মস্কোতে “দেমিদভ” পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে. রাশিয়ার “নোবেল প্রাইজ” – যা বেসরকারি ভাবে এই পুরস্কারকে বলা হয়ে থাকে – তা এই বারে পাচ্ছেন তিন জন অ্যাকাডেমিশিয়ান: ইভগেনি প্রিমাকোভ ইভগেনি আভরোনিন ও ইলিয়া মইসেয়েভ.

এই পুরস্কার উনবিংশ শতকে ধনী শিল্পপতি পাভেল দেমিদভ ঘোষণা করেছিলেন ও তিনিই তাঁর নিজের অর্থ এই কারণে দিতেন. ১৯৯৩ সালে আবার এই পুরস্কার নতুন করে দেওয়া শুরু হয়েছে ও প্রতি বছরেই দেওয়া হয়ে থাকে বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের তিন জন বিখ্যাত ব্যক্তিকে.

রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে সাফল্য ও সামাজিক বিজ্ঞানের উন্নতির ক্ষেত্রে বিশাল অবদানের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে অ্যাকাডেমিশিয়ান ইভগেনি প্রিমাকোভ কে. ইনি একজন বিশ্বের অন্যতম রুশ প্রাচ্য বিশারদ- বিজ্ঞানী, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ. ১৯৯০ এর দশকে তিনি দেশের পররাষ্ট্র বিভাগের প্রধান ছিলেন ও তারপরে মন্ত্রীসভার প্রধানের পদও নিয়েছিলেন. দশ বছর ইভগেনি প্রিমাকোভ রাশিয়ার শিল্প বাণিজ্য চেম্বারের সভাপতি ছিলেন. একজন রাজনীতিবিদের জন্য বিজ্ঞানী হওয়াটা – খুবই বড় ইতিবাচক বিষয়, এই বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে ২০১২ সালের দেমিদভ পুরস্কার প্রাপ্ত ইভগেনি প্রিমাকোভ বলেছেন:

“আমি আমার জীবন উত্সর্গ করেছি নানা রকমের কাজের মধ্যে. কিন্তু আমার জন্য সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৯ সালে, যখন আমাকে সোভিয়েত দেশের একাডেমী অফ সায়েন্সের কার্যকরী সদস্য বলে নির্বাচিত করা হয়েছিল. এই ঘটনা ভোলার নয়. আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি নিজেকে কি মনে করেন – রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নাকি বিজ্ঞানী. এখানে মূল কথা হল যে, যখন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরা নিজেদের কিছু একটা মাত্রা পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিত্ব বলে মনে করতে পারেন. এটা যেমন রাজনীতি, তেমনই বিজ্ঞানকেও সমৃদ্ধ করে”.

দেমিদভ পুরস্কারের অন্য এক প্রাপক অ্যাকাডেমিশিয়ান ইলিয়া মইসেয়েভ, নিজের প্রিয় বিজ্ঞানের বিষয়ে এতই উত্সর্গিত প্রাণ যে, পুরস্কার বিজেতাদের নাম ঘোষণার অনুষ্ঠানে এসেছিলেন মেণ্ডেলেয়েভ তালিকার ছবি সমেত এক টাই পরে. তিনি ৫০০টিরও বেশী বৈজ্ঞানিক গবেষণা কর্ম ও ৮০টি আবিষ্কারের পেটেণ্ট প্রাপ্ত ব্যক্তি. গ্রেট ব্রিটেনের রয়্যাল কেমিক্যাল সোসাইটি এই রুশ বিজ্ঞানীকে “শতবর্ষের সেরা” লেকচারার উপাধি দিয়েছে, তাঁর বিখ্যাত বিশ্ব জোড়া বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার কাজ দেখে. তাঁর বৈজ্ঞানিক বিষয় সংক্রান্ত আগ্রহের ক্ষেত্র – “মূল জৈব সংশ্লেষণ”. এই জটিল বৈজ্ঞানিক পরিভাষার পিছনে যা রয়েছে, তা ব্যবহার যোগ্য হয়ে থাকে বাস্তবে খুবই নিত্য নৈমিত্তিক জিনিষ পত্রের ক্ষেত্রে, তাই অ্যাকাডেমিশিয়ান মইসেয়েভ বলেছেন:

“এই বছরে “সায়েন্স” জার্নালে এক সারি প্রবন্ধ বের হয়েছে, যা জঞ্জাল ও উদ্বৃত্ত বস্তু নিয়ে লেখা. এর মানে হল যে, মানব সমাজ আজ এই কারণেই চিন্তিত যে, অনেক বেশী পরিমানে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যা আমাদের চারপাশের পরিবেশকে নোংরা করছে. তাই কথা হল যে, আমার বিজ্ঞান মানুষকে শেখায় কি করে সস্তা ও কোন রকমের উদ্বৃত্ত ছাড়াই বহু লক্ষ টন জিনিষ উত্পাদন করতে পারা যায়”.

রাশিয়ার “নোবেল প্রাইজ” সবচেয়ে বেশী করে দেওয়া হয়ে থাকে পদার্থবিদ্যার জন্য. ২০১২ সালও এই বিষয়ে কোন রকমের ব্যতিক্রম হয় নি. থার্মোনিউক্লিয়ার ফিজিক্সে দুর্দান্ত ভাল সাফল্যের জন্য এই বছরে দেমিদভ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে অ্যাকাডেমিশিয়ান ইভগেনি আভরোনিন কে. তিনি প্রথম সোভিয়েত থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা তৈরী করার শুরুর সময় থেকে রয়েছেন. তাঁর নেতৃত্বে একেবারেই শান্তি পূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমানবিক বিস্ফোরণের প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা হয়েছিল. একেবারেই কম বাড়তি বিকীরণ সমেত বোমা তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল. অ্যাকাডেমিশিয়ান আভরোনিন রেডিও রাশিয়াকে নিজের আবিষ্কারের মূল কথা নিয়ে বলেছেন:

“এটা খুবই কঠিন অথচ ইন্টারেস্টিং কাজ ছিল, তাও আমরা বিশ্ব রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছিলাম. এটা খুবই শক্তিশালী বোমা ছিল, দেড়শো কিলো টন ক্ষমতা সম্পন্ন. তা স্বত্ত্বেও এই বোমার বিকীরণের পরিমান ছিল অতি সামান্য”.

তাঁর আবিষ্কার করা বিরল প্রযুক্তি আজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে ভূমিকম্প নির্ণয়ের ক্ষেত্রে, গ্যাস থেকে জ্বলা আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে, বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ মাটির নীচে রাখার জন্য, কয়লা খনিতে মিথেন গ্যাসের বিস্ফোরণ বন্ধ করার জন্য. আবিষ্কারক নিজেই বলেছেন যে, এই সব আবিষ্কারের ভবিষ্যত সম্ভাবনাও খুব ভাল, অংশতঃ জ্বালানী উত্পাদন ক্ষেত্রে.

দেমিদভ পুরস্কার অর্পণ করা হবে ঐতিহ্য মেনেই উরালে, ইকাতেরিনবুর্গে, যে জায়গা ছিল দেমিদভ পরিবারের নিজেদের বাসস্থান. প্রত্যেক পুরস্কার প্রাপকই পাবেন একটি করে সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের বাক্স, যার ভিতরে থাকবে পুরস্কারের মেডেল আর অর্থ পুরস্কার. এই বছরে তা হবে দশ লক্ষ রুবল (৩৩ হাজার ডলারের সমান).