বুধ থেকে বৃহস্পতিবারের রাত জুড়ে পাকিস্তানের বেশ কিছু বড় শহরে এক সারি অন্তর্ঘাত হয়েছে, যা করেছে শিয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে সুন্নী চরমপন্থীরা. এই সন্ত্রাসবাদ কাণ্ডে কম করে হলেও ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে. সুন্নী মুসলিমদের শিয়াদের উপরে আক্রমণ বিগত সময়ে পাকিস্তানের জন্য সাধারন ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে. কিন্তু বর্তমানের সন্ত্রাসবাদী কাণ্ডের একটা প্রতীকী সংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে: তা হয়েছে ইসলামাবাদে আসন্ন ডি- ৮ শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে – এটি সেই আটটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের দেশ গুলির নেতাদের সম্মেলন, যারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে খুব একটা খারাপ গতি প্রদর্শন করে নি.

এই সব সন্ত্রাসবাদী ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হয়েছে রাওয়ালপিণ্ডি শহরে মধ্য রাতের সামান্য আগেই – এটা সেই বড় শহরে, যাকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের পরে গুরুত্বের দিক থেকে সবচেয়ে কাছের মনে করা হয়ে থাকে. এক আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদী এখানে এক শিয়াদের মসজিদের কাছে নিজে আত্মহত্যা করে আরও ২৩ জনের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, বহু লোক আহতও হয়েছে. আরও একটি এর থেকে সামান্য কম রক্তাক্ত অন্তর্ঘাত হয়েছে এর সামান্য কিছু আগেই দেশের আরও একটি বড় শহর করাচিতে.

মানবাধিকার রক্ষা কর্মীদের হিসেব মতো, এই বছরে পাকিস্তানে অন্তর্ঘাত কাণ্ডে নিহত হয়েছে ৩০০ জনেরও বেশী শিয়া মুসলিম. কিন্তু বর্তমানের এই সন্ত্রাসবাদী কাণ্ড স্পষ্ট করা হয়েছে ইসলামাবাদের “আট উন্নতিশীল দেশের” সম্মেলনকে লক্ষ্য করেই, যাদের মধ্যে, পাকিস্তান ছাড়া রয়েছে ইজিপ্ট, ইরান, তুরস্ক, বাংলাদেশ, নাইজিরিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া, অর্থাত্ সেই সব দেশ, যেখানে মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ. এখানে একমাত্র ব্যতিক্রম নাইজিরিয়া, যেখানে মুসলিম ও খ্রীষ্টানদের সংখ্যা প্রায় সমান.

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এই ডি – ৮ জোট তৈরী হয়েছিল আর কিছু দিন আগে পর্যন্তও বিশ্বের মঞ্চে আলাদা করে এদের খুব একটা লক্ষ্য করা যেত না. কিন্তু বর্তমানের শীর্ষ সম্মেলনে মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে. আর এই ঘটনার পটভূমিতে আরও বেশী করে ইন্ধন জুগিয়েছে ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের হামাস গোষ্ঠীর মধ্যে পরিস্থিতি তীক্ষ্ণ হওয়া এবং সিরিয়াকে ঘিরে উত্তেজনার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি. এখানে মনে রাখা দরকার যে, বাস্তবে ডি- ৮ এর সমস্ত অংশীদার দেশই গাজা সেক্টরে ইজরায়েলের কাজের ঘোরতর বিরোধী, আর এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী জোর গলায় সমালোচনা করেছে তুরস্ক, ইরান ও ইজিপ্ট.

ডি ৮ এর সদস্য দেশ গুলির মধ্যে আরব রাজতন্ত্রের একটি দেশও নেই, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সৌদি আরব ও তার পাশের দেশ গুলিই বর্তমানে ঐস্লামিক বিশ্বে মুখ্য ভূমিকার দাবী করেছে. যখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ঐস্লামিক ডি ৮ দেশ গুলির শীর্ষ সম্মেলনের প্রতি বেশী মনোযোগ দিতে বাধ্য করেছে, তখন এই সম্মেলন সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমীরশাহীকে বাদ দিয়ে করাটাই তাদের নেতৃত্বের প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে”.

পাকিস্তানের “তালিবান” আন্দোলন এই অন্তর্ঘাতের সঙ্গে নিজেদের যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছে, তাদের প্রতিনিধি বলেছে – “শিয়া মুসলিম লোকরা অবিশ্বাসী ও মিথ্যা ধর্মের আদর্শকে মানে, তাদের আমরা কোন রকম ভাবেই ছাড় দেবো না. আগামী দিন গুলিতে আপনারা দেখবেন নতুন আক্রমণ”.

এই আন্দোলন যদিও আফগানিস্তানের তালিবান আন্দোলনের মতই একই নামের ও তাদের মতই একই ধরনের প্রজাতি ও উপজাতি গত ভিত্তিতে তৈরী, তবুও আফগানিস্তানের তালিবদের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই বলে মনে করে বরিস ভলখোনস্কি যোগ করেছেন:

“একবিংশ শতকের প্রথম দশকে এই তেহরিক-এ-তালিবান– পাকিস্তান দলের সৃষ্টি করা হয়েছে আর তাদের প্রধান লক্ষ্য – পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা. আর নিজেদের নামকরণের বিষয়ে তারা যে একই ধরনের শব্দ বেছে নিয়েছে, তার কারণ অত্যন্ত সহজ: এটা করা হয়েছে যাতে সারা বিশ্বের জনমতকে একটা ভ্রান্ত ধারণা দেওয়া যায় যে, প্রয়োজনে আফগানিস্তানের তালিবদের দিকেই “অঙ্গুলি নির্দেশ” করানো যায়”.

যদি উপরে দেওয়া সব কিছু কারণকে এক করা হয়, তবে একটা সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে: কারও একটা (প্রাথমিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, ইজরায়েলের ও সৌদি আরবের ও তাদের উপগ্রহদের) খুবই লাভজনক মনে হচ্ছে না এই বর্তমানের ইসলামাবাদের শীর্ষ সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সেই সব দেশের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া, যেমন তুরস্ক, ইজিপ্ট, ইরান ও পাকিস্তান. আর তার মানে হল যে, শীর্ষ সম্মেলন যদি মুলতুবি করতে নাও পারা যায়, তবুও কম করে হলেও তাকে বর্ণহীন করে দেওয়া. আর এর জন্য “তালিব” চরমপন্থী বলে যারা পাকিস্তানে রয়েছে, তারাই খুব ভাল করে কাজে লাগতে পারে.