মায়ানমারের বিরোধী পক্ষের নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আউন সান সু চ্ঝি বর্তমানে ভারতে সফররত রয়েছেন. সরকারি ভাবে তিনি এসেছেন ভারতে স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ১২৩ তম জন্ম বার্ষিকী উত্সবে অশ নেওয়ার জন্য. প্রসঙ্গতঃ, অনেক কিছুই নির্দেশ করছে যে, শ্রীমতী আউন সান সু চ্ঝির মধ্যে অনেকেই জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে তুলনার যোগ্য এক জাতীয় নেতাকে দেখতে পাচ্ছেন.

আউন সান সু চ্ঝিকে ভারতে যে সম্বর্ধনা জানানো হয়েছে, তা দেখিয়ে দেয় যে, বহু ভারতীয় রাজনীতিবিদই এখন তাঁর মধ্যে শুধু রাজনৈতিক ভাবে বিরোধী পক্ষের নেতাকেই দেখছেন না, বরং সম্ভাব্য জাতীয় নেতাকেই দেখতে পাচ্ছেন, এক রকমের বর্মার নেহরুকে. যদিও ভারতে আসার নিমন্ত্রণ বর্মার বিরোধী পক্ষের নেতাকে আপাত ভাবে পাঠানো হয়েছে সোনিয়া গান্ধীর তরফ থেকে – তাও আবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের সভাপতির তরফ থেকে নয়, নেহরু স্মৃতি তহবিলের সভাপতির তরফ থেকে, তবুও শ্রীমতী সু চ্ঝির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ সহ দেশের সব বড় নেতারাই দেখা করেছেন.

নিজের এই স্মৃতি সভায় দেওয়া ভাষণে আউন সান সু চ্ঝি বলেছেন যে, মায়ানমারের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রামের সময়ে ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের উদাহরণ তাঁকে সব সময়েই প্রেরণা দিয়েছে. আর তিনি জওহরলাল নেহরুর জীবন ও ঘটনার সঙ্গে নিজের জীবনের ঘটনা পরম্পরার অনেক মিল দেখতে পেয়েছেন, বিশেষতঃ দীর্ঘ কারাবাসের প্রসঙ্গে.

কথা প্রসঙ্গে আউন সান সু চ্ঝি তাঁর বক্তৃতায় ভারতের উদ্দেশ্যে সমালোচনাকে খুব একটা লুকিয়ে রাখতে পারেন নি. অংশতঃ, তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, একটা নির্দিষ্ট রকমের ভারত ও মায়ানমারের সম্পর্কের অধ্যায়ে এই সম্পর্ক কিছুটা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল. তিনি বলেছেন যে, আমার মন খারাপ হয়ে যেত, আমরা ভারতের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম, অথবা বলা যেতে পারে যে, ভারতের আমাদের সবচেয়ে দুঃখের দিনে আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল. তিনি নির্দিষ্ট করে বলেন নি যে, এই “আমরা” কারা ও অনেক পর্যবেক্ষকই এই কথা গুলির মধ্যে আন্তর্রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের অবনতিকেই দেখেছেন. কিন্তু যদি ঐতিহাসিক বাস্তবের দিকে তাকানো হয়, তবে এর মধ্যে বরং বেশী করেই সেই বিষয় সম্বন্ধে ইঙ্গিত দেখতে পাওয়া যাবে যে, একটা নির্দিষ্ট সময়ে (নব্বইয়ের দশক ও ২০০০ এর শুরুর দিকে) ভারত, নিজেদের পররাষ্ট্র সংক্রান্ত রাজনীতিতে প্রাচ্যের দিকে লক্ষ্য নামের ধারণা ঘোষণা করে মায়ানমারের সামরিক প্রশাসনের সমালোচনার মাত্রাকে খুব বেশী করেই কমিয়ে দিয়েছিল ও এই দেশের সামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে শুরু করেছিল, এই রকমই মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই ধরনের দিক পরিবর্তনের কারণ বোধগম্য: যতদিন মায়ানমার ছিল পররাষ্ট্র রাজনীতিতে অচ্ছ্যুত হয়ে, একমাত্র দেশ, যারা তাদের সঙ্গে গঠন মূলক সম্পর্ক তৈরী করেছিল, তারা হল চিন. চিনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি নিজেদের সীমান্তের একেবারেই কাছে ভারত স্বাভাবিক ভাবেই নিতে পারে নি. তাই গণতান্ত্রিক নিয়ম ভঙ্গ করার বিষয়ে চোখ বুজে থাকতেই হয়েছিল”.

আজ পরিস্থিতি একেবারেই বদলে গিয়েছে. মায়ানমারে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক সংশোধন তার সমস্ত রকমের অর্ধেক চরিত্র ও পরম্পরার অভাব স্বত্ত্বেও এখনই সম্ভাবনা করে দিয়েছে পশ্চিমের নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র গুলিকে এই দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক শুরু করার. আর সেই ক্ষেত্রে প্রধান জোর যেমন পশ্চিমের দেশ গুলি, তেমনই ভারত, তাদের থেকে পেছিয়ে থাকতে না চেয়ে, দিয়েছে যত না শুধু মাত্র মায়নমারের বর্তমানের শাসকদের উপরেই, তার থেকেও বেশী করে বিরোধী পক্ষের নেতা আউন সান সু চ্ঝির উপরেই, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই বছরের মধ্যেই সু চ্ঝি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছেন, গ্রেট ব্রিটেন ও আরও পশ্চিম পন্থী বহু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশে গিয়েছেন. আর সর্বত্রই তাঁকে দেশের সর্ব্বোচ্চ পর্য়ায়ে স্বাগত জানানো হয়েছে. এখানে মায়ানমারের গণতন্ত্র স্থাপনের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে বলে কোন কথা হচ্ছে না, আর এমনও নয় যে, পশ্চিম এই প্রশ্ন নিয়ে খুব একটা বেশী রকমের চিন্তিত বলে. বরং কথা হচ্ছে আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক কাজের কথা: চিন শক্তি অর্জন করছে ও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ শক্তিতে পরিণত হতে চলেছে খুব শীঘ্রই. শুধু ভারতই এটা সহ্য করতে পারে না, তা নয়, বরং আপাততঃ সব থেকে শক্তিশালী বৃহত্ রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও. আর যাতে চিনের এই এলাকায় প্রভাবের বৃদ্ধিকে ধরে রাখা যায়, তাই প্রয়োজন পড়েছে, যে কোন রকম ভাবেই হোক মায়ানমারকে চিনের রাজনীতির কক্ষ পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করার”.

আর তাই শ্রীমতী আউন সান সু চ্ঝির ভারত সফরকে দেখা উচিত্ হবে শুধু তাঁর আগের পশ্চিমের দেশ গুলি সফরের সঙ্গে একসাথেই নয়, বরং প্রধান বিষয়ের সঙ্গে – মায়ানমার দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার আগামী ১৯শে নভেম্বরের সফরের প্রস্তুতি হিসাবেই.