পাকিস্তানের সরকার আফগানিস্তান থেকে তাদের দেশে আসা উদ্বাস্তুদের ৩০শে ডিসেম্বর অবধি সময় দিয়েছে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যে. না গেলে তাদের জোর করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে. বিভিন্ন উত্স থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তানে ১৫ থেকে ৩০ লক্ষ আফগানিস্তানের উদ্বাস্তু রয়েছে. আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ এই নিয়ে বিশদ করে বলেছেন.

আফগানিস্তানের উদ্বাস্তুদের প্রধান অংশ পাকিস্তানে এসেছিল ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত সেনা বাহিনীর এই দেশ ছেড়ে চলে আসার পরে. কিন্তু আফগানিস্তানের বাসিন্দারা পাকিস্তানে পালিয়েছিল কাবুলে তালিব প্রশাসন আসার পরেই আর দেশে বিগত দশ বছরেরও বেশী সময় ধরে আমেরিকা ও ন্যাটো জোটে সামরিক অপারেশন চলার কারণে. আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তুদের প্রধান থাকার জায়গা হয়েছে পেশোয়ার শহরের উপকণ্ঠে ও তারই সঙ্গে খাইবার পাখতুনভা রাজ্যের অন্যান্য জেলা গুলিতে. বেশীর ভাগ আফগানিস্তানের উদ্বাস্তুই পাকিস্তানের মাটিতে পরিবার তৈরী করেছে ও সেখানে তাদের ছেলেমেয়ে থেকে নাতি-নাতনী অবধি জন্ম নিয়েছে, নিজেদের ব্যবসা ও কারবারও চালু করতে পেরেছে তারা. পাকিস্তানে তাদের বাধ্য হয়ে পরিচয় পত্র দিতে হয়েছে. কিন্তু তাদের মধ্যে খুব কম লোক নেই, যারা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এই ভাবে নিজেদের নথিভুক্ত করে নি ও বাস্তবে বেআইনি ভাবেই থেকে গিয়েছে. তাদের বোধহয়, এখন আরও কঠিন হবে থাকা.

এই ধরনের কঠিন ব্যবস্থা নিতে ইসলামাবাদকে বাধ্য করেছে দেশের কঠিন অর্থনৈতিক অবস্থা. রাশিয়ার প্রাচ্য বিশারদ ভিয়াচেস্লাভ বেলোক্রিনিতস্কি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থাকে এই ভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছেন:

“পাকিস্তান খুব একটা সহজ সময় কাটাচ্ছে না. দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই জটিল ও তা খারাপ হয়েই চলেছে. তাদের বিদেশী ঋণ প্রচুর, যা ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশী. মূল্যবৃদ্ধি খুবই চড়া ও বেকারত্বও প্রচুর. দেশের লোকে বর্তমানের পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট. অনেক পুরনো সমস্যাই, যদিও বা এখন সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে, তাও হচ্ছে খুবই ঢিমে তালে আর তার ফলে ভালোর দিকে পরিবর্তনও ঘটেছে অতি সামান্য”.

আফগানিস্তানের উদ্বাস্তুদের বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পাকিস্তানের সরকারকে বাধ্য করেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই সংক্রান্ত পরিষদ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য আসা বন্ধ হওয়াতে. এই বছরের বসন্তে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সীমান্ত অন্তর্বর্তী এলাকা ও রাজ্য সংক্রান্ত মন্ত্রী শওকতউল্লা খান রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তু কমিশনের হাই কমিশনারের সঙ্গে দেখা করার পরে পেশোয়ারে ঘোষণা করেছিলেন যে, আফগানিস্তানের উদ্বাস্তুদের পাকিস্তান ছেড়ে চলে যেতে হবে নতুন বছর শুরুর আগেই. এই প্রশ্নে পাকিস্তানের, ইরানের ও আফগানিস্তানের প্রতিনিধিরা মে মাসেই জেনেভা শহরে এই নিয়ে আলোচনা করেছিলেন.

এই প্রসঙ্গে পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানের উদ্বাস্তুদের তাড়িয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কারণকেও বাদ দেওয়া যেতে পারে না. বিগত কিছু কাল ধরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক বিরোধের স্তরে রয়েছে. আফগানি – পাকিস্তান সীমান্তে সশস্ত্র সংঘর্ষ ও গুলি চালাচালি চলছেই. কাবুলে খুবই জোর দিয়ে বিশ্বাস করা হয়েছে যে, “তালিবান” গোষ্ঠীর প্রধান সক্রিয়তার কারণ লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের ভিতরেই. আফগানিস্তানের সরকার পাকিস্তানের সরকারকে অভিযোগ করেছে তালিবান গোষ্ঠীকে সহায়তা করা চালিয়ে যাওয়ার জন্য, তাদের নেতাদের লুকিয়ে থাকার জায়গা দেওয়ার জন্য ও সশস্ত্র বিরোধীদের ঘাঁটি গড়ার জন্য. পাকিস্তানও কাবুলের উপরে নিজেদের অভিযোগ দায়ের করেছে.

উদ্বাস্তু সমস্যা বহুদিন ধরেই দুই দেশের সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়েছে. কাবুল নিয়মিত ভাবেই ইসলামাবাদকে নিষ্ক্রিয়তার জন্য আর উদ্বাস্তুদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার সমস্যা সমাধান করার অনিচ্ছা নিয়ে অভিযোগ করে যাচ্ছে. কিন্তু আফগানিস্তানের সরকার এই ক্ষেত্রে মোটেও আগ্রহী নয় তাদের সত্যিকারের ফিরে আসাতে. কাবুলে ঠিক করেই বোঝা হয়েছে যে, আসন্ন সময়ে অন্তত অর্ধেক উদ্বাস্তুর এই ঐতিহাসিক জন্মভূমিতে ফিরে আসা অবশ্যই একটা মানবিক সঙ্কটের সূচনা করবে.