২০০৯ সালের মে মাসে সাড়ে তিন বছর ধরে চলা ও প্রায় এক লক্ষ লোকের প্রাণহানির কারণ হয়ে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ শেষ হয়েছিল. জাতীয় শান্তি প্রক্রিয়া চলছে জটিল ভাবে ও তা সমস্যা মুক্ত হয় নি. কিন্তু মনে হচ্ছে, প্রশাসনের পক্ষ এই দেশে থেকে স্বাভাবিক জীবন চালু করার চেষ্টা মোটেও সকলের পছন্দ হচ্ছে না – আর তা শুধু শ্রীলঙ্কাতেই নয়, বরং তার বাইরেও.

বুধবারে রাষ্ট্রসঙ্ঘ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে শ্রীলঙ্কা সংক্রান্ত বিশেষ পরিষদের রিপোর্ট. তাতে এক সারি খুবই সমালোচনা করে বক্তব্য রাখা হয়েছে শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রতিনিধিদের সম্বন্ধে, যারা গৃহযুদ্ধের শেষ বছর গুলিতে সেখানে কাজ করেছিল. তারা নিহতদের সংখ্যা সম্বন্ধে সত্য সংখ্যা জানায় নি ও সাধারন মানুষের নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করে নি, সেই সমস্ত সামরিক কাজ কর্মের জন্য শ্রীলঙ্কার সরকারের খুবই দুর্বল সমালোচনা করেছিল, যা সাধারন মানুষের জীবন বিপন্ন করেছিল, ইত্যাদি. সব মিলিয়ে গৃহযুদ্ধের শেষ দশায় শ্রীলঙ্কাতে যখন চল্লিশ হাজার তামিল নিহত হয়েছিলেন, সেই সময়কেই নাম দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ পতনের সময় বলে.

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, যদিও রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিরুদ্ধেই আপাত দৃষ্টিতে এই সমালোচনার লক্ষ্য বলে দেখানো হয়েছে, তবুও আসলে তা শ্রীলঙ্কার প্রশাসনের উপরেই আঘাত করার উদ্দেশ্য নিয়ে করা: সেই সমস্ত মানবাধিকার লঙ্ঘণ ও অপরাধ, যা রাষ্ট্রসঙ্ঘের কর্মীরা বন্ধ করতে পারেন নি, তা করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকেই. আর প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ, এমনকি তা আপাত দৃষ্টিতে ঘোষণা না করা হলেও, ধরে নেওয়া হয়েছে, ঘটেছে বলেই.

আর শ্রীলঙ্কার প্রশাসনকে সামরিক অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রতিপন্ন করার সুযোগ করে দিয়েছে, এই কথাই উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের এক প্রাক্তন প্রতিনিধি গর্ডন ওয়েইস ইতিমধ্যেই শ্রীলঙ্কাকে রুয়ান্ডার সঙ্গে তুলনা করেছেন. জানা আছে যে, রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধ সুযোগ করে দিয়েছিল এই নিয়ে বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল তৈরী করে দেওয়ার. শ্রীলঙ্কায় আন্তর্প্রজাতি দ্বন্দ্বের প্যারাডক্স হল যে, দেশের ভেতরেই এই বিরোধকে দেখা হয়েছে সিংহলী বেশীর ভাগ লোকের সাথে সংখ্যালঘু তামিলদের বিরোধ হিসাবে. আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে এখন সম্পূর্ণ ভাবে ভূমিকা বদল হচ্ছে:সিংহলী প্রজাতি প্রধান শ্রীলঙ্কার সরকারই এখন সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে”.

সিংহলী লোকের সংখ্যা শ্রীলঙ্কায় প্রায় দেড় কোটি, আর ঐতিহাসিক জন্মভূমির বাইরে সিংহলী প্রজাতির লোকের সংখ্যা একেবারেই বেশী নয়. অন্য কথা হল তামিলদের নিয়ে, যারা শুধু শ্রীলঙ্কাতেই তিরিশ লক্ষের কিছু বেশী আর শুধু ভারতেই তামিল লোকের সংখ্যা ছয় কোটির বেশী. আবার পশ্চিমের দেশ গুলিতে, আফ্রিকায়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে অস্ট্রেলিয়াতে এই প্রজাতির লোক সংখ্যা সব মিলিয়ে এক কোটি হবে, আর এরা খুবই সক্রিয় লোকজন. ছাপা কাগজ পত্র ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব জোরদার ভাবেই তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রচার চালানো হচ্ছে ও এই সমস্ত দেশের তামিলদের উপরে খুব বড় ধরনের মানসিক প্রভাব সৃষ্টি করা হচ্ছে. আর তামিল মাফিয়া রাজ বর্তমানে তামিল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে নতুন করে গৃহযুদ্ধ শুরু করার জন্য.

রাষ্ট্রসঙ্ঘের মিশনের রিপোর্ট নতুন শ্রীলঙ্কা বিরোধী ঘোষণার জন্য একটা অনুঘটকের কাজ করেছে. ভারতের দক্ষিণের তামিলনাডু রাজ্যে বিরোধী পক্ষের নেতা যিনি আবার ক্ষমতাসীন জোটের অংশীদারও বটে, সেই দ্রাভিড় মুনেত্র কাঝগম দলের নেতা এম করুণানিধি ভারত সরকারকে আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘে শ্রীলঙ্কার তামিলদের জন্য নিজেদের স্বশাসনের জন্য সারা দেশ জুড়ে জনমত আদায়ের ব্যবস্থা করার জন্য বলতে. অনেক পর্যবেক্ষকই এই পদক্ষেপকে নির্বাচনের আগে ডি এম কে দলের নিজেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা বলেই ধরেছেন. কিন্তু যাই হোক না কেন, ভারত সরকার, এমনিতেই তাদের জোট থেকে বেশ কিছু আঞ্চলিক দলের বেরিয়ে যাওয়ার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ায়, মনে তো হয় যে, বাধ্য হবে নিজেদের কম সংখ্যার জোটের এক শরিকের কথা শুনতে.

এই রকমই কিছু একটা গ্রেট ব্রিটেনেও হচ্ছে. সেখানে বিভিন্ন দল থেকে বেশ কিছু প্রভাবশালী পার্লামেন্ট সদস্য প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের কাছে ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে শ্রীলঙ্কায় হতে যাওয়া কমনওয়েলথ শীর্ষ বৈঠকে যোগদান থেকে নিরত হতে আহ্বান করেছেন. এই প্রসঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিভেন হার্পারের ঘোষণা যে, তিনি শ্রীলঙ্কায় এই বৈঠকে যোগ দেবেন না, কারণ সেখানে মানবাধিকারের প্রশ্নে কাজকর্ম খুবই খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে, এটাও উল্লেখযোগ্য.

এই সমস্ত রকমের কোলাহলের পেছনে একটা প্রশ্নের উত্তর মেলে নি: বহির্বিশ্বের চোখে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হলে, তা কি সত্যই “তামিল ইলম স্বাধীনতার টাইগারদের” দলের কাজকর্মের চেয়ে খারাপ দেখায়? সারা বিশ্বেই তাদের স্বীকার করা হয়েছিল সন্ত্রাসবাদী বলে. গত ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের আগে পর্যন্ত তারা সমস্ত ঐস্লামিক সন্ত্রাসবাদীদের এক যোগে করা সমস্ত অন্তর্ঘাতের চেয়ে বেশী সংখ্যায় সন্ত্রাস চালিয়েছে, আর এই ধরনের ঘোষণা দিয়ে শ্রীলঙ্কায় আবার করে বিচ্ছিন্নতাবাদের মাথা চাড়া দেওয়ানোর কি দরকার রয়েছে, যা পূর্বাভাস অযোগ্য পরিণতির দিকেই নিয়ে যেতে পারে, আর তা শুধু এই দেশের জন্যই নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্যও?