পর্যবেক্ষকরা এক সুরে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, বৃহস্পতিবার থেকে চালু হতে যাওয়া ভারতীয় লোকসভার শীতকালীণ অধিবেশন হবে খুবই উত্তপ্ত. খুব কমই বলতে পেরেছিলেন যে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন ঐক্যবদ্ধ প্রগতিশীল জোটের জন্য এই অধিবেশন বা ডঃ মনমোহন সিংহের মন্ত্রীসভার জন্য এই অধিবেশন ইস্তফা দেওয়ার মতো হবে কিনা, আর ভারতের জন্য অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচন নিয়তি হতে চলেছে কি না. প্রথম দফার আক্রমণ মন্ত্রীসভা প্রতিহত করতে পেরেছে: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত অনাস্থা প্রস্তাব – যিনি কিছুদিন আগেই এই জোটের শরিক ছিলেন, আর বর্তমানে জোটের এক প্রধান বিরোধী হয়ে উঠেছেন, তা ধোপে টেকে নি.

বিগত কয়েক মাস ধরে জোট সরকার যে সমস্যার সামনে পড়েছে তা খুবই বেদনা দায়ক. সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের খুচরো ব্যবসায়ে বিদেশী বৃহত্ পূঁজির অনুপ্রবেশ প্রবল প্রতিধ্বনি ও প্রচুর আশঙ্কার কারণ হয়েছে, এই কারণে যে, ভারতে সেই ধরনের নেটওয়ার্ক, যেমন ওয়ালমার্ট, বহু লক্ষ ভারতীয় ক্ষুদ্র উত্পাদক ও ব্যবসায়ীর দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণ হবে, যারা জিনিষ পত্র ও খাদ্য দ্রব্য উত্পাদন ও সরবরাহ করে থাকেন. প্রশাসনের জোট থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের বেরিয়ে আসা, যে দলের নেত্রী মমতা, তা মন্ত্রীসভার প্রতি অনাস্থা প্রস্তাব আনার মত বিষয়ে উদ্বিগ্ন করেছিল. খুবই তীক্ষ্ণ হয়েছে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন. এক গুচ্ছ অসমাধিত প্রশ্ন ও গৃহীত না হওয়া আইন সমাজে খুবই তীক্ষ্ণ বিতর্কের উদ্রেক করেছে. যেমন, সামাজিক প্রয়োজন আর বৃহত্ পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্প গুলির জন্য জমি বরাদ্দ করা অথবা খনিজ দ্রব্য উত্পাদন সংক্রান্ত আইন ও তার থেকে উত্পন্ন লাভের বাঁটোয়ারার প্রশ্নে স্থানীয় সমাজ ও কোম্পানী গুলির মধ্যে বিতর্কিত আইন ইত্যাদি.

এই সমস্ত প্রশ্নের প্রত্যেকটিতেই, যদি সরকারের পক্ষে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত না হয়, তবে তা মন্ত্রীসভার মেয়াদ কমিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট হতে পারে বলেই উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি, তিনি বলেছেন:

“সম্ভবতঃ, শাসক জোট ও ইউপিএ জোটের নেতৃত্ব দেওয়া ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে এটা খুব ভাল করেই বুঝতে পরেছেন তার বিখ্যাত সব সক্রিয় সদস্যরা, তাই তারা মন্ত্রের মতো আউড়ে যাচ্ছেন যে, সরকার নিজেদের শক্তির বিষয়ে দৃঢ় মনোভাবাপন্ন ও কোন রকমের ইস্তফা দেওয়া বা অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচন হবে না. কিন্তু তা স্বত্ত্বেও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগে থেকেই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হতে ও এক নির্বাচনী যোগাযোগ পরিষদ তৈরী করেছে, যার নেতৃত্ব দিয়েছে নেহরু – গান্ধী পরিবারের থেকে বের হওয়া রাহুল গান্ধীর হাতে. এখন বড় প্রশ্ন হল যে, এই নির্বাচন কতটা সঠিক হয়েছে:আজ থেকে এক বছরেরও কম সময় আগে রাহুল এই পরিবারের জন্য গাঁটি স্বরূপ উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে খুবই বড় রকমের অসাফল্য দেখেছেন. কিন্তু যাই হোক না কেন এই রকমের নির্ধারণ থেকে বোঝা গিয়েছে যে, জাতীয় কংগ্রেস দল যে কোন রকমের ঘটনা পরিবর্তনের জন্যই তৈরী রয়েছে”.

যেমন আশা করা হয়েছিল যে, লোকসভার প্রথম অধিবেশন বৃহস্পতিবারে তেমনই উত্তাল হয়েছে. অনাস্থা প্রস্তাব ভোটের জন্য আনা হয়েছিল, কিন্তু বিরোধী পক্ষের নেতৃস্থানীয় শক্তি ভারতীয় জনতা দল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আহ্বানে সাড়া দেয় নি. অনাস্থা প্রস্তাব বিফল হয়েছে একেবারেই.

এটা কিন্তু সমস্ত সমাধানের কোন ইঙ্গিত দেয় নি, আর শুক্রবারে খুবই অল্প সময়ের অথচ প্রবল উত্তেজনার মধ্যে খুচরো ব্যবসায়ে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ প্রশ্নে আলোচনার পরে অধিবেশন স্থগিত রাখা হয়েছে ও তা সোমবার পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়েছে.

এখানে প্রধান প্রশ্ন হল – অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচন কি নির্দেশ করা হবে. বরিস ভলখোনস্কি মনে করেন যে, খুব সম্ভবতঃ হবে না. তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন:

ক্ষমতাসীন দল এমনকি তৃণমূল কংগ্রেস তাদের জোট ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও যথেষ্ট শক্তিশালী ভাবেই নিজেদের সদস্যদের সমর্থনে বজায় রয়েছে. নিজেদের ইচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে আসা, বিশেষত, বাজেটের অর্থ প্রবাহ থেকে নিজেদের বিযুক্ত করা কংগ্রেস বা তাদের জোটের কোন ছোট দলও করতে চাইবে না. এর অর্থ হল যে, যে কোন ধরনের অনাস্থা সংক্রান্ত ভোটের কোন ফলই হবে না.

ক্ষমতাসীন দলের প্রধান বিরোধী পক্ষের জন্যও অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচনে কোন বিশেষ লাভের আশা নেই, যারা মোটেও ভিত্তিহীন ভাবে আশা করছে না যে, যত বেশী দিন ধরে এই জনপ্রিয় না হওয়া সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততই বেশী তাদের ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে”.

সুতরাং সমাজে ও পার্লামেন্টের চার দেয়ালের মধ্যে যে ঝড় উঠেছে, তা তো মনে হয় না যে, বর্তমানের সরকারের নৌকা উল্টে দেবে, এই রকমই মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.