চিনের তার প্রতিবেশী দেশ গুলির সঙ্গে এলাকা সংক্রান্ত বিতর্ক বিগত কিছু দিন ধরে এক নতুন ও আচমকা মাত্রা পেয়েছে. চিনের নতুন পাসপোর্টে চিনের এক মানচিত্র ছাপা হয়েছে, যেখানে প্রায় এই দেশের সমস্ত বিতর্কিত এলাকা: দক্ষিণ চিন সাগরের দ্বীপ সমূহ, ভারতের এলাকা – যা চিন নিজেদের বলে মনে করে, যেমন অরুণাচল প্রদেশ ও অক্ষয় চিন পার্বত্য মরুভূমি এলাকা ইত্যাদি চিনের বলেই দেখানো হয়েছে. চিনের প্রতিবেশীরা, যারা এই এলাকা গুলিকে নিজেদের বলেই মনে করে, তারা কোন না কোনও ভাবে এই বিষয়ে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে.

বেজিংয়ে ভারতের দূতাবাস এক অসমান উত্তর দিয়েছে: চিনের নাগরিকদের পাসপোর্টে, যাঁরা ভারতে যেতে চান, সেখানে ভারতীয় দূতাবাস থেকে এমন ভাবে ভিসা দেওয়া শুরু করা হয়েছে, যেটায় ভারতের মানচিত্র সম্পূর্ণ ভাবে আঁকা রয়েছে, আর সেই সমস্ত বিতর্কিত এলাকাও সেখানে স্পষ্ট করে দেখানো রয়েছে. আর চিনের নতুন মানচিত্রকে কোন রকমের আইন সঙ্গত যাতে দেখানো না হয়, তার জন্য ভিয়েতনাম চিনের নাগরিকদের ভিসা দিচ্ছে আলাদা কাগজে ও তা তারা ভিয়েতনামের সীমান্ত ছেড়ে আসার সময়ে রেখে আসছে ভিয়েতনামেরই সীমান্ত রক্ষীদের কাছে.

মনে হয়েছিল পাসপোর্টের পাতায় একটা ছবি – এটা ভূমিতে ও সমুদ্রে যা হচ্ছে, তার তুলনায় নিতান্তই তাচ্ছিল্য করার মতো ঘটনা, কারণ বিগত সময়ে চিনের প্রতিবেশীদের সঙ্গে এই প্রসঙ্গে বিরোধ সামরিক সংঘর্ষে পরিণত হয়েছিল (যেমন, ধরা যাক ভারত – চিনের ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধে), আর বর্তমানে – যা নিয়মিত ভাবেই বিরোধের কিনারায় কোন রকমে ভারসাম্য রক্ষা করছে. কিন্তু এই প্রশ্ন দেখা উচিত্ আরও অনেক বিস্তৃত এক পরিপ্রেক্ষিতে, এই রকমই মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“১৯৬২ সালের ভারত চিন যুদ্ধ – এটা শুধু ইতিহাসের বাস্তব ঘটনাই নয়, বরং আধুনিক রাজনীতির এক বড় কারণও. এই বছরের হেমন্ত কালে হওয়া এই যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে সব অনুষ্ঠান ভারতে করা হয়েছে, তা এটাকেই আবার করে সমর্থন করেছে. ভারত খুবই অপমান জনক পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল ও নিজেদের কিছু অংশের উপরে নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছিল – অক্ষয় চিন – যা তার পর থেকেই বাস্তবে চিনের দখলে চলে গিয়েছে. এটা আগের মতই ভারতের সমাজ ও রাজনীতিবিদদের খুবই শক্তিশালী অনুভূতির উদ্রেক করে থাকে, আর একটা প্রতিশোধের ইচ্ছা তৈরী করে দেয়. যদিও ২০০৩ সালে ভারত ও চিন কিছুটা সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যায় একে অপরের উপর থেকে দাবী প্রত্যাহার করেছে – ভারত তিব্বতকে চিনের এলাকা বলে স্বীকার করেছে আর পরিবর্তে চিনও সিকিমকে ভারতের অঙ্গ রাজ্য বলে স্বীকার করে নিয়েছে, - তবুও এই এলাকা সংক্রান্ত সমস্যাই সম্পূর্ণ রকমের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে বাধা হয়ে রয়েছে. একই কথা বলা যেতে পারে চিনের দক্ষিণ পূর্বের প্রতিবেশীদের সম্পর্কেও, যারা দক্ষিণ চিন সাগরে দ্বীপ সমূহের ও তার সন্নিহিত সমুদ্র তলের অধিকার নিয়ে বিরোধ করে চলেছে, যেখানে বিগত কিছু কাল আগে আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে যথেষ্ট পরিমানে খনিজ কার্বন যৌগের সম্ভার. এই কিছুদিন আগেই শেষ হওয়া আসিয়ান সংস্থার বৈঠকেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে এই বিষয়ে চিনের বিরোধের তীব্রতা প্রতিভাত হয়েছে”.

নতুন পাসপোর্টে আঁকা চিনের মানচিত্র প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষকরা আরও একটি আগ্রহোদ্দীপক ঘটনা লক্ষ্য করেছেন: প্যারাসেল দ্বীপ সমূহ ও স্প্র্যাটলি দ্বীপ সমূহ, যা নিয়ে চিন ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনসের সঙ্গে বিতর্ক কছে, তা দেখানো হয়েছে চিনের এলাকা বলেই. কিন্তু সেই সব দ্বীপ সমূহ, যা নিয়ে চিন জাপানের সঙ্গে বিরোধ করছে (জাপানী ভাষায় সেন-কাকু, আর চিনে ভাষায় দিয়া-দাও দ্বীপ সমূহ), মানচিত্রে নেই. এর অর্থ কি এই যে, চিন আপাতত জাপানের সঙ্গে নিজেদের বিরোধকে শক্তি প্রয়োগের জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছে না, যা তাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে করতে চাইছে?

পাসপোর্টে আঁকা চিনের মানচিত্র – এটা কোন আলাদা ঘটনা নয়. এটা – এক বহু দিনের জন্য তৈরী করা স্ট্র্যাটেজি, যা যেমন প্রশান্ত মহাসাগরের জলসীমায়, তেমনই ভারত মহাসাগরেও করতে চাওয়া হচ্ছে. এই বিষয়ে বলে দেয় কিছুদিন আগে চিনের প্রথম বিমান বাহী “লিয়াওনিন” জাহাজে বিমান ওঠা নামার পরীক্ষা, এই রকমই মনে করেন বরিস ভলখোনস্কি. এক সময়ে সোভিয়েত দেশের পতনের অব্যবহিত পরেই চিন এই বিমানবাহী জাহাজটি ইউক্রেন থেকে কিনে নিয়েছিল. প্রথমে বলা হয়েছিল যে, এই জাহাজ ব্যবহার করা হবে একটা আমোদ প্রমোদের জায়গা হিসাবে অথবা হোটেল করা হবে. তারপরে, যখন এই বিমান বাহী জাহাজ নতুন করে তৈরী হয়ে গিয়েছিল, তখন বলা হয়েছিল তা শুধু প্রশিক্ষণের জন্যই ব্যবহার করা হবে, অন্তত সেই রকমই ছিল চিনের কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ঘোষিত. আর এবারে এই জাহাজের উপরে যুদ্ধ বিমান পরীক্ষা করা বলে দিয়েছে যে, এই বিমান বাহী জাহাজ আরও অনেক কিছু করার জন্যই তৈরী.