প্রিয় বন্ধুগণ! শুরু করছি আমাদের নিয়মিত সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান – ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’..

এই অনুষ্ঠানে আমরা রাশিয়ার সম্মন্ধে আপনাদের অবহিত করি সেই সব বিষয় নিয়ে, যেসব আপনাদের কাছে আগ্রহোদ্দীপক.

আর তাই আমরা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরিশাসে আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে অনুরোধ করবো যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন আমাদের কাছে পাঠাতে! লিখুন সেই সম্পর্কে, যে বিষয়ে আপনারা জানতে ইচ্ছুক. আমাদের অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিন.

আজ আমরা নিম্নোক্ত প্রশ্নাবলীর উত্তর দেব:

কবে ও কিভাবে রাশিয়া রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল? এই প্রশ্নটি আমাদের পাঠিয়েছেন ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের রায়বেরিলি থেকে ময়াঙ্ক শ্রীবাস্তব.

রাশিয়ায় দীর্ঘতম গুহাটির দৈর্ঘ্য কতখানি? – প্রশ্ন করেছেন ভারতেরই উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের গোরখপুর থেকে বদ্রীপ্রসাদ ভার্মা. অতএব প্রথম প্রশ্নটির উত্তর দিতে শুরু করছিঃ কবে ও কিভাবে রাশিয়া রাষ্ট্রের পত্তন হয়েছিল?

সম্প্রতি প্রাচীন রুশী শহর নোভগোরদে, ইদানীং যাকে মহান নোভগোরদ নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ও যে শহরটি মস্কো থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত, সেখানে রুশী রাষ্ট্রের ১১৫০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করা হল. নবম শতাব্দীতে সেখানে অনর্গল যুদ্ধমান সব স্লাভিয়ান ও অন্যান্য উপজাতির লোকজন বসবাস করতো. ৮৬২ সালে ঐ সব উপজাতির মোড়লরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করা বন্ধ করার সিদ্ধান্তে পৌঁছায়. সেই উদ্দেশ্যে শাসনক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য রাজা রিউরিককে তারা আমন্ত্রণ জানায়, যে কিনা যুদ্ধরত কোনো উপজাতিরই অন্তর্ভুক্ত ছিল না. রিউরিক ছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়ার রাজা, তবে তার মায়ের বংশ ছিল স্লাভিয়ান. সে স্লাভিয়ান ভাষায় কথাবার্তা বলতে পারতো, যে ভাষায় কথাবার্তা বলতো নোভগোরদের বাসিন্দারা.

মনে হয়, যে ভারতীয় উপ-মহাদেশে আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের জন্য এ ব্যাপারে একটু বিষদে বলা প্রয়োজন. স্লাভিয়ান ভাষা সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন অঞ্চলে বদলাতে থাকে, যার ফলে রুশ, বেলোরুশ, ইউক্রেনীয়, পোলিশ প্রভৃতি ভাষার উদ্ভব হয়. যেমন ভারতবর্ষে সংস্কৃত থেকে বাংলা, হিন্দী, পাঞ্জাবী ইত্যাদি ভাষা জন্ম নিয়েছিল.

হ্যাঁ, তবে যাই হোক আমরা ইতিহাসের প্রসঙ্গ থেকে সরে এসেছি. রাজা রিউরিক নোভগোরদের শাসনভার হাতে নিতে সম্মত হয়েছিলেন. এভাবেই জন্ম নেয় রুশদেশে প্রথম সাম্রাজ্য – রিউরিকদের, যারা সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের শাসনক্ষমতায় ছিল.

ধরা হয়, যে দেশের নাম রুশ বা রাশিয়া এসেছে তত্কালীন গ্রীক ভাষা থেকে. আধুনিক রাশিয়ার ভুখন্ডে সেযুগে স্বাধীন রাজ্যগুলির নামকরন করা হয়েছিল তাদের রাজধানীর নামে – নোভগোরদ, কিয়েভ, ভ্লাদিমির, মস্কো রাজ্য প্রভৃতি.

নোভগোরদ রাজ্য মোটেই তেমন বড় ছিল না. কিন্তু তাহলে রাশিয়া কিভাবে এত বড় দেশের আকার ধারন করলো?

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রায় ১৫টি স্লাভিয়ান ও অন্যান্য উপজাতির রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল. সেখানকার রাজারা, যাদের মধ্যে ছিল রিউরিকের বংশধরেরা ও অন্যান্য উপজাতির রাজারা, তারা শতকের পর শতক ধরে মত্ত ছিল জমি দখলের জন্য লড়াইয়ে. তাদের বচসা-বিবাদের সুযোগ নিয়ে তাতার-মোঙ্গল ভবঘুরেরা ঐ সব রাজ্য জয় করে ভোলগা নদীর নিম্ন প্রবাহের অঞ্চলে সোনার ওর্দা নামে নিজেদের সাম্রাজ্য কায়েম করে ও রুশী রাজাদের তাদের কর ও উপঢৌকন দিতে বাধ্য করতো. তবে আগ্রাসকদের জন্য রুশী রাজারা প্রায় একজোট হয়, যাদের সামনে ছিল এক ও অভিন্ন শত্রু – তাতার-মোঙ্গলরা. অবশেষে স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য রুশী জনগণের সংগ্রাম জয়লাভ করে ও ১৪৮০ খ্রীষ্টাব্দে সোনার ওর্দা সাম্রাজ্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়.

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী ঘটে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে. মস্কো রাজ্য তার সাম্রাজ্য প্রসারিত করতে করতে যথেষ্ট পরিমানে মজবুত হয়ে ওঠে. সেই সুবাদেই ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে রাজা চতুর্থ ইভান, যাকে সাধারন মানুষ ইভান দ্য টেরিবল নামে অভিহিত করেছিল, সে নিজেকে গোটা রাশিয়ার জার(সম্রাট)বলে ঘোষনা করতে পেরেছিল. তার রাজত্বকালেই ভোলগা উপকূলবর্তী সব এলাকাকে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয় ও সাইবেরিয়াকে আয়ত্ত করার কাজ শুরু হয়েছিল.

জার ইভান দ্য টেরিবল গত হওয়ার পরে তার কোনো উত্তরাধিকারী আর জীবিত ছিল না. দেশে শুরু হল চরম অরাজকতা, যার অবসান ঘটে ১৬১৩ সালে নতুন জার(সম্রাট) মিখাইল রোমানভকে নির্বাচিত করা হওয়ার পরে, যার মায়ের বংশের দিক দিয়ে রিউরিক পরিবারের সাথে রক্তের সম্পর্ক ছিল. রোমানভ সাম্রাজ্য ৩০০ বছরেরও অধিককাল ধরে দেশের শাসনক্ষমতায় আসীন ছিল.

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে জার প্রথম পিটার(রোমানভ) নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষনা করেন ও রাজধানী সেন্ট-পিটার্সবার্গে স্থানান্তরিত করেন. তাঁর শাসনকালে ও পরবর্তীতে দ্বিতীয় ক্যাথেরিনের রাজত্বকালে রুশী সাম্রাজ্য আরো অনেকখানি প্রসারিত হয়েছিল. রুশ সাম্রাজ্য সুইডেনকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাল্টিক সাগরে ও তুর্কীদের উপকূলবর্তী এলাকা থেকে তাড়িয়ে কৃষ্ণ সাগরে অবাধ গতিবিধির অধিকার অর্জন করেছিল. প্রাচীনকাল থেকে ঐ সব এলাকা স্লাভিয়ানদের দখলে থাকলেও, পরবর্তীকালে সুইডিশ ও তুর্কীরা ঐ সব ভুমি দখল করে.

রুশ সাম্রাজ্যের প্রসার হয়েছিল শুধুমাত্র যুদ্ধযাত্রা করেই নয়. জর্জিয়া, কালমিকিয়া, দাগেস্তান, চেচনিয়া ও বুরিয়াতিয়া তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় রোমানভ জারেদের অনুরোধ করেছিল তাদের ছত্রছায়ায় নেওয়ার জন্য. আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া ইউরোপীয়দের মতো রুশীরা তাদের নির্মুল করেনি, বরং তাদের রুশী সংস্কৃতি ও আচার-ব্যবহারের সাথে মানিয়ে নিতে উত্সাহ দিত.

১৯১৭ সালে বিপ্লবের দরুন বলশেভিকরা দেশের ক্ষমতা দখল করে. তারা জার রোমানভ সহ তার গোটা পরিবারকে হত্যা করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পত্তন করে. তবে তারা পূর্বতন রুশী সাম্রাজ্যের গোটা অঞ্চলে তাদের শাসন কায়েম রেখেছিল. কেবল ব্যতিক্রম ছিল ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ড, যাদের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল, যদিও আগে তারাও ছিল রুশী জারেদের সাম্রাজ্যের অধীনস্থ. মস্কো আবার রাজধানীর মর্যাদা পেল.

সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৫টা প্রজাতন্ত্র ছিল. ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বহুবিভক্ত হয়ে যায়, তখন প্রতিটি প্রজাতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়. রাশিয়াও স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করে. সংক্ষেপে এই হচ্ছে রুশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস. এখানে আমরা বলিনি আমাদের দেশের উপর আগ্রাসকদের সেইসব অসংখ্য হামলার প্রতিরোধে যুদ্ধের কাহিনী. তবে সে সব হল অন্য ইতিহাস.

 

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ নামক আমাদের অনুষ্ঠান শুনছেন আপনারা ‘রেডিও রাশিয়া’ থেকে. উত্তর প্রদেশ রাজ্যের গোরখপুর থেকে বদ্রীপ্রসাদ ভার্মা জানতে চেয়েছেন, যে রাশিয়ায় সবচেয়ে গভীর গুহার দৈর্ঘ্য.

বিজ্ঞানীদের গবেষনা অনুযায়ী দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কারেলিয়া প্রদেশে বোতভ গুহাই সবচেয়ে গভীর. এখনো পর্যন্ত মনে করা হচ্ছে, যে তার দৈর্ঘ্য ৬০ কিলোমিটার.

এখনো পর্যন্ত কেন?

তার কারন হল এই, যে বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত তার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেননি. একজন শিকারী ভাল্লুককে ধাওয়া করতে গিয়ে আচমকাই গুহাটি আবিস্কার করেছিল.

তবে কেউই অবাক হবে না, যদি আমাদের দেশে আরও বড় দৈর্ঘ্যের কোনো গুহা আবিস্কৃত হয়. কারন আমাদের দেশে প্রচুর গুহা আছে.

রাশিয়ায় কত গুহা আছে, সে সম্পর্কে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম. দেখা গেল, যে কেউ তা গণনা করেনি. অসংখ্য গুহা এবং বিশেষজ্ঞদের মতে ৯০% গুহাতেই আধুনিক মানুষ কখনো পদার্পণ করেনি. তাদের মতে গুহাগুলিতে বাস করতো প্রস্তর যুগের মানুষজন, আর একালে মানুষ কদাচিত ঐ সব জায়গায় ঢোকে.

আমি জানি, যে মস্কো জেলাতেও অনেক গুহা আছে. আর ২০১৪ সালে শ্বেত অলিম্পিক গেমস যেখানে অনুষ্ঠিত হবে, সেই সোচি শহরে ৭০টি গুহা গুণে বার করা হয়েছে. উরাল, ককেশাস ও আলতাই পর্বতমালাতেও বহু গুহা আছে, ট্যুর এজেন্সিগুলি ঐ সব গুহা পরিদর্শন করার জন্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে.

পত্রপত্রিকায় মাঝেমাঝেই জলের তলায় অবস্থিত গুহার ফোটো দেখতে পাওয়া যায়, যা তোলে অসম সাহসী ডাইভাররা. জলের নীচে

অগাধ প্রাকৃতিক জগতের সৌন্দর্যের বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়.

আর এবার আপনাদের একটা গান শোনাচ্ছি. গানটি রাশিয়া সম্পর্কে.

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ নামক অনুষ্ঠামটি এখানেই শেষ করছি. নতুন নতুন প্রশ্ন সমেত আমরা আপনাদের কাছ থেকে নতুন চিঠিপত্রের অপেক্ষায় থাকবো. আমাদের ঠিকানাঃ ভারত ও পাকিস্তানে সম্প্রচার বিভাগ, রেডিও রাশিয়া, ২৫ নম্বর প্যাতনিত্স্কায়া স্ট্রীট, মস্কো, রাশিয়া- ১১৫৩২৬. ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানাঃ letters@ruvr.ru. নমস্কার!