মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার কৃত্রিম উপগ্রহ উড়ানকে বলেছে “খুবই প্ররোচনা মূলক কাজ, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক”. কিন্তু আসলে এই এলাকার জন্য সত্যিকারের বিপদ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে উত্তর কোরিয়াকে স্বীকার না করার বিষয়ে তীব্র অনীহা ও তাদের আক্রমণ না করার গ্যারান্টি দেওয়া, এই রকমই মনে করেছেন মস্কোর রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মী আন্দ্রেই ইভানভ.

১৯৯৮ সালে উত্তর কোরিয়ার লোকরা ঘোষণা করেছিলেন প্রথম বৈজ্ঞানিক কৃত্রিম উপগ্রহ “কোয়ানমিওনসন – ১” ছাড়ার কথা. কিন্তু পিয়ংইয়ংয়ের জন্য আশ্চর্য জনক ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বৈজ্ঞানিক উপগ্রহ উড়ানকে দেখেছিল সুদূর উড়ানে সক্ষম রকেট পরীক্ষা হিসাবেই, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এলাকাকে অতিক্রম করতে সক্ষম. আর তখন তারা বলে উঠেছিলেন উত্তর কোরিয়ার তরফ থেকে রকেট আক্রমণের বিষয়ে. উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম চেন ইর তখন আমেরিকার লোকদের এই ভয়কে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন: বোধহয়, আমেরিকার লোকরা মনে করে আমাদের নির্বোধ, যদি তারা ভাবতে পারে যে, ছোট উত্তর কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে – একটা বিশাল দেশকে, যাদের প্রচুর পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে. ১৯৯৮ সালের রকেট উড়ানের লক্ষ্য ছিল সামরিক লক্ষ্য থেকে অনেক দূরেই, সেই রকম মনে করে আন্দ্রেই ইভানভ বলেছেন:

“প্রাথমিক ভাবে পিয়ংইয়ং চেয়েছিল আমেরিকার লোকদের জোর দিয়ে বলতে যে, তাদেরকে হিসাবের মধ্যে রাখার দরকার আছে, তাদের সঙ্গেও চুক্তি করতে হবে. আর তারা নিজেদের এই লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছিল. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে খুবই সক্রিয়ভাবে পরামর্শ চালু হয়েছিল, যা ১৯৯৯ সালে মার্কিন তত্কালীন পররাষ্ট্র সচিব ম্যাডলেন অলব্রাইটের উত্তর কোরিয়া সফর অবধি পৌঁছেছিল. এই ধরনের চুক্তিও হয়েছিল যে, উত্তর কোরিয়া সুদূর লক্ষ্যে পৌঁছনোর উপযুক্ত রকেট পরীক্ষা বন্ধ করবে, আর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে সাহায্য করার বিষয়ে সক্রিয়তা বৃদ্ধি করবে, যাতে তারা উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান জ্বালানী শক্তির চাহিদা মেটানোর জন্য নিজেদের দেশে পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করতে পারে”.

এখানে সমস্যা হল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেই রকমের রাজনীতিবিদের অভাব নেই, যারা মনে করেন যে, উত্তর কোরিয়াকে সাহায্য করার দরকার নেই, আর তাদের অর্থনীতিকে এই ভাবেই শ্বাসরোধ করার দরকার, যাতে তারা নিজে থেকেই দক্ষিণ কোরিয়ার দখলে চলে যায়. এই ধরনের লোকদের অবস্থান ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে জর্জ বুশ জুনিয়রের আগমনের পর থেকেই শক্ত হয়েছিল. তার প্রশাসনের লোকদের উত্তর কোরিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবে একঘরে হয়ে থাকা থেকে বেরিয়ে আসা ভাল লাগে নি, যা শুরু হয়েছিল কিম চেন ইর ও দক্ষিণ কোরিয়ার তত্কালীন নেতা কিম দে জুনের পিয়ংইয়ং শহরে ২০০০ সালের সাক্ষাত্কার দিয়ে. তখন শুরু হয়েছিল বেশ কিছু পশ্চিমের দেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক ভাবে উত্তর কোরিয়াকে স্বীকার করে নেওয়ার কাজ. এটা উত্তর কোরিয়াকে পূর্বাভাসের অযোগ্য ও বিপজ্জনক দেশ বলে, যে ছবি তৈরী করা হয়েছিল, তার ঔজ্জ্বল্য ম্লান করে দিচ্ছিল এবং এই এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির জন্য উপযুক্ত কোনও কারণও দেখাতে দিতে পারছিল না. আমেরিকার সরকার এর সঙ্গে একমত হতে পারে নি আর তারা সেই জন্য সব কিছুই করেছিল, যাতে কোরিয়া উপদ্বীপ এলাকায় ইতিবাচক সমস্ত প্রক্রিয়ার ইতি হয়, যা একেবারেই আমেরিকার চিত্রনাট্য অনুযায়ী হচ্ছিল না. তাই আন্দ্রেই ইভানভ বলেছেন:

“সেই সময়ে, যখন উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরীর জন্য রিয়্যাক্টরের নীচের ভিত তৈরী করে ফেলেছিল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নামে অভিযোগ এনেছিল যে, তারা নাকি গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে. কোন রকমের প্রমাণ এই কারণে আমেরিকা উপস্থিত করতে পারে নি, কিন্তু দাবী করেছিল উত্তর কোরিয়ার রিয়্যাক্টর বন্ধ করে দেওয়ার জন্য. পিয়ংইয়ং এই অন্যায় অভিযোগের ঘটনায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল ও তারা আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে পারমানবিক অস্ত্র প্রসার নিরোধ চুক্তি থেকেও নিজেরা প্রত্যাহত হয়ে গিয়েছিল. একই সঙ্গে শুরু করেছিল সামরিক লক্ষ্যে প্লুটোনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ”.

সেই সময়ে শুরু হয়েছিল, তথাকথিত উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক পরিকল্পনা. এই সমস্যার সমাধানের জন্য শুরু করা হয়েছিল ছয় পক্ষের আলোচনা, যেখানে অংশ নিয়েছিল উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন, রাশিয়া ও জাপান. বিশেষজ্ঞরা এখানে একটা নিয়ম লক্ষ্য করতে পেরেছেন: যেই এই আলোচনাতে কোন একটা চুক্তিতে পৌঁছনো সম্ভব হয়েছে, তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে উত্তর কোরিয়ার উপরে দাবী বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে আগে পৌঁছনো চুক্তি সব নষ্ট হয়েছে আর সমঝোতা করার সম্ভাবনাই বন্ধ হয়েছে. এমন একটা ধারণা তৈরী হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছা করেই এই কাজ করছে, যাতে উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে কোন সমাধানে পৌঁছনো না যায়. তাই আবারও ইভানভ বলেছেন:

“এই সবই করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পছন্দসই নয় এমন সব প্রশাসনের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের রাজনীতির সঙ্গে একত্রে – তা আফগানিস্তানই হোক অথবা ইরাক. তারপরে হয়েছে লিবিয়াতে, যারা এক সময়ে পারমানবিক অস্ত্র সৃষ্টি করার বিষয় থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, যা আবার সেই পিয়ংইয়ংয়ের মতে বিদেশী অনুপ্রবেশের জন্য পথ খুলে দিয়েছিল ও একই সঙ্গে মুহম্মর গাদ্দাফির প্রশাসন ও তাঁকে হত্যার কারণ হয়েছে. গাদ্দাফির প্রশাসনের ভাগ্য একেবারেই পিয়ংইয়ংকে নিশ্চিত করেছে যে, পারমানবিক পরিকল্পনাই হল একমাত্র প্রশাসনের নিরাপত্তার গ্যারান্টি. সেই কারণেই উত্তর কোরিয়া দুই বার পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেছে. যা উল্লেখযোগ্য – কারণ এই গুলি ছিল প্লুটোনিয়াম অস্ত্র, কারণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কোনও পরিকল্পনা তাদের খুব সম্ভবতঃ কখনই ছিল না, এমনকি আমেরিকা এই নিয়ে রটনা করা স্বত্ত্বেও. তারা এটা একেবারেই অল্প কিছু দিন আগে শুরু করেছে. আর এখন তারা তৃতীয় বারের প্রচেষ্টায় কৃত্রিম উপগ্রহও পাঠাতে পেরেছে”.

কোন রকমের উপরোধ, কোন রকমের নিষেধাজ্ঞাই উত্তর কোরিয়াকে থামতে পারবে না. পিয়ংইয়ংয়ের প্রয়োজন শুধু একটাই: যাতে ওয়াশিংটন উত্তর কোরিয়াকে রাষ্ট্র মর্যাদা দেয় ও সেই বিষয়ে মজবুত গ্যারান্টি দেয় যে, তারা শক্তি প্রয়োগ করে উত্তর কোরিয়ার প্রশাসকে বদলাবার চেষ্টা করবে না, এই কথাই মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.