সত্তর বছর আগে এই দিনে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণামের অনেকটাই পূর্ব নির্দিষ্ট করে দিতে পেরেছিল. ১৯৪২ সালের ১৯শে নভেম্বর লাল ফৌজ স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধে উল্টো দিকে আক্রমণ শুরু করেছিল. এই অপারেশনে জার্মান – ফ্যাসিস্ট বাহিনীর সেনা বাহিনী সম্পূর্ণ ভাবেই ধ্বংস হয়েছিল ও স্তালিনগ্রাদের দেওয়াল থেকেই ১৯৪৫ সালের মহান বিজয়ের পথের শুরু হয়েছিল.

১৯শে নভেম্বর ১৯৪২ সালের খুব ভোর বেলায় লাল ফৌজের বহু সহস্র কামান শত্রু পক্ষের অবস্থানের উপরে একই সঙ্গে গর্জে উঠে গোলা বর্ষণ করতে শুরু করেছিল, আর তার পরেই ধেয়ে এসেছিল লাল ফৌজের পদাতিক বাহিনীর যোদ্ধারা. কয়েক দিনের মধ্যেই লাল ফৌজের সেনারা সম্পূর্ণ ভাবেই ফ্যাসিস্টদের ঘিরে ফেলেছিল. সেই ঘেরাও জায়গায় আটকা পড়েছিল জেনারেল, অফিসার সহ তিন লক্ষ তিরিশ হাজার সৈন্য. পরবর্তী তিন মাস ধরে চলেছিল খুবই নিষ্ঠুর যুদ্ধ. কিন্তু জার্মানরা এই অগ্নি কুণ্ড থেকে ছিটকে বের হতে পারে নি.

ভলগা নদীর তীরে এই যুদ্ধ, যার সাঙ্কেতিক নাম ছিল “ইউরেনিয়াম”, তার পরিকল্পনা করা হয়েছিল দুই মাস ধরে. অবরুদ্ধ স্তালিনগ্রাদের উপকণ্ঠে একেবারে চরম গোপনীয় ভাবে পশ্চিম সাইবেরিয়া থেকে পাঠানো হয়েছিল যোদ্ধা ও অস্ত্র সম্ভার, তৈরী করা হয়েছিল খুবই শক্তিশালী আঘাত হানার গোষ্ঠী.

ঐতিহাসিকরা এই সময়কে সমগ্র দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ইতিহাসে মনে করেন সর্ব্বোচ্চ ও প্রধান দিক বদলের সময় হিসাবেই. জার্মান যুদ্ধ যন্ত্রের জন্য, যারা সেই সময়ের মধ্যে প্রায় সমগ্র ইউরোপ জয় করে এসেছিল, তাদের জন্য এটা ছিল এক ধ্বংস করে দেওয়ার মতো আঘাত, যা থেকে তারা আর সুস্থ হতে পারে নি, এই কথা উল্লেখ করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর সমগ্র ইতিহাস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মিখাইল মিয়াগকভ বলেছেন:

“এই খানেই যুদ্ধের মানসিক ভাবে দিক পরিবর্তন ঘটেছিল. তা শুধু এই কারণেই নয় যে, জার্মানরা সেখানে প্রধান বাহিনী গুলিকে ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছিল, আর হিটলার এই শহরের উপরে খুবই বড় রাজনৈতিক তাত্পর্য দিয়েছিল. সেই সময়ে জার্মান সেনা বাহিনীর মানসিক আস্থা ভঙ্গ হয়েছিল. আর সোভিয়েত সেনা বাহিনী টের পেয়েছিল যে, শত্রুকে এবারে আটকে দেওয়া যেতে পারে”.

প্রতি আক্রমণের আগে বহু মাস ধরে চলেছিল খুবই কঠিন যুদ্ধ. তৃতীয় রেইখের সেনাবাহিনী জুলাই মাসের মাঝামাঝি স্তালিনগ্রাদের দিকে চলতে শুরু করেছিল ও তারা আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, আগষ্ট মাসের মধ্যেই এই শহর পরাজিত হবে, আর তারা এই শহরের মধ্যে দিয়ে ককেশাসের খনিজ তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল গুলির দিকে যেতে পারবে. কিন্তু তারা এই শহরের অধিবাসীদের পক্ষ থেকে একেবারেই অবিশ্বাস্য রকমের প্রতিরোধের সম্মুখীণ হয়েছিল, যারা এই শহরের জন্য নিজেদের জীবন দিয়ে লড়তে তৈরী হয়েছিল.

এই প্রতিরোধে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা মনে করেছেন যে, কি ভাবে মামায়েভ কুরগান নামের জায়গা এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের হাতে হাত বদল হয়েছিল, প্রত্যেক রাস্তা ও প্রত্যেক বাড়ীর জন্য কি রকমের কঠিন লড়াই হয়েছিল. ভলগা নদীর পারের যুদ্ধের দিকে প্রায় বন্ধ হয়ে আসা হৃদয় নিয়ে তাকিয়েছিল সারা বিশ্বই. তার পরিণামের উপরে নির্ভর করেছিল সমগ্র মানব সমাজের ভাগ্য. স্তালিনগ্রাদের রক্ষাকারীরা শুধু তাঁদের শহরকেই রক্ষা করেন নি, তাঁরা সমগ্র ইউরোপ ও সারা বিশ্বকে ফ্যাসিজমের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন. স্তালিনগ্রাদ শহরের উপকণ্ঠে হিটলারের সেনা বাহিনীর পরাজয় ইউরোপের দেশ গুলিতেও প্রতিরোধ আন্দোলনকে সক্রিয় করতে সাহায্য করেছিল.

স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ, যা সব মিলিয়ে ২০০ দিন ও রাত ধরে চলেছিল – তা ছিল সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যা আজ অবধি মানব ইতিহাসে ঘটেছে. এই শহরের প্রতিরক্ষার কাজে প্রাণ দিয়েছিলেন প্রায় দশ লক্ষ সোভিয়েত সেনা ও অফিসার. ফ্যাসিস্ট বাহিনী এই যুদ্ধে সোভিয়েত – জার্মান যুদ্ধের এলাকায় তাদের প্রায় একের চতুর্থাংশ শক্তি ক্ষয় করেছিল.