রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ার প্রতিনিধি এই দেশে নিহত হওয়া ১৪৩ জন বিদেশীর তালিকা দিয়েছে, যারা বিরোধী পক্ষের হয়ে লড়াই করছিল. তালিকায় রয়েছে – কাতার, সৌদি আরব, লিবিয়া, আফগানিস্তান, তুরস্ক ও অন্যান্য রাষ্ট্রের নাগরিক. গত মাসে সিরিয়া নিরাপত্তা পরিষদকে ১০৮ জন নিহত হওয়া ভাড়াটে সেনার তালিকা দিয়েছিল, যারা বিরোধী পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করছিল.

যদি কোন পশ্চিমের দেশের বিরুদ্ধে বিদেশী ভাড়াটে সেনারা এর এক দশমাংশ সেই সমস্ত অপরাধ, যা আজ তারা সিরিয়াতে করছে, তা করত, তবে অনেকদিন আগেই এটাকে ধরা হত যে, এই দেশ অনতিপূর্ব আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে বলে. তার ওপরে খুব ভাল করেই জানা রয়েছে যে, বিরোধীদের মধ্যে প্রবণতা মোটেও কোন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক মূল্যবোধের দল দিচ্ছে না, বরং একেবারেই অন্য লোকরা দিচ্ছে.

আর পশ্চিম খুব উষ্ণ ভাবেই এই সব লোককে সমর্থন করছে? কিন্তু কেন? আমাদের সমীক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ এই সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছেন:

“সিরিয়াতে লিবিয়া থেকে ভাড়া করে আনা খুব একটা কম লোক যুদ্ধ করছে না. রয়টার সংস্থার খবর অনুযায়ী এরা খুবই ভাল করে তৈরী হওয়া পেশাদার সৈন্য, বিস্ফোরক বিষয়ে প্রযুক্তির জ্ঞান ও ভারী অস্ত্রের ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এদের রয়েছে. তাদের মধ্যে একজন – যে গাদ্দাফির প্রাসাদ আক্রমণে অংশ নিয়েছে – সে রয়টার সংস্থাকে বলেছে যে, সিরিয়াতে তাদের মতো হাজার বিদেশী ভাড়াটে সৈন্য রয়েছে আর এই সাক্ষাত্কার কিন্তু ছাপা হয়েছিল সেই আগষ্ট মাসেই. জানা নেই এখন এই লোক আর বেঁচে আছে কি না. যাই হোক না কেন, এই অনুপ্রবেশের যারা স্পনসর, তাদের জন্য সিরিয়াতে যুদ্ধ করতে পাঠাবার জন্য লোকের অভাব নেই. সেই লিবিয়াতেও বহু লোকেরই এখন কোনও কাজ নেই, কিন্তু গুলি করার অভ্যাস রয়ে গিয়েছে. কিন্তু তারা এটা নিজেদের এলাকায় করে বিনা মূল্যে, আর সিরিয়াতে এই কাজের জন্য তাও কিছু পয়সা পাওয়া যায়. আর এর জন্য একটা ভিত্তিও রয়েছে এই কথা ভাবার যে, তাদের কাজকর্ম সিরিয়াতে বিদেশ থেকে সেই শক্তিরাই নিয়ন্ত্রণ করে, যারা এক সময়ে লিবিয়াতেও যুদ্ধের ব্যবস্থা করেছিল. সকলেরই খুব ভাল করেই জানা রয়েছে এই শক্তি কারা, আর নিকট প্রাচ্যের কোন দেশ গুলিতে তারা ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে. কেন তাদের পশ্চিম সমর্থন করছে – তাও বোধগম্য. আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি উপনিবেশবাদের এক উচ্চাঙ্গ উদাহরণ. ইউরোপের লোকরা এক সময়ে এই বিজ্ঞান খুব ভাল করেই আয়ত্ব করেছিল – অন্যদেশের লোককে একে অপরের বিরুদ্ধে মন বিষিয়ে দিয়ে (এই ক্ষেত্রে বর্তমানের ভারত মহাদেশের নানা ধর্মের মানুষের মধ্যে অন্তহীণ বিরোধই উদাহরণ হিসাবে যথেষ্ট, যা করেছিল ব্রিটেনের জন্তুরা). তারা এই করেই নিজেদের লাভ জনক অবস্থায় রাখতে পেরেছিল, মানুষের মধ্যে ঘুমন্ত প্রজাতি, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি বিষয়ে আত্ম গরিমাকে উস্কানি দিয়ে, তাদের মধ্যে যারা উপনিবেশবাদীদের প্রতি সবচেয়ে বেশী আনুগত্য দেখিয়েছিল, তাদের সামনে রেখে নিজেদের কাজ করেছিল ও বর্তমানেও করছে. নিকটপ্রাচ্যে বর্তমানে এই কাজই করা হচ্ছে, তা না হলে এক মুসলমান অন্য মুসলমানের প্রাণ হরণের কারণ হয় কি করে, কোরান পড়ার পরে? উপনিবেশবাদীদের জন্য এই এলাকা আবারও গবীর মনোযোগের কারণ হয়েছে স্বার্থ ও অর্থের লোভে”.

আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী ভাড়াটে হয়ে যুদ্ধ করা বারণ রয়েছে. তাহলে কাজে তা এত বাড়বাড়ন্ত দেখাচ্ছে কি করে? এই প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই গ্রোজিন বলেছেন:

“গত শতকে ভাড়াটে সেনাদল নিযুক্ত করত বিভিন্ন দেশের সামরিক বা গোয়েন্দা দফতর তাদের মধ্যস্থদের দিয়ে. আজ কোন ভাড়াটে দলের কে কর্তা তা বার করা প্রায় অসম্ভব. অনেক ব্যক্তিগত মালিকানায় চলা সুরক্ষা কোম্পানী তৈরী হয়েছে, তার ওপরে রয়েছে একেবারেই কম বোধগম্য বেসরকারি সংস্থা, যারা আসলে কাজ করছে এই একই জিনিষ নিয়ে. আজকের ভাড়াটে সেনারা যুদ্ধ করে অস্বচ্ছ সব কাঠামোর হয়ে, যাদের আবার নিয়ন্ত্রণ করে আরও বেশী করে অস্বচ্ছ সব শক্তির কাঠামো”.

আর, তা স্বত্ত্বেও খুবই সঠিক করে দুটি বিষয় সম্বন্ধে বলা যেতে পারে, প্রথমতঃ, সিরিয়ার উদাহরণে দেখা গেল যে, পশ্চিমের পক্ষ থেকে ভাড়াটে সেনারা তাদের ভূ-রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানের জন্য কাজ করছে. দ্বিতীয়তঃ, সিরিয়াতে ভাড়াটে সেনারা আসছে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, ইজিপ্ট ও কাতার সহ অন্য কিছু দেশ থেকে, যাদের দেশ গুলিতে পরিস্থিতি একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে পশ্চিমের হস্তক্ষেপের জন্যই. এই দেশ গুলি যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় “নেকড়েদের” পোষার জায়গা হয়েছে, যারা পয়সার জন্য যে কোন দেশের সঙ্গে, যে কোন কারণেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত. এটা খুবই বিপজ্জনক এই সমগ্র অঞ্চলের জন্যই. নিকট প্রাচ্যের দেশ গুলি ও উত্তর আফ্রিকার দেশ গুলি এখনও সেই সমস্ত সহস্র লক্ষ ভাড়াটে সেনাদের “হজম” করতে পারে নি, যাদের পশ্চিম ও তাদের আরব বন্ধুরা এক সময়ে আফগানিস্তানের জন্য বাজারে ছেড়েছিল. সিরিয়াতে এখন সেটাই চলছে.