আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই গত সপ্তাহে তাঁর পাঁচ দিন ব্যাপী ভারত সফরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাত্কার করেছেন ও বেশ কিছু সহযোগিতা নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন. এবারে বাকী রইল খুবই কম- ন্যাটো জোটের সেনা বাহিনী ২০১৪ সালে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে যেন এই দেশ স্থিতিশীলই থাকে ও বিভিন্ন রকমের প্রজাতি ও ধর্ম সংক্রান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে স্বেচ্ছা মৃত্যুর ঘূর্ণি পাকে তলিয়ে যাওয়া গৃহযুদ্ধ লেগে না যায়, যা একবার হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে, সেখান থেকে সোভিয়েত সেনা বাহিনীর প্রত্যাবর্তনের পরে. আর এই ক্ষেত্রে ভারত এক মুখ্য দিক নির্দেশকের ভূমিকা যেমন নিতেই পারে, তেমনই তা করাও উচিত্ হবে, এই রকম মনে করেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি.

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের সময়ে মুম্বাই শহরে হামিদ কারজাই ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর দেশ ভারতীয় বিনিয়োগের জন্য “পরিণত” হয়েছে. “আমরা আপনাদের লাল কার্পেট পেতে স্বাগত জানাতেই পারি, কিন্তু আপনাদেরও এই কার্পেট ঢাকা পথে পা ফেলা দরকার” – ভারতীয় ব্যবসায়ী মহলের শীর্ষস্থানীয় দের কাছে তিনি এই আহ্বান করেছেন. এই ধারণাই কারজাইয়ের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের সময়ে ধ্বনিত হয়েছে, যে বৈঠকের সময়ে বেশ কিছু সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, অংশতঃ, খনিজ দ্রব্য উত্পাদন শিল্পে ও পরিকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে. আজ ভারত বাস্তবে চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে বৃহত্তম বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার জন্যই, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“গত বছরে ভারত লৌহ আকর উত্পাদনের খনিতে কাজ করার জন্য আফগানিস্তানে আহূত টেন্ডারে জয়ী হয়েছিল ও সেখানে একটি ইস্পাত ঢালাই কারখানা তৈরীরও বরাত পেয়েছে – এই চুক্তির মোট মূল্য ধরা হয়েছে এক হাজার একশ কোটি মার্কিন ডলারের সমান. তাছাড়া ভারত সেখানে সড়ক নির্মাণে অর্থ ব্যয় করছে, বিদ্যুত উত্পাদন কেন্দ্র তৈরী করছে ও অন্যান্য পরিকাঠামো সংক্রান্ত জায়গা তৈরী করে দিচ্ছে. ভারতের জন্য আফগানিস্তান “উত্তর – দক্ষিণ”পরিবহন করিডর প্রকল্পের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা ভারতের আরব সাগরে পশ্চিম উপকূলের বন্দর গুলির সঙ্গে ইরানের বন্দর গুলির যোগাযোগ সাধন করতে সাহায্য করবে ও তার পরে মধ্য এশিয়ার দেশ গুলি ও রাশিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথ খুলে দেবে. নিজেদের পক্ষ থেকে চিন, যারা ভারতের চেয়ে কিছু আগে থেকেই আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ করা শুরু করেছে, তারা এর মধ্যেই বিশাল তাম্র আকরের খনিতে ও খনিজ তেল উত্পাদনে বিনিয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে”.

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যা আজ সকলেরই সামনে উপস্থিত হয়েছে, তা হল যারা আফগানিস্তানে ২০১৪ সালের পরে কাজ করার জন্য থাকবে, তাদের বিনিয়োগ পশ্চিমের জোটের বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে কতটা সুরক্ষিত থাকবে, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আঞ্চলিক বৃহত্ রাষ্ট্র গুলির সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে নিজেদের ভূ- রাজনৈতিক লড়াইকে আফগানিস্তানের জমিতে টেনে আনা. এই কথা সত্য যে, এক দিক থেকে ভারত (ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য বিনা শর্তে সমর্থন পেলে)ও অন্য দিক থেকে চিন (পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বিনা শর্তে সমর্থন পাচ্ছে বলে) বিভিন্ন রকমের শক্তির উপরে নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে. ভারত “তালিবান আন্দোলনের” এক ঘোরতর প্রতিবাদী পক্ষ, পাকিস্তান বহু ক্ষেত্রেই শুধু তালিবদের উপরেই নির্ভর করে না, বরং তাদের প্রয়োজন মত সাহায্যও করে থাকে. কিন্তু শক্তি প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান করা ও পক্ষের লোকদের জন্য ওজনের পাল্লা ভারী করা, যাকে রাজনীতি বিদ্যার পরিভাষায় বলা হয়ে থাকে “শূণ্য সঞ্চয় খেলা”, তা তাদের জন্য সহজ হবে না, বরং এমন একটা পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে, যে খেলার পরিনামে সকলকেই হারাতে হতে পারে. তার ওপরে আফগানিস্তান এর মধ্যেই গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এই ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, যখন সোভিয়েত সেনা বাহিনীর প্রত্যাবর্তনের পরে সকলেই এই দেশে সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, আর যুদ্ধ শেষ হয়েছিল “তালিবান আন্দোলনের” স্বৈরতন্ত্র স্থাপন করা দিয়ে”.

আর এখানেই আফগানিস্তানের প্রতিবেশীদের উপরে খুবই দায়িত্বশীল কাজ অর্পণ করা হয়েছে: সেই রকম পরিস্থিতি তৈরী হতে দেওয়া, যেখানে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা কোনও বিরোধে পরিণত হবে না, সবচেয়ে বড় কথা হল – সশস্ত্র লড়াই যেন না হয়. আর এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে সঠিক পথ হল সমস্ত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পক্ষেরই সর্বাপেক্ষা বেশী করে সমাকলন. তার উপরে এই সমাকলন কাজের উপযুক্ত ব্যবস্থাও রয়েছে – এটা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা. আর তার মানে হল, ভারত ও পাকিস্তানের সম্পূর্ণ ভাবে এই সংস্থায় অংশ গ্রহণ ও তারই সঙ্গে ইরান ও আফগানিস্তানের বেশী সক্রিয় ভাবে এই সংস্থায় যোগদানের কাজ করে ফেলতে হবে ২০১৪ সালে ন্যাটো জোটের সেনা বাহিনী আফগানিস্তান থেকে ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই, এই রকমই মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.