মস্কো, একটা অনেক ফ্ল্যাট ওয়ালা বাড়ীর এক প্রবেশ পথ. ঢোকার দরজার সামনে একটা পোস্টার: “পৃথিবী ধ্বংসের দিনটি এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে ফ্ল্যাটের পরিষেবার মাসিক বিল ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বরের আগেই মিটিয়ে দিতে”. সামাজিক পরিষেবা দপ্তরের কর্মীরা এবারে সেই চালু বিষয়কেই ব্যবহার করছেন, যা এই নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই সংবাদ মাধ্যম লেখালেখি করা থেকে আলাদা হতে পারে নি.

এখানে কথা হচ্ছে মায়া ক্যালেণ্ডার নিয়ে, যা মনে করা হয় যে, এই দিনেই বুঝি শেষ হয়েছে. চলে যেতে বসা বছরে সম্ভবতঃ প্রায় সমস্ত রকমের সংবাদ মাধ্যমই এই বিষয়কে নিজেদের মনোযোগের অংশ দিয়েছে – যা একেবারেই কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা জনতা থেকে যারা নিজেদের খুব সিরিয়াস ভাবেন তাদের সকলের জন্যই লেখা. এটার ব্যাপারে লোকদের তরফ থেকে কোন কি প্রত্যুত্তর পাওয়া গিয়েছে? কোনই সন্দেহ নেই যে, তা হয়েছে. রেডিও রাশিয়ার বর্তমানের পণ্ডিতস্মন্য লেখকও নিজের মত প্রকাশে বাদ দিচ্ছেন না.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেমন অনেক লোক রয়েছেন, যারা খুবই সিরিয়াস ভাবে অস্ত্র ও তার জন্য গোলা বারুদ কিনতে শুরু করেছেন. তারা তৈরী হচ্ছেন হলিউডের থেকে বলে দেওয়া পৃথিবী ধ্বংসের আগে কবর থেকে উঠে আসা জীবন্ত শবদেহদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য, কারণ নরকে আর জায়গা হচ্ছে না এই সব আমেরিকার লোকদের থাকার জন্য. অনেকেই সত্যি ভয় পেয়ে গেছে. অন্তত দুটো কোম্পানী যারা গুলি গোলা তৈরী করে, তারা এখন এমন সব গুলির বাক্স বিক্রী করছে, যাতে নাম লেখা হয়েছে জ্যান্ত মড়া বা জোম্বিদের জন্য বলে. এক বন্দুকের দোকানের মালিক ডেভ ওয়ার্কম্যান এই কথা বলেছে.

এরই মধ্যে ধর্ম যাজকরা নিজেদের ভক্তসকল কে পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ পড়াতে উত্সাহ দিচ্ছেন (যাতে তাঁদের মতে একমাত্র পথ বলা রয়েছে ব্যক্তিগত ভাবে রক্ষা পাওয়ার জন্য), আর দোকানে গিয়ে টর্চ বা ব্যাটারি কেনার দরকার নেই বলছেন, কারণ বহু লোকই ভয় পেয়েছে যে, এবারে বিদ্যুতও থাকবে না.

বিজ্ঞানীরা বুদ্ধি দিচ্ছেন লোকজনের শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য. যেমন ইতিহাসে ডক্টরেট করা ইউরি পল্যুখোভিচ বলেছেন যে “মায়া সভ্যতার লোকরা যেমন ইউরোপীয় সভ্যতার লোকরা পৃথিবী ধ্বংসের যে অর্থ ধরে, তা মোটেও বুঝত না”.

ক্নোরোজভার নামাঙ্কিত মায়া সভ্যতার ইতিহাস ও সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর গালিনা এরশোভা মনে করেন যে, পৃথিবী ধ্বংস নিয়ে সমস্ত কথাবার্তা – অশিক্ষিত লোকজনের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়ে নেওয়ার আরও একটা পদ্ধতি ছাড়া কিছু নয়.

এটাকে এমনকি কোন তত্ত্ব বলাও যেতে পারে না, কারণ তত্ত্বের পিছনে কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা থাকে – এটা স্রেফ আরেকটা লোক ঠকানোর কায়দা. মায়া ক্যালেণ্ডারে একেবারেই কোন ভবিষ্যদ্বাণী নেই, কোন রকমের পূর্ব কথনও পৃথিবী ধ্বংস নিয়ে করা হয় নি. তা বাস্তবে পাথরের উপরে খোদিত ক্যালেণ্ডারের কিছু দিন, খুব সম্ভবতঃ যা চাঁদের কলার সঙ্গেই জড়িত. কিন্তু সেখানে কোন কথায় লেখা কিছু নেই, একটাও কোন পূর্বাভাসও নেই. তবুও যদি ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে কিছু বলতে হয়, তবে আজটেক লোকরা বহু রকমের পূর্বাভাস দেওয়া স্বত্ত্বেও কিছুতেই স্পেনের লোকদের নিজেদের জমিতে আসা নিয়ে কিছুই বলতে পারে নি, যে আগমনই আসলে তাদের জন্য পৃথিবী ধ্বংসের কারণ হয়েছিল. আর ইউরোপের যারা ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে থাকেন, তাঁরা বলেছিলেন ১৪৯২ সালেই সভ্যতা ধ্বংস হবে, আর সেই বছরেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন.

অর্থাত্ ডিসেম্বরের এই পৃথিবী ধ্বংসের বা মহা প্রলয়ের বিষয়কে বিজ্ঞানীরা বলছেন স্রেফ ব্যবসার কারণে ধান্ধাবাজী. রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর অ্যাকাডেমিক ইভগেনি আলেকসান্দ্রভ এই প্রশ্ন করেছেন: যুদ্ধের সময়ে কি পৃথিবী ধ্বংস নিয়ে এত শোরগোল করা হয়েছিল? বাস্তবের সঙ্গে তুলনায় কঠিন সময়ে এই সব ভয়ানক ভবিষ্যদ্বাণীকে শুধু রূপকথা বলেই ধরা হয়ে থাকে. হতে পারে যে, এখন আমরা খুবই ভাল আছি, আমাদের কোন শক্তিশালী অনুভূতি হচ্ছে না, যখন এত কোটি লোকে এই সব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে, তখন তাই মনে হয় বলে বিজ্ঞানী মনে করেছেন. তাঁর মতে, এই সব ছড়াচ্ছে সংবাদ মাধ্যম, যাতে নানারকমের পাগলা করা রঙ চড়ানো আজেবাজে কথার চাষ হচ্ছে, সব জায়গা থেকেই নিজে নিজেকে প্রচার করা দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও নানা রকমের ভবিষ্যত বলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এমন দুনম্বরী লোক দেখা যাচ্ছে. যারা এই সব বিষয়ে দেখেন ও পড়েন, আর তারা, যারা পৃথিবী ধ্বংসের ভয় পাচ্ছেন – তারা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই একই সব লোকজন. বিজ্ঞানীরা এখন তাই ভাবেন.