দিল্লী শহরে এই সপ্তাহের শুরুতে ভারত ও চিনের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রশ্নে “স্ট্র্যাটেজিক আলোচনা” হয়েছে. আর চিনে এই আলোচনাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার সাক্ষী শুধু চিনের প্রতিনিধিদলের সদস্য তালিকাতেই নয়, যেখানে প্রায় ২০০ জন সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মচারী ও ব্যবসায়ী এসেছিলেন, বরং চিনের বিশেষজ্ঞদের সরকারি ভাবে আলোচনার পর্ব শেষ হওয়ার পরেও ভারতীয় সহকর্মীদের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে কথাবার্তার সময়ে দেখতে পাওয়া গিয়েছে.

যদি শুধু ঘোষণা দিয়েই দেখতে হয়, যা এই বিশেষজ্ঞ ও সরকারি মুখপাত্রদের সঙ্গে আলোচনার সময়ে করা হয়েছে, তবে একটা সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে যে, ভারত ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক প্রায় কোন রকমের মেঘে আচ্ছন্ন নেই. ২০০০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমান চারশো নব্বই কোটি ডলার থেকে সাত হাজার তিনশ নব্বই কোটি ডলার হয়েছে, আর ২০১৫ সালে তা হওয়ার কথা ১০ হাজার কোটি ডলারের সমান. চিন ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যে এখন প্রথম স্থানে রয়েছে.

আর রাজনৈতিক সমস্যার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠানে উঠেছে শুধু সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যার কথা. গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের কর্মী হুয়াং হুয়াগুয়াং যেমন উল্লেখ করেছেন যে, চিন ভারতের রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার বিষয়ে কোন বাধা সৃষ্টি করছে না, আর এই সংস্থার কাঠামোয় ভারতের গুরুত্ব বৃদ্ধির স্বপক্ষে বক্তব্য রেখেছেন.

প্রসঙ্গতঃ, এই ধরনের আশাব্যঞ্জক অথচ এড়িয়ে যাওয়া ধরনের ঘোষণার পেছনে অনেক জটিল এক ছবি লুকিয়ে রয়েছে, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এক দিক থেকে ভারত ও চিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয় যে, তাদের মোটেও ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ ভাবা যেতে পারে না, তবুও তারা সহযোগিতা খুবই সফল ভাবেই বাড়াতে পারে. কিন্তু এই দিকেও চোখ বন্ধ করে রাখলে চলবে না যে, বহু সমস্যা যা এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করেছে – তা সে যতই সরকারি মুখপাত্ররা তা ঢেকে রাখার চেষ্টা করুন না কেন.

এই সমস্যা গুলিই সমস্ত রকমের মনে থেকে যাওয়ার মতো সর্ব প্রসারিত সূচকের উপস্থিতিতেও এমনকি বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারসাম্যের পাল্লা চিনের দিকেই একতরফা ভাবে ঝুঁকে পড়েছে: গত বছরে চিনের ভারতে রপ্তানীর পরিমান ভারতের চিনে রপ্তানীর চেয়ে বেশী ছিল তিন হাজার নশো কোটি ডলারের মতো, অর্থাত্ ভারত চিনের থেকে চার ভাগ কম জিনিষ রপ্তানী করেছে”.

আরও বেশী রাজনৈতিক ও সামরিক রাজনীতির সমস্যা রয়েছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, আর তা মোটেও সীমান্ত সমস্যাতেই শেষ হচ্ছে না – তাই বরিস ভলখোনস্কি যোগ করেছেন:

“এটা যেমন চিনের এই এলাকায় ভারতের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে আরও বেশী মজবুত হওয়া সামরিক রাজনৈতিক ঘোঁট পাকানো, তেমনই এশিয়াতে নেতৃত্বের লোভে নানা রকমের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা: তা যেমন ভারত মহাসাগরের এলাকায়, তেমনই হিমালয়ের উপত্যকাতেও, আবার দক্ষিণ চিন সাগরেও. শেষমেষ দুই দেশের সামাজিক মতামতকেও দাম দিতে হবে. এখানে ভারতীয় সমাজ মোটেও চিনের প্রতি এতটাই বন্ধু ভাবাপন্ন হয়ে নেই, যা সরকারি মুখপাত্ররা দেখাতে চাইছেন. আর সেই সব অনুষ্ঠান যা এই বছরের অক্টোবর নভেম্বর মাসে ১৯৬২ সালের চিন ভারত সীমান্ত যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে ভারতে পালিত হয়েছে, তা আরও একবার এটাকেই দেখিয়ে দিয়েছে”.

চিনের সামাজিক মত নিয়ে বিচার করা কঠিন – কারণ চিন অনেক বেশী রুদ্ধদ্বার দেশ. কিন্তু কিছু বিশেষজ্ঞের মতে চিনের ভারতের প্রতি একটা ছোট ও অপেক্ষা কৃত বেশী দুর্বল সহকর্মীর মতই সম্পর্ক তৈরী হয়েছে.

স্বাভাবিক যে, ভারতের এটা ভাল লাগতে পারে না, আর তারা সব রকম ভাবেই নিজেদের শক্তি দেখাতে চাইছে – যেমন, এই বছরের বসন্ত কালে যখন ভারত আন্তর্মহাদেশীয় রকেট “অগ্নি – ৫” পরীক্ষা করে দেখিয়েছিল যে, এই বারে ভারত চিনের এলাকায় যে কোন জায়গায় আঘাত হানতে পারে, তখন চিনের মোটেও এটা ভাল লাগে নি.

রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে চিনের অবস্থানও খুবই গা বাঁচানো ধরনের. চিনের হুয়াং হুয়াগুয়াং কিন্তু বলেন নি যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে চিন সমর্থন করবে. আর সেই রকমের সমর্থন ছাড়া ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া খুবই সমস্যা জনক হবে.

সুতরাং ভারত চিনের সম্পর্ক মোটেও নির্মেঘ বলা যেতে পারে না. কিন্তু একটা জিনিষ আশা জাগায়: বাস্তব ক্ষেত্রে দুই দেশই পারে ও করে দেখাচ্ছে পারস্পরিক ভাবে লাভজনক সহযোগিতা.