মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিনকে মায়ানমার থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ কারবার শুরু করেছে. রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এই বিষয়েরই সঙ্কেত হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির ইতিহাসে প্রথম এই দেশে সফর. সোমবারে বারাক ওবামাকে স্বাগত জানিয়েছে বহু সহস্র লোকের ভীড়, যা বিমান বন্দর থেকে রেঙ্গুন অবধি রাস্তার দুই ধারে হয়েছিল.

এই সফরের অব্যবহিত আগে ওয়াশিংটন মায়ানমার থেকে মূল্যবান রত্নের আমদানীর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে. এর আগেই তারা এই দেশে বিনিয়োগ করার স্বীকৃতী দিয়েছে, যা সেই দেশে সামরিক নেতৃত্বের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল. নিজে বারাক ওবামা এখানে উপহার নিয়ে এসেছেন, ঘোষণা করেছেন ইউএসএইড সংস্থার কাজ আবার চালু করার কথা, আর তাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ করে দিয়েছেন আগামী দুই বছরের জন্য ১৭ কোটি ডলার.

তাঁর সফর মায়ানমারের প্রশাসন নিজেদের রাজনৈতিক জীবন লিবারেল করার জন্য যে শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, তারই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতী হিসাবে মূল্যায়ণ করেছে. দেশে সত্যই সেন্সর তুলে নেওয়া হয়েছে, রাজনৈতিক বন্দীদের ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে, পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছে. একই সঙ্গে এই দেশে রাজনৈতিক সংশোধন এখনও অনেক দূরই করা বাকী রয়েছে. শাসক সামরিক উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের পোষাক সামরিক ইউনিফর্মের বদলে সামাজিক পোষাক হওয়াতে সেটাকে মোটেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পত্তন হয়েছে বলে চালানো যায় না. কিন্তু এটাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন বিরাগ উত্পাদিত হচ্ছে না. ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ. এই বিষয়ের উপরেই মনোযোগ দিয়েছেন ভূ- রাজনৈতিক একাডেমীর প্রথম উপ সভাপতি কনস্তানতিন সিভকভ, তিনি বলেছেন:

“আমেরিকার লোকরা খুবই বড় রকমের হার স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে নিকটপ্রাচ্যে ও উত্তর আফ্রিকাতে, তাদের প্রভাব খুবই দ্রুত কমে এসেছে, তার বদলে এসেছে ঐস্লামিক প্রভাব. লাতিন আমেরিকাতেও আমেরিকার লোকদের ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে. সেখানে তাদের ভূমিকা গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে যেন মৃত পশুর কাঁচা চামড়ার মতোই. তাদের জন্য এখন বাকী রয়েছে শুধু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণের অংশ, কিন্তু সেখানে খুবই সক্রিয়ভাবে ঢুকে পড়ছে চিন. এখান থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই এলাকার প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি হয়েছে, তার মধ্যে মায়ানমারেও. সেখানে চিনের প্রভাব খুবই শক্তিশালী, সেটা যেমন বাণিজ্যে, অর্থনীতিতে, বিনিয়োগে ও তেমনই সামাজিক ক্ষেত্রেও. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাড়াহুড়ো করছে পরবর্তী কালে চিনের প্রভাবকে খর্ব করার জন্যই”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে চিনকে শুধু মায়ানমারেই আটকানোর জন্য নয়, এই রকম মনে করেন সামাজিক – রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ. এমনি কোন কারণ ছাড়াই দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পরেই সফর করেছেন ওবামা মায়ানমার ছাড়াও থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াতে, এমন বলা যেতে পারেনা, তাই তিনি যোগ করেছেন:

“এখানে কথা শুধু মায়ানমার নিয়েই হচ্ছে না, কথা হচ্ছে সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া নিয়েই. আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে এই এলাকাকে চিনের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে. তার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে এলাকা সংক্রান্ত সমস্যাকে, প্রাথমিক ভাবে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনসের সঙ্গে. চিনের দিক থেকে বিপদকে বাড়িয়ে বলা হচ্ছে. সবই করা হচ্ছে যাতে, চিনের ভূমিকাকে দুর্বল করা সম্ভব হয় ও এই এলাকাকে একেবারেই আমেরিকার প্রভাবের এলাকা বানানো যায়. দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও তারই সঙ্গে মায়ানমারও. এটা খুবই সুবিধাজনক জায়গা, যেখান থেকে চিনের কাছে আসা সম্ভব. তার মধ্যে একটি উপায় হল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বানানো. এখানে বাদ দেওয়া যেতে পারে না যে, স্থানীয় রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও এই দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই সক্রিয়ভাবে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে”.

ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের বিরোধ বাড়তেই থাকবে, এই রকম মনে করে কনস্তানতিন সিভকভ বলেছেন – কিন্তু আমেরিকার লোকদের নিজেদের লক্ষ্য সাধনে খুবই কষ্ট হবে – তিনি যোগ করেছেন:

“চিন এই এলাকার সঙ্গে প্রজাতিগত ভাবে যুক্ত, তাদের এখানে বিশাল লোকসংখ্যা জনিত ক্ষমতা রয়েছে, তা যেমন চিন থেকে বেরিয়ে আসা লোকদের মাধ্যমে, তেমনই চৈনিক বংশোদ্ভূত লোকদেরই জন্য. শেষ মেষ, চিন – এটা উঠতি অর্থনৈতিক শক্তি, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র – যারা পতনের পথে. আগামী ভবিষ্যতে চিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যেমন অর্থনৈতিক শক্তিতে, তেমনই সামরিক ও ভূ- রাজনৈতিক ক্ষমতায় পার হয়ে যাবে”.

মায়ানমারের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ মজবুত করা – চিনের একটা প্রাথমিক কাজ. এই অষ্টাদশ পার্টি কংগ্রেস চলার সময়েও চিনে সফর করতে এসেছিলেন মায়ানমারের জাতীয় প্রতিরক্ষা নেতৃত্বের উপপ্রধান ও দেশের পদাতিক বাহিনীর প্রধান সো ভিন, সেটা শুধুশুধুই করা হয় নি আর বারাক ওবামার রেঙ্গুন সফরের ঠিক আগেই বেজিং শহরে চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিয়াং গুয়াংলে মায়ানমারের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক যোগাযোগ মজবুত করার কথা কোন কারণ ছাড়া ঘোষণা করেন নি.