ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে সেখানের এক আলাদা করে উল্লেখ যোগ্য ও যার সম্বন্ধে নানা ধরনের মন্তব্য রয়েছে, সেই “শিব সেনা” দলের বালা সাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পরে, আবারও অনেক প্রশ্ন উঠেছে বাক্ স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে তুল্যমূল্য ইত্যাদি বিষয়ে বিচার নিয়ে. এই প্রশ্ন গুলি শুধু ভারতকেই স্পর্শ করে না. তা আজ সমস্ত আধুনিক মানব সমাজের সামনেই রয়েছে বলে মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি মন্তব্য করেছেন.

বালা সাহেব ঠাকরের মৃত্যু – যিনি এই “শিব সেনা” দলের স্রষ্টা ও তার অপরিবর্তনীয় সর্বকালীণ নেতাও ছিলেন আর যাকে ভারতে ও তার বাইরেও মনে করা হয় জাতীয়তাবাদী চরমপন্থী বলেই – সারা ভারত জুড়ে একটা চমক সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে তার রাজ্য মহারাষ্ট্রেই, যেখানে এই দলের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান. ঠাকরের অন্তিম ক্রিয়ার দিনে মুম্বাই শহরে সমস্ত কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ, তার সঙ্গে দোকান পাট, এমনকি ট্যাক্সিও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল. বাস্তবে মুম্বাই শহরের কর্ম জীবন ছিল একেবারেই পঙ্গু অবস্থায়.

এখানে আমরা প্রশ্ন করতে যাবো না যে, এই বন্ধ নিজে থেকেই হয়েছিল, নাকি তার দলের সমর্থকরা করতে বাধ্য করেছিল আর যাদের কাজ কারবার, তারা ভয় পেয়েছিলেন ভাঙচুর আর লুঠ তরাজের. কিন্তু জীবনের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গুলিও বন্ধ থাকা বহু লোকেরই পছন্দ হয় নি. কিন্তু তা স্বত্ত্বেও সমস্ত অসন্তুষ্ট লোকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন নি, শুধু দুই যুবতীই হয়েছেন. তাদের মধ্যে একজন (এটা আবার মরার ওপরে খাঁড়ার ঘায়ের মতো ব্যাপার যে, সে আবার মুসলিম) “ফেসবুক” সাইটে লিখেছিল: “এই ধরনের লোকরা, যেমন ঠাকরে, প্রতিদিনই জন্মাচ্ছে ও মারা যাচ্ছে, আর মোটেও এর জন্য সমস্ত কল কারখানা বন্ধ করার দরকার ছিল না”. অন্য জন স্রেফ তার বান্ধবীর মন্তব্যের তলায় “লাইক” প্রতীক দিয়েছিল.

প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল খুবই কড়া. “শিব সেনা” দলের পক্ষের লোকরা শাহীনের কাকার ক্লিনিক ভেঙে দিয়েছিল ও তাকে আর তার বান্ধবীকে সমস্ত নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে গ্রেপ্তার অবধি করিয়েছিল, পুলিশ বাহিনী দিয়ে. এই যুবতীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করার ও তাদের বাধ্য করা হয়েছিল “ফেসবুক” সাইটে এই মন্তব্য মুছে ক্ষমা চাইতে. প্রায় সারা রাত ধরেই তাদের থানায় ধরে রাখা হয়েছিল, পুলিশের লোকরা শেষ অবধি এদের জামিনের বিনিময়ে ছেড়েছিল.

মহারাষ্ট্রের ঘটনায় সারা দেশ উত্তাল হয়েছে. অনেকেই এই ঘটনার মধ্যে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের নতুন উদাহরণ দেখতে পেয়েছেন, তাই বরিস ভলখোনস্কি উল্লেখ করেছেন:

“অগ্নিতে ঘৃতাহুতি করেছে সেই রিপোর্ট, যা আন্তর্জাতিক সংস্থা “সীমানা বিহীণ সাংবাদিক সঙ্ঘ” প্রকাশ করেছে. তারা লিখেছে যে, বিশ্বের ১৭৯ টি দেশের মধ্যে সংবাদ মাধ্যম ও ইন্টারনেটে বাক্ স্বাধীনতার প্রসঙ্গে ভারত বর্তমানে রয়েছে ১৩১ নম্বরে, আর এটা হয়েছে গত দুই বছরে আরও ২৬ ধাপ নীচে নেমে আসাতে. ভারতের “টাইমস অফ ইন্ডিয়া” সংবাদপত্র লিখেছে “এই নিন আপনাদের তথাকথিত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের ছবি!”

আর এখানেই উঠে আসে বহু প্রশ্ন. এই কথা সত্য যে, ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করার প্রয়োজন রয়েছে, আর তা যারা অপমান করে, তাদের বাদা দেওয়া দরকার রয়েছে. কিন্তু সারা শহরের সমস্ত কল- কারখানা, দোকান পাট বন্ধ করা নিয়ে অবোধ্য হওয়া প্রসঙ্গে মন্তব্য করে যুবতীই বা কি ভাবে অপমান করে থাকবে? শেষমেষ বালা সাহেব ঠাকরে ছিলেন এক সাধারন (বহু লোক তাকে সম্মান করলেও) মানুষ, বরং একেবারেই কোন ভগবান নন. তার ওপরে এমন অনেক লোক আছেন, যারা তার প্রতি মোটেও খুব একটা উষ্ণ অনুভূতি পোষণ করতেন না.

তারপরে. ইন্টারনেটের গ্রাহকদের সামাজিক দায়িত্ব ও বাক্ স্বাধীনতার নীতির প্রতি কি রকম ভাবে দেখা হচ্ছে? অবশ্যই, সবচেয়ে চরমপন্থী কাজকর্ম (শিশু ব্যবহার করে বিকৃত কাম, হিংসার প্রসারের আহ্বান আর সেই ধর্মীয় অনুভূতিকে অসম্মান) করাতে বাদা দেওয়া দরকার. কিন্তু এই লক্ষ্য কি পূরণ করা সম্ভব, যখন সমস্ত জায়গা জুড়েই এখন ইন্টারনেট রয়েছে? আর ইন্টারনেট কি নিজে থেকেই এক রকমের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জায়গায় পরিণত হচ্ছে না (যেমন ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ও ত্সুনামি), যার থেকে প্রয়োজন আছে ও দরকারও রয়েছে প্রতিরক্ষা করার, কিন্তু যাকে বশ মানান যায় না?

আর যদি এই নির্দিষ্ট ঘটনাকে নিয়ে বলা হয়, তবে এখানে খুব সম্ভবতঃ কোন প্রয়োজনই ছিল না যুবতীরা তাদের মন্তব্য করায় বাধা পাক, বরং তার পরে পুলিশের তরফ থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ও গুণ্ডাদের তরফ থেকে ক্লিনিক ধ্বংস করে যে অপরাধ করা হয়েছে, সেটাতেই বাধা দেওয়ার দরকার ছিল”.

0প্রসঙ্গতঃ, এই সব প্রশ্নের অনেক গুলিই শুধু ভারতকে নিয়েই করা যায় না, বরং সেই প্রবণতার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে, যা আজ সমগ্র মানব সমাজেরই চরিত্র স্খলনের ফলে হয়েছে, যারা আজ প্রবেশ করেছে সামগ্রিক কম্পিউটার জড়ানোর জগতে ও বসুন্ধরাকে তার কাল্পনিক আলিঙ্গনে আবদ্ধ করার মধ্যে.