সেই দিনের পরে কুড়ি বছর কেটে গেছে, যখন হিন্দু চরমপন্থীদের উস্কানিতে ক্ষিপ্ত জনতা অযোধ্যা শহরে বাবরী মসজিদ ধ্বংস করেছিল. এর পরে হওয়া আন্তর্সামাজিক সংঘর্ষে কম করে হলেও দুই হাজার লোক নিহত হয়েছিলেন – তাতে যেমন মুসলিম, তেমনই হিন্দুরাও ছিল.

এই দিনটি, ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২, ভারতে পালন করা হয় আধুনিক ইতিহাসের এক সবচেয়ে শোকভারাচ্ছন্ন ঘটনার দিন বলেই. প্রসঙ্গতঃ, মোটেও সারা ভারতের সব লোক এই দিনটিকে এই রকম ভাবে না. চরমপন্থী হিন্দুরা ৬ই ডিসেম্বর দিনটিকে মনে করে শৌর্য দিবস বলে, তাই খুবই স্বাভাবিক হয় বোঝা যে, কুড়ি বছর পূর্তি উপলক্ষে সরকারের তরফ থেকে খুব ভাল করেই নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়ে বিশেষত অযোধ্যা ও নিকটবর্তী ফৈজাবাদ শহরে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল.

এই শহর গুলিতে দিনটি যদিও উত্তেজনা পূর্ণ, তবুও শান্তিপূর্ণ ভাবেই অতিবাহিত হয়েছে. প্রত্যেক সমাজই নিজেদের মত করে দিনটি পালন করেছে. মুসলিম সমাজের লোকদের বেশীর ভাগ দোকানই বন্ধ ছিল আর মসজিদ গুলিতে ঝোলানো হয়েছিল কালো পতাকা.

হিন্দু সমাজের প্রতিনিধিত্ব মূলক বেশ কিছু সংগঠন উত্সব করে হনুমান চল্লিশা পাঠের আয়োজন করেছিল ও আবার করে এই ভেঙে ফেলা মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছে.

এই বিষয়ে অনেক বেশী করেই সাবধান হয়ে কাটিয়েছেন ভারতের রাজনীতিবিদরা. দেশের লোকসভায় অধিবেশনের সময়ে বহুজন সমাজ পার্টির সদস্য শফিকুর রহমান বুর্ক কালো পতাকা তুলে নাড়তে শুরু করেছিলেন, যার ফলে শিব সেনা ও ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে. পরবর্তী সময়ে সদস্যদের মধ্যে চিত্কার চেঁচামেচি শুরু হওয়াতে স্পীকার বাধ্য হয়ে অধিবেশন মুলতুবি করে দেন. লোকসভা সদ্য খুচরো ব্যবসায়ে বিদেশী বিনিয়োগ করা নিয়ে মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধের কারণে পঙ্গু হয়ে থাকা অবস্থা থেকে উদ্ধার পেয়ে আবার করেই বন্ধ থাকতে বাধ্য হয়েছে.

দেশের লোকসভার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, এখনও অযোধ্যার মসজিদ সংক্রান্ত বিতর্ক চলেই যাচ্ছে. আসলে ভারতে এটা মোটেও বিরল ঘটনা নয় যে, যখন ভারতে হিন্দু মন্দির ও মুসলিম মসজিদ প্রায়শঃই শুধু পাশাপাশিই থাকে না, এমনকি একই জমির মধ্যেই থাকে. যদি দুই পক্ষই সদিচ্ছার প্রকাশ করত, তবে বোধহয়, এই ক্ষেত্রে সবার জন্যই ভাল সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারত, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“কিন্তু মনে হয়, এটা এখন করা কিছু লোকের একেবারেই লাভজনক মনে হচ্ছে না. আর কারণ, অবশ্যই, কোন রকমের গোঁড়া হিন্দু- মুসলিম ধর্মীয় সমস্যার মধ্যে নিহিত নেই, বরং রয়েছে সেই বিষয়ের মধ্যেই যে, সমস্ত রকমের রাজনৈতিক শক্তিই তৈরী হচ্ছে সারা দেশ জোড়া লোকসভা নির্বাচনের জন্য, তা হওয়ার কথা ২০১৪ সালে, অথবা হয়ত তার আগেই. এই ক্ষেত্রে ধর্মীয় আবেগ – স্রেফ নির্বাচকদের উপরে প্রভাব ফেলার একটা খুব ভাল ব্যবস্থা”.

ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতীকের একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, আর তাই এই মসজিদের নামই একটা বাড়তি অর্থ বহন করে. ষোড়শ শতকের রাষ্ট্র নায়ক ও অন্তরে কবি বাবর, যিনি অযোধ্যা শহরে শুধু এই মসজিদই স্থাপন করেন নি, এমনকি এটাকে নিজের নামও দিয়েছিলেন, তিনি একদল লোকের জন্য – এক বংশের পত্তন করেছিলেন, যাদের সময়ে ভারত সবচেয়ে বড় পরিচিতি পেয়েছিল, আর অন্য একদল লোকের জন্য – এক বিদেশী বিজয়ী মাত্র. আর এর অর্থ হল যে, এই নাম বর্তমানেও রাজনৈতিক বাস্তবতা বজায় রাখতে পেরেছে. তাই বরিস ভলখোনস্কি যোগ করে বলেছেন:

“বাবরী মসজিদ ভেঙে দেওয়ার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে যে বিতর্কের শুরু হয়েছে, তাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক বিচার না করলেই নয়. তাতে খুবই সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছে সেই সমস্ত দেশের সংবাদ মাধ্যম, যাদের ভারতে হিন্দু- মুসলমানদের একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কোন সম্বন্ধই নেই. এই প্রসঙ্গে এক সার প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্র, আর ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল, প্রত্যেক দিনই প্রকাশ করছে ঐতিহাসিক চরিত্র বহ সব প্রবন্ধ, যাদের একটা সম্মিলিত নাম দেওয়া হয়েছে, “অযোধ্যা: ভারতের আত্মার জন্য যুদ্ধ”.

বিশেষ করে লক্ষ্যণীয় হয়েছে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রবন্ধ গুলি. সেখানে সরাসরি সেই তত্ত্বকেই বিতর্কে টানা হয়েছে, যা ভারতের সংবিধানে লিখিত যে, ভারত এক ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ. আর এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, এই ধরনের সমালোচনা মূলক সিদ্ধান্ত উদ্ভব হয়েছে প্রায় একই সময়ে, যখন আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমে ও এমনকি মার্কিন কংগ্রেসে নিয়মিত ভাবে বিজেপি দলের এক নেতা নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে, যাকে পশ্চিমে মনে করা হয়েছে চরমপন্থী হিন্দুদের প্রতিনিধি বলেই”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এহ বাহ্য যে, ভারতের ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে যাওয়া প্রাক্ নির্বাচনী প্রচার থেকে আলাদা থাকতে চায় না ও তারা ঠিক করেছে সক্রিয় ভাবেই তার উপরে প্রভাব বিস্তার করতে. এই রকমই মনে করেছেন বরিস ভলখোনস্কি. শুধু প্রশ্ন হল: ভারত কি সেই ভাগ্যের পুনরাবৃত্তি চাইবে, যা হয়েছে যেমন ইজিপ্টে?