বিশ্বের বাজারের বিষয়ে লড়াইতে পৃথিবীর কামারশালা দুনিয়ার সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রকে অতিক্রম করেছে. চিন বিশ্বের ১২৭টি দেশের প্রধান বাণিজ্য সহকর্মী দেশে পরিণত হয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাগে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রধান দেশের জায়গা বজায় রাখতে পারা গেছে ৭৬টি দেশের সঙ্গে. এই রেটিংয়ে চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জায়গা বদল করে ফেলেছে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে. এই প্রসঙ্গে চিন পিছনে ফেলতে পেরেছে এমনকি তাদের সহযোগী সেই সমস্ত বাজারেও, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া.

বিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে শক্তির তুলনার ক্ষেত্রে এটা সবচেয়ে আকস্মিক স্থানান্তর. ফলে বিশ্বের বাণিজ্যের প্রবাহ বদলে গিয়েছে, আর ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিষয় গুলিও বদলে গিয়েছে – তা হয়েছে আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত. চিন বিশ্বে নিজেদের এই ঝাঁপ দেওয়া শুরু করেছিল সেই নব্বইয়ের দশকে স্রেফ সস্তা গেঞ্জি ও খেলনা দিয়ে. আর আজ চিনের পক্ষ থেকে খনিজ তেলের আমদানী ও অন্যান্য কাঁচামালের আমদানী লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার দেশ গুলির এই সব খনিজ উত্পাদন শিল্পের ক্ষেত্রে এক অতি দ্রুত পরিবর্তনের ভিত্তি হয়েছে. চিনের বিশাল এই উল্লম্ফন বাজারে এতটাই দ্রুত হয়েছে যে, এখন কারখানা গুলি বিশ্বের উত্পাদনের অর্ধেক লোহার খনিজ ব্যবহার করে ফেলছে. আর একই সময়ে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইস্পাত রপ্তানী কারক দেশও হয়েছে. চিন বিশ্বের বৃহত্তম দুই তামা উত্পাদক দেশ জাম্বিয়া ও চিলিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করেই নিজেদের পক্ষে এনে ফেলেছে. অস্ট্রেলিয়াকেও এনেছে – যারা বিশ্বের নেতৃস্থানীয় এক কয়লা ও লোহার খনিজের উত্পাদক দেশ. চিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াতেও পার হয়ে গিয়েছে, তারা এখন হয়েছে ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট ও উচ্চ প্রযুক্তিসহ উত্পাদনের প্রধান বায়নাদার রাষ্ট্র. আর ইলেকট্রনিকস উত্পাদনের ক্ষেত্রে সব অতিকায় কোম্পানী যেমন স্যামসাঙ্গ, নোকিয়া ও এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপল নিজেদের জোড়া লাগানোর কারখানা চিনে এনে ফেলেছে.

চিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে সুবিধা – শ্রম শক্তির ক্ষেত্রে কম দাম ও জিনিষের দামের ক্ষেত্রে তৈরীর জন্য অন্যান্য বিষয়েও কম দাম. কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে হওয়া শেল গ্যাসের বিপ্লব চিনকে এবারে এই সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে চলেছে, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে সুবিধাও কমছে, এই রকম মনে করে বিশ্বায়ন ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর মিখাইল দেলিয়াগিন বলেছেন:

“জ্বালানীর কম দাম হওয়াতে আমেরিকার লোকদের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আবার করে ক্ষমতা ফিরছে. তাদের এমনকি আবার করে শিল্পায়ন শুরু হয়েছে. অর্থাত্ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এলাকাতেই শিল্প কারখানা ফিরে আসছে, যা এক সময়ে দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল. এই পরিস্থিতিতে চিনের পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতা আমেরিকার লোকদের কাছে আগের থেকে কম বিপজ্জনক ও কম মারাত্মক মনে হয়েছে. আমেরিকার লোকরা জ্বালানীর দামে একটা সুবিধা পেয়েছেন, আর এটাই জিনিষের বাজারের দামের ক্ষেত্রে কম হওয়াকে টেনে নীচে নামিয়েছে”.

বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, আসন্ন ভবিষ্যতে খনিজ তেল ও গ্যাস চিন ও আমেরিকার মধ্যে বাজারের জন্য লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রধান হতে চলেছে. এদের অনেকেই মনে করেন যে – আরব বসন্ত, আফ্রিকাতে রাজনৈতিক পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উস্কে দেওয়া হয়েছে ও সমর্থন করা হয়েছে, যাতে চিনের খনিজ তেলের উত্স বন্ধ করা যায়. প্রাথমিক ভাবে লিবিয়া ও সুদান থেকে. ইরানের চারপাশ জুড়ে উত্তেজনা ছড়ানো ও পারস্য উপসাগরেও উত্তেজনার সৃষ্টি করা হয়েছে এই লক্ষ্যকে মাথায় রেখেই. এটাও ঠিক যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ফিরে আসার স্ট্র্যাটেজি এই যুক্তিকে ঘিরেই তৈরী করা হয়েছে, যাতে আঘাত হানার উপযুক্ত সামরিক নৌবহরের শক্তিকে চিনের ভেনেজুয়েলা, নাইজিরিয়া, সুদান ও নিকটপ্রাচ্য থেকে খনিজ তেল আমদানীর পথে রাখা যায়.

এরই মধ্যে চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বের বাজার নিয়ে সংঘর্ষে বিজয়ী হবে সেই, যারা মুদ্রার যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে, এই রকম মনে করে রাজনীতিবিদ মিখাইল হাজিন বলেছেন:

“খুব সম্ভবতঃ, বিশ্ব নানা রকম বিনিময় মুদ্রার এলাকায় বিভক্ত হয়ে পড়বে. এতে জয় পরাজয় নির্ভর করবে শুধু একটা ব্যাপারের উপরেই – কার এই এলাকা বেশী হবে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নাকি চিনের. এই প্রশ্নের উত্তর আপাততঃ দেওয়া সম্ভব নয়. বিশ্বের বাজার নিয়ে এই কুস্তি একই সব বাজারে করার স্তর থেকে নতুন তলে উপনীত হবে – বিনিময় মুদ্রার স্তরে. আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এটাই হবে বিশ্বের ভূ- রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগ্রহের বিষয়”.

এই সময়ের মধ্যেই চিনের ড্রাগন দ্বিতীয় থেকে প্রথম স্তরে লাফ দেওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র – এক শক্তি কমে আসা বাঘের মতো এখন পিছিয়ে যাচ্ছে. কিন্তু সমস্ত রকমের ইঙ্গিতই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, এমনকি আহত থাবা নিয়েও সে ড্রাগনের লেজে ব্যাথা দেওয়ার মত করেই কামড়ে দিতে পারে.