গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো রাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ সারা বিশ্বের বহু লক্ষ মোবাইল টেলিফোন ও কম্পিউটার ব্যবহারকারী মানুষের জন্য খুবই বড় সমস্যার কারণ হতে চলেছে. এই দেশে উত্পাদিত ট্যান্টালাম ধাতু আধুনিক যন্ত্রপাতি উত্পাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে. কঙ্গো দেশের পরিস্থিতি আবার করে আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাব কি করে সেই যুদ্ধে যারা অংশ নেয় নি, সেই রকম বহু সংখ্যক মানুষের জীবনে পরিবর্তন করতে পারে, তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে.

কঙ্গো রাষ্ট্রে রক্তক্ষয় প্রত্যেক দিনের সঙ্গেই বেড়ে চলেছে. যদিও তা আপাত ভাবে প্রজাতিগত দ্বন্দ্বের কারণে হয়েছে বলে মনে হয়েছে, তবুও কিছু বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে, এই যুদ্ধ চলছে প্রাকৃতিক সম্পদের জন্যই. জঙ্গীরা স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর গোমু দখল করেছে ও তারা তৈরী আছে আরও এগিয়ে যেতে. দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের এখনও প্রযোজনীয় রকমের বাধা দিতে পারছে না.

বর্তমানের ঘটনা পনেরো বছর আগের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি করছে. তখন কঙ্গোর লোকরা অন্য দেশের পক্ষ থেকে তাদের দেশের কাঁচামালের ঘাঁটি দখল করার চেষ্টার সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি হয়েছিল. আর ঠিক তেমন ভাবেই এখন – সেই চেষ্টা চলছে স্থানীয় জঙ্গীদের সাথে হাত মিলিয়ে. এখানে যুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট কারণও রয়েছে, - গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো বিশ্বের দশটি বৃহত্ উত্পাদক ও সম্পদশালী দেশের একটি, যাদের কাছে রয়েছে খনিজ তেল, সোনা, হীরা, ইউরেনিয়াম আর তারই সঙ্গে কোবাল্ট সহ অন্যান্য বিরল ধাতুর সঞ্চয়.

তার মধ্যেই রয়েছে ট্যান্টালাম, যা খুবই বিরল প্রকৃতির খনিজ দ্রব্য বলে মনে করা হয়. তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে পারমানবিক, কম্পিউটার প্রযুক্তি, মোবাইল টেলিফোন ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে. এই ধাতুর চাহিদা, তা সরবরাহের পরিমানের চেয়ে অনেক বেশী. গত দশকে ট্যান্টালাম দামের ক্ষেত্রে দশ গুণ বেড়ে গিয়েছে. কঙ্গোর ধাতু উত্পাদন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে এখনই কোনও বিপর্যয়ের আশঙ্কা করার দরকার নেই – উত্পাদকরা এই ধাতুর অনেক সঞ্চয় তৈরী রেখেছেন.তা স্বত্ত্বেও পরিস্থিতি আশঙ্কা জনক, তা বিজ্ঞানীদের বাধ্য করছে বিকল্পের সন্ধান করার জন্য, এই কথা উল্লেখ করে “আলর” গ্রুপ অফ কোম্পানীর কার্যকরী ডিরেক্টর সের্গেই খেস্তানভ বলেছেন:

“ট্যান্টালাম বিরল ধাতুর মধ্যে পড়ে, তা বিশ্বের খুব কম জায়গাতেই উত্পাদিত হয় আর সেই হিসাবে এই ধাতু বাজারেও খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়. বিগত কিছু কাল ধরে এই সব বিরল ধাতুর দামের অনেক বেড়ে যাওয়া দেখতে পাওয়া গিয়েছে. এটাই বাধ্য করেছে, সমুদ্রের জল থেকে এই ধরনের ধাতু নিষ্কাশনের বিষয়ে গবেষণায়. এই ধরনের উত্পাদন খুবই ব্যয় সাপেক্ষ, কিন্তু সরবরাহে সমস্যা হলে, এই ধরনের উত্পাদনের ব্যবস্থা তৈরী করতেই হবে. সবচেয়ে বেশী করে ট্যান্টালাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে ইলেকট্রনিক শিল্পে. যদি এই বিরোধ এক বছরের বেশী সময় ধরে না চলে, তবে বিশ্বের শিল্প এটা কোন বিশেষ ক্ষতি ছাড়াই পার হতে পারবে”.

কিন্তু কঙ্গো দেশে কতদিন ধরে এই বিরোধ চলবে, তা খুবই বলা কঠিন: গত বারে বিরোধ চলেছিল বেশ কয়েক বছর ধরে. বিশ্বের আরও অনেক জায়গাতেও খনিজ দ্রব্যের জন্য লড়াই চলছে. যেমন, এই কিছু দিন আগেও সম্পূর্ণ আকারের যুদ্ধের সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা সুদান ও দক্ষিণ সুদানকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন বেজিং ও ওয়াশিংটনের বিরোধের মঞ্চ বলে. জানাই আছে যে, চিন আরও বেশী করেই প্রভূত সম্পদের অধিকারী আফ্রিকা মহাদেশ আগ্রাসনে নেমেছে, সেখানে বহু শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে. তার ওপরে এই ব্যাপারকে তারা নিজেদের পররাষ্ট্র নীতির একটি স্ট্র্যাটেজিক দিক বলেই ভাবে. খনিজ তেলের খনি রয়েছে দক্ষিণ সুদানে, যারা গত বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সহায়তায় পেয়েছে স্বাধীনতা, আর তা সরবরাহ করা সম্ভব শুধু সুদানের মধ্যে দিয়েই. তাই খনিজ তেলের উত্পাদনের চেয়ে তা সরবরাহের প্রশ্ন বর্তমানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়.

প্রসঙ্গতঃ, চিন নিজেই, কিছু এই দেশের সহকর্মীরা যেমন বলেছেন, শুরু করেছে বিরল ধাতু রপ্তানী কম করতে, যা উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন জিনিষের উত্পাদনে প্রয়োজন. চিনের এলাকার মধ্যে রয়েছে এই স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের শতকরা ৯৭ শতাংশ. সম্ভবতঃ পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় যে বিরল খনিজের ভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, তার থেকে উত্পাদন শুর করা হলে. কিন্তু এখনও চিনের এই বিষয়ে একাধিপত্য উত্পাদকদের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে সুদূর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ইয়াকভ বেরগের বলেছেন:

“যেহেতু এই সম্পদের সঞ্চয় অনন্ত নয়, তাই চিন এর উত্পাদন ও রপ্তানীর বিষয়ে কোটা ব্যবস্থা চালু করেছে. এটা স্বাভাবিক উপায় আর তা যে কোন দেশের জন্যই. আর চিন যে এই কোটা ব্যবস্থাকে বৈদেশিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করে থাকে, তাও স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে.

বিশ্বের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে. মানবসমাজকে প্রযোজনীয় শক্তি ও প্রাথমিক প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র পাইয়ে দেওয়াই এক নম্বর সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে. বহু দেশেরই কাঁচামালের উপরে নিয়ন্ত্রণ একটা বেঁচে থাকার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর তা একেবারেই আক্ষরিক অর্থে. আর যারা উপরে রয়েছে – তাদের জন্য এটাই হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীণ ভাবে ধনী হওয়ার. সুতরাং কাঁচামালের জন্য যুদ্ধ নামের মহামারী, মনে হয়, খালি প্রসারিতই হবে”.