অষ্টাদশ কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা দলের সাধারন সম্পাদক হু জিন টাও এর এই সম্মেলন উপলক্ষে দেওয়া বক্তৃতা নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে বিশেষ করে মনোযোগ দিয়েছেন দুর্নীতির সঙ্গে লড়াইয়ের সমস্যা নিয়ে. যে সব প্রস্তাব সব থেকে বেশী আগ্রহের সৃষ্টি করেছে – কর্মচারীদের সম্পত্তির উপরে আরও বেশী করে নিয়ন্ত্রণ, তার মধ্যে তাঁদের সব থেকে কাছের আত্মীয়দের আয়ের উপরেও নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে. “রেডিও রাশিয়ার” প্রতিনিধি সাংবাদিক ইগর দেনিসভ বেজিং থেকে খবর দিয়ে এই বিষয়ে বিশদ করে জানিয়েছেন.

শুধু পার্টির সম্মেলনের প্রতিনিধিদেরই এই দুর্নীতির সঙ্গে লড়াইয়ের প্রশ্ন উদ্বিগ্ন করে না. ব্যুরোক্র্যাটদের খিদে কমানোর প্রয়োজনের কথা ইন্টারনেটের গ্রাহকরা লিখছেন. ইন্টারনেট ফোরাম ও মাইক্রো ব্লগ লেখার মধ্যে এই প্রসঙ্গ সবচেয়ে বেশী আলোচিত প্রসঙ্গ গুলির মধ্যেই রয়েছে. একই রকমের গুরুত্ব দিয়ে যেখানে আলোচিত হচ্ছে আয়ের মধ্যে অসাম্য, বাড়িঘরের বাজারের পরিস্থিতি, নিরাপত্তার প্রশ্ন ইত্যাদি. অনেকেই বুঝতে পারছেন যে, শেষ অবধি তাদের ব্যক্তিগত ভাল থাকা, দেশের স্থিতিশীল উন্নয়নের মতই, নির্ভর করছে, আগামী প্রজন্মের নেতৃত্বের পক্ষে “স্বচ্ছ প্রশাসনের” স্লোগান বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে কি না, তার উপরেই.

এই লক্ষ্যের কিভাবে কাছাকাছি হওয়া যেতে পারে তা নিয়ে বহু রকমের মত পোষণ করা হয়েছে. কেউ শাস্তি বৃদ্ধির পক্ষে, মনে করে যে, শুধু দমন পীড়ন করেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব. অন্যেরা উল্লেখ করেছেন যে, খুবই কড়া শাস্তিও দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলার প্রবাহকে রোধ করতে পারছে না. অনেকে বলছেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এমন করা দরকার, যাতে দুর্নীতি করা অসম্ভব ও লাভজনক মনে না হয়. এই ক্ষেত্রে অংশতঃ স্বীকৃতী মিলেছে হু জিনটাও এর বক্তৃতায় উল্লিখিত সেই প্রস্তাব যে, “সমস্ত স্তরের নেতৃত্বের, বিশেষত উচ্চ পদস্থ কর্মচারীদের বাধ্য হতে হবে, নিজেদের আত্মীয় স্বজন ও খুব কাছের কর্মচারীদের খুব কঠোর ভাবে শিক্ষা দেওয়া ও নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে তারা কোন রকমের বাড়তি সুবিধা ভোগ না করেন”.

কর্মচারীদের কাজকর্মের উপরে খুবই কড়া নিয়ন্ত্রণের সম্বন্ধে সমর্থন করে সম্মেলনে সাংহাই শহরের প্রতিনিধি ও দলের পরিষদ সদস্য উই ঝেনশেন, যিনি আবার একজন সম্ভাব্য প্রার্থী গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির স্থায়ী সদস্য পদের জন্য. তিনি শুরু করতে বলেছেন নিজের থেকে ও তাঁর নিজের পরিবারের পক্ষ থেকে, এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন:

“আমি কি করে নিয়ন্ত্রণ করি? আমার স্ত্রী সমস্ত রকমের পদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন, সম্পূর্ণ ভাবেই বেরিয়ে এসেছেন. অর্থাত্ তাঁর আর কোন রকমের পদ নেই, আর তিনি কোন রকমের পদে একই সঙ্গে থেকেও যান নি. তাঁ র কিছু ই নেই. তাই সম্ভবতঃ, আমার তাঁকে খুব একটা সিরিয়াস ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার দরকার নেই. আমার ছেলের নিজের ব্যবসা, সে খুবই সক্রিয়ভাবে সর্ব শক্তি দিয়ে কাজ করে থাকে. কিন্তু আমি তাকে এই কথাই বলেছি: তুমি সাংহাই শহরে কোনও ব্যবসা করবে না, সেই সমস্ত সংস্থার সঙ্গে, যেখানে আমি রয়েছি ও যে গুলি আমার যোগ্যতার আওতায় পড়ে, সেই গুলির সঙ্গে, তুমি সাংহাই শহরের সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে সখ্যতা বানাতে পারবে না”.

উই ঝেনশেন যেমন বলেছেন যে, তিনি তৈরী রয়েছেন নিজের সম্পত্তি নিয়ে সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে, যদি কেন্দ্রীয় কমিটি এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়. কিন্তু চিনের মোটেও সমস্ত ছোট বড় কর্মচারীরা এত সহজে নিজেদের সম্পত্তি ও আয়ের তথ্য প্রকাশ করতে চাইবেন না. বহু বিশেষজ্ঞই উল্লেখ করেছেন যে, খুবই স্পর্শকাতর হতে পারে বর্তমানের সরকারি কর্মচারীদের আয়ে সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ থেকে অন্য পথে যাওয়া, যা বর্তমানের আইনে স্বীকৃত ও এই তথ্য জনগনের জানার অধিকার রয়েছে.

রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ভান ইউইকাই যেমন বলেছেন যে, “যদি প্রকাশ্য তথ্য না দেওয়া হয়, তবে কর্মচারীদের উপরে চাপ দেওয়াও সম্ভব নয়”. এই নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আগের মতই জনগনের নাগালের বাইরে থাকলে তা রয়ে যাবে একেবারেই আপাত প্রক্রিয়া হয়ে. আর এটা খুবই প্রসারিত ভাবে প্রশ্নের সম্মুখীণ করবে, যা চিনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার খোলাখুলি থাকা নিয়ে উঠবে.

সন্দেহভাজন পর্যবেক্ষকরা চিনে কার্যকরী “স্বচ্ছ প্রশাসন” ব্যবস্থা তৈরী হওয়া নিয়ে কম করে হলেও আরও বছর দশেক লাগবে বলে মনে করেছেন. যে রকম হয়ে থাকে, চিনে সংশোধন করা হয় ধাপে ধাপে, কিন্তু যে কোন রকমের আটকে পড়াই অথবা যদি তা আবার পিছিয়ে যাওয়া হয়, তবে তা সমাজে নেতিবাচক মানসিকতার সৃষ্টি করবে. দুর্নীতি নিয়ে অসন্তোষ, এখন তার চুড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছেছে, আর অনেক চিনে লোকই নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের সরকারের চূড়ায় বসার উপরে আশা করেছেন যে, সরকারি কাঠামোতে এবারে খুবই জোরদার করে নবীকরণ করা হবে.