মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ১৯শে নভেম্বর মায়ানমার যাচ্ছেন – এই দেশে এটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন রাষ্ট্রপতির প্রথম সফর হতে চলেছে. দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরে বারাক ওবামা তাঁর প্রথম সরকারি সফর যে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে মায়ানমার দেশেই করছেন, সেই বিষয়ে পর্যবেক্ষকরা খুবই গভীর অর্থ দেখতে পেয়েছেন.

আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি স্রেফ মায়ানমারই যাচ্ছেন না – নিজের ১৫ থেকে ২০শে নভেম্বরের সফর সূচীতে তিনি তারই সঙ্গে যাচ্ছেন থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াতেও, যেখানে আসিয়ান সংস্থার শীর্ষ সম্মেলন হতে চলেছে. কিন্তু বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমের মনোযোগ আটকেছে এই মায়ানমার দেশ নিয়েই.

মায়ানমার, প্রাক্তন বর্মা দেশ, গত পঞ্চাশ বছর ধরেই সেখানে ক্ষমতায় ছিল সামরিক বাহিনী ও তারা ছিল আন্তর্জাতিক ভাবে একঘরে অবস্থায়. মায়ানমারের প্রতি নেওয়া হয়েছিল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আর এটা বোধহয় একমাত্র দেশ, যাদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল শুধু চিন. এই বছর গুলিতে চিন নিজের দক্ষিণের সীমান্তের আর ভারত মহাসাগরের উত্তর পূর্ব অংশের স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশটিতে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতিকে মজবুত করতে পেরেছে.

গত বছরের শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করছিল নিজেদের পররাষ্ট্র নীতিতে স্ট্র্যাটেজিক ভাবে মোড় ফেরার. তাদের প্রাথমিক ভাবে মনোযোগ দেওয়া এলাকা বলা হয়েছিল এশিয়া- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল. এই প্রসঙ্গে কোন পর্যবেক্ষকের কাছেই গোপনীয় ছিল না যে, এই এলাকায় মনোযোগ সরিয়ে আনার অর্থ ও মূল লক্ষ্য হল চিনকে স্ট্র্যাটেজিক ভাবে আটকে রাখা, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“মায়ানমার থেকে সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছনোর কেনও পথ নেই, কিন্তু চিনের প্রভাব বিস্তারও এই মহাসাগর বা তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া সমুদ্র গুলি দিয়েই শেষ হচ্ছে না. বিগত কিছু বছর ধরেই চিন সক্রিয়ভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি ভারত মহাসাগরের এলাকায় করেছে (যে স্ট্র্যাটেজি আমেরিকার সাহিত্যের ভাষায় নাম দেওয়া হয়েছে “মুক্তা মালা” বলেই).

আর তাই যেই মায়ানমারের প্রশাসন প্রথমে সামান্য ভাব দেখিয়েছে যে দেশে কোন রকমের একটা গণতন্ত্র রয়েছে, তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাড়া করতে শুরু করেছে এই কারণ পাকড়ে ধরতে, যাতে এই দিকে চিনকে আটকানোর চেষ্টা করা যায়. মায়ানমারের বিরুদ্ধে বেশীর ভাগ নিষেধাজ্ঞাই তুলে নেওয়া হয়েছিল. গত বছরের শেষে মায়ানমার এসেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টন. তাঁর পরে পশ্চিমের অন্যান্য নেতারাও সেই দিকে সারি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও ছিলেন. আর এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন বিরোধী পক্ষের নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়িনী আউন সান সু চ্ঝি. আর এই বারে মায়ানমারে হতে চলেছে মার্কিন রাষ্ট্রপতির ঐতিহাসিক সফর”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই মনে করেন যে, এই সফর সময়ে আগেই হতে চলেছে. মায়ানমারে গণতান্ত্রিক সংশোধন অর্ধেক রকমের চরিত্রবহ. একই সময়ে দেশে নতুন শক্তিতে জ্বলে উঠেছে প্রজাতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস গুলির মধ্যে সংঘর্ষ, তার ফলে বহু লোক হতাহত হয়েছেন আর শুধু মায়ানমারেই নয়, প্রতিবেশী সীমান্তবর্তী দেশ গুলিতেও যেমন বাংলাদেশ ও ভারতে এই কারণে পরিস্থিতি খুবই সিরিয়াস ভাবেই জটিল হয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাজে নিরত থাকা অভিবাসিত মানুষদের সংগঠন “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্মা সহায়তা প্রচার” এমনকি ঘোষণা করেছে যে, এই সফর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের উপরে “আঘাত” করবে. কিন্তু এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে নিজের মায়ানমার সফর সবচেয়ে বেশী জাঁক জমক করে করায় কোন রকমের অসুবিধা সৃষ্টি করছে না, তাই ভলখোনস্কি যোগ করে বলেছেন:

“যখন বড় আমেরিকার কর্পোরেশন গুলির স্বার্থের মতো ব্যাপার ঘোড়ার উপরে বাজী ধরা রয়েছে, যাদের জন্য বাস্তবে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের জনসংখ্যার এক দেশ, যা এর আগে মার্কিন পণ্যের ছোঁয়া পায় নি আর তারই সঙ্গে প্রধান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চিনকে আটকে রাখার কাজও সামনে উপস্থিত, তখন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির প্রধান স্লোগান – “সারা বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য লড়াই” কে ভুলে যাওয়া যেতেই পারে”.

সব মিলিয়ে, আগামী সফরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমগ্র এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার রাজনীতির মতো শুধু একটা বাস্তব বিষয়কেই উল্লেখ করে, যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্লোগান গুলি ব্যবহার করা হয়ে থাকে খুবই বাছাই করে, এটাই রুশ বিশেষজ্ঞের মনে হয়েছে.