ভোপালের ইউনিয়ন কারবাইডের রাসায়নিক কারখানায়, যেখানে ১৯৮৪ সালের তেসরা ডিসেম্বর ভারতের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিও মানবকৃত বিপর্যয় ঘটেছিল, সেখানে এখনও পড়ে রয়েছে সাড়ে তিনশ টন বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ. ভারতের প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া সংস্থা এই খবর প্রকাশ করেছে. বিষয় নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

এটা বিশ্বের একটা বৃহত্তম প্রযুক্তি ও মানুষের হাতে করা বিপর্যয়. তখন ভোপালে প্রায় তিন হাজার লোকের সহসা মৃত্যু হয়েছিল. পরবর্তী বছর গুলিতে এই দুর্ঘটনার ফলে রোগ হওয়া থেকে আরও কম করে হলেও ১৫ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছে. সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা একেবারেই দানবীয় রকমের – প্রায় ছয় লক্ষ! স্থানীয় পরিবেশ বিজ্ঞানীরা যেমন বলেছেন যে, এই বিপর্যয় যে এই এলাকায় হয়েছিল, সেখানের মাটি জল সবই বিষাক্ত. সুতরাং লোকে এখনও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন ও আজও সেই কারণেই মারা যাচ্ছেন, বিপর্যয়ের আঠাশ বছর পরেও.

রাশিয়ার ভারত বিশেষজ্ঞ ফেলিক্স ইউরলভ এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“ইতি মধ্যেই পুরো এক প্রজন্মের বদল হয়েছে, কিন্তু লোকে আজও বিপর্যয়ের কথা স্মরণে রেখেছে. তারা যেমন এক বছর আগেও তেমনই এবারেও পথে নেমেছে মিছিল করে. ব্যাপারটা হল যে, যাঁরা মারা গিয়েছেন ও যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের সকলকে দেওয়া হয়েছে খুবই সামান্য ক্ষতিপূরণ. আর এখন তাঁরা এটা নিয়েই বারবার বলছেন. মৃতদের পরিজনরাও কোন ন্যায় বিচার আদায় করতে পারে নি, তেমনই ক্ষতিগ্রস্তরাও পারেন নি. ভোপালের বিপর্যয় ভারতে এখনও খুবই তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হয়ে রয়েছে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির জন্য. আমেরিকার মালিকদের সম্বন্ধে যা বলা যেতে পারে, তা হল যে, সেখানে এই প্রশ্ন এই ভাবে বিচার করা হচ্ছে যে, তারা কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজারের বিরুদ্ধে একটা শাস্তি মূলক রায় দিয়েছে পর্যন্ত আর তার পরেই সব মিটে গিয়েছে”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত মার্কিন ভারত যৌথ উদ্যোগ ইউনিয়ন কারবাইড লিমিটেডের প্রধান ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে ১৯৮৪ সালের ভোপাল ট্র্যাজেডির জন্য দায়িত্ব থেকে রেহাই দিয়েছে. আদালতের রায়ে বলা হয়েছে যে, ডো কেমিক্যালস ও তাদের অধীনস্থ কোম্পানী ইউনিয়ন কারবাইড ভোপালের কারখানার মালিক ছিল না ও এমনকি তা চালাতোও না, তারা এটা শুধু ২০০০ সালেই কিনেছে. তাই সমস্ত দায়িত্ব অর্পিত হয় মধ্য প্রদেশের নেতৃত্বের উপরেই, যেখানে এই কারখানা ছিল. ১৯৮৯ সালে দীর্ঘ দিন ধরে চলা মামলার পরে ইউনিয়ন কারবাইড কোম্পানী ট্র্যাজেডির ক্ষতিগ্রস্তদের সব মিলিয়ে ৪৭ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল. কিন্তু ভারতীয় পক্ষ এই পরিমানকে ন্যায্য কারণেই যথেষ্ট মনে করে নি. কিন্তু এর পরবর্তী সমস্ত মামলাই ইউনিয়ন কারবাইডের বিরুদ্ধে বিফল হয়েছিল, আমেরিকার পক্ষ তা নাকচ করে দিয়েছিল.

মধ্য প্রদেশের প্রশাসন সম্বন্ধে যা বলা যেতে পারে, তো তারা এই বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ নিয়ে চিন্তিত, যা এখনও কারখানার গুদামঘরে মজুত রয়েছে আর তার কিছুটা আবার রয়েছে খোলা আকাশেরই নীচে. মধ্য প্রদেশের প্রশাসন চেয়েছিল আঙ্কলেশ্বর শহরের গ্যাসের কারখানায় এই সব বিষাক্ত পদার্থের একটা ব্যবস্থা করতে, এমনকি তারা গুজরাত সরকারের কাছ থেকে সম্মতিও পেয়েছিল, কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীরা এখানে বিষাক্ত পদার্থ আনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তা স্থগিত করে রেখেছে, মধ্য প্রদেশ সরকার এই ধারণা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে. এর পরেও বহু বার এই বিষাক্ত দ্রব্য ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু এর সবই বিফল হয়েছে. যেমন নাগপুরের কারখানায়, তেমনই জার্মানীতে এই বিষাক্ত গ্যাস নষ্ট করা সম্ভব হয় নি. এখন প্রশ্ন ভারতের সুপ্রীম কোর্টে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে.

ভারতের জন্য খুবই বেদনা দায়ক এই সমস্যা কবে মিটবে, তা কেউ জানে না. কিন্তু ভোপাল ট্র্যাজেডির দাঁড়ি পড়তে এখনও অনেক বাকী, তা হতে পারবে শুধু সমস্ত বিষাক্ত দ্রব্য ধ্বংস করার পরে ও সমস্ত ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পরেই.