পাকিস্তানের সরকার সুইজারল্যান্ডের প্রশাসনের কাছে সরকারি চিঠি পাঠিয়েছে বর্তমানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত মামলা আবার করে শুরু করার বিষয়ে আবেদন করে. এই ভাবেই সরকার দেশের সুপ্রীম কোর্টের দাবীর কাছে নত হয়েছে, যারা গত তিন বছর ধরে রাষ্ট্রপতি জারদারির বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছিল.

মনে করিয়ে দিই যে, এই দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলা গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকেই চলছে. তখন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও তাঁর স্বামী আসিফ আলি জারদারি, যিনি মন্ত্রী সভায় বেশ কয়েকটি মন্ত্রীর পদে বহাল ছিলেন, তাঁদের নামে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, তাঁরা বেআইনি ভাবে কয়েক লক্ষ ডলার ঘুষ নিয়ে তা সুইজারল্যান্ডের ব্যাঙ্কে পাঠিয়েছেন.

২০০৭ সালের অক্টোবর মাসে তত্কালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফ এক নির্দেশ দিয়েছিলেন জাতীয় শান্তি আদেশ নামে, সেই আদেশ অনুযায়ী সমস্ত প্রাক্তন দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে অ্যামনেস্টি ঘোষণা করা হয়েছিল. ২০০৮ সালে যখন আসিফ আলি জারদারি রাষ্ট্রপতি পদ প্রার্থী হয়েছিলেন, তখন সুইজারল্যান্ডের সরকার তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল.

কিন্তু পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট এই অ্যামনেস্টি ২০০৯ সালে বাতিল করে দিয়েছিল, যা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মুশারফ ঘোষণা করেছিলেন, আর তার বদলে দাবী করেছিল বর্তমানের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে তদন্তের. দেশের বিচার ব্যবস্থা ও মন্ত্রীসভা এক কঠিন লড়াইতে অবতীর্ণ হয়েছিল.

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানি নিজের শাসন কালের শেষ পর্যন্ত তাঁর অভিভাবকের স্বার্থ রক্ষা করেছেন, তিনি জেদ ধরেছিলেন যে, বর্তমানের রাষ্ট্রপতির এমনিতেই বিচার সংক্রান্ত তদন্তের ক্ষেত্রে অস্পৃশ্য থাকার অধিকার রয়েছে. এই কারণেই তাঁকে মূল্য দিতে হয়েছে: এই বছরের জুন মাসে সুপ্রীম কোর্ট তাঁকে আদালতের রায় না মানার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে, আর গিলানি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বিচ্যুত হন.

তখন পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন পিপলস্ পার্টির নেতৃত্ব ঘোষণা করেছিল যে, তাদের কাছে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য বহু প্রার্থী রয়েছে, আর প্রত্যেক নতুন প্রধানমন্ত্রী এই প্রশ্নের ক্ষেত্রে গিলানির মতই ব্যবহার চালিয়ে যাবেন, অর্থাত্ নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে ঝুঁকি নেবেন, রাষ্ট্রপতি জারদারির অস্পৃশ্যতা অখণ্ড রাখার জন্য. এই ধরনের কথা বলার মত ভিত্তিও ছিল: পিপলস্ পার্টির পার্লামেন্টে সহজ সংখ্যা গরিষ্ঠতা থাকায় তারা যত খুশী নতুন প্রধানমন্ত্রী বহাল করতেই পারত, তাদের দাবার বোর্ডের বদলী ঘুঁটির মতো ব্যবহার করে প্রধান ঘুঁটি রাষ্ট্রপতির পদ সংরক্ষণের জন্যই. আগে মনে হয়েছিল যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ এই রকমের রাস্তাই বেছে নেবেন, আর তাঁর জন্যও গিলানির ভবিষ্যত অপেক্ষা করে রয়েছে, এই রকমই মনে করেছিলেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি. কিন্তু শেষ অবধি প্রধানমন্ত্রী আশরাফ ও আইন মন্ত্রী ফারুক নায়েক আদালতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন এবং এই চিঠির বয়ানে সম্মতি দিয়েছেন, সেটা সুইজারল্যান্ডের অভিশংসক দপ্তরে পাঠানোয় হয়েছে, এই প্রসঙ্গে ভলখোনস্কি বলেছেন:

“প্রধান প্রশ্ন, যা এই প্রসঙ্গে উদয় হয়, যে পরে কি হতে চলেছে? এর অর্থ কি সরকারের অবস্থান নরম হওয়া ও রাষ্ট্রপতি জারদারির শাসন কালের আসন্ন অবসান, অথবা শেষ ব্যক্তির এখনও কি প্রতিরক্ষার নানা সুযোগ রয়ে যাচ্ছে?

এক দিক থেকে পার্লামেন্টে পিপলস্ পার্টির অবস্থান এখনও আগের মতই শক্তিশালী, আর রাষ্ট্রপতি দেশের নেতা হিসাবে সত্যই আইনের বিচারের উর্দ্ধে. সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত আসিফ আলি জারদারি নিজের ভাগ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা না করতেও পারেন. তার ওপরে, বর্তমানের পরিস্থিতির প্যারাডক্স এই যে, জারদারি দেশের সবচেয়ে দুর্বল জাতীয় নেতা হওয়া স্বত্ত্বেও হয়তো নিজের দায়ভার গ্রহণের শেষ অবধি বহাল তবিয়তে কাটিয়ে যাবেন নিজের তখতেই”.

অন্য দিক থেকে, তাঁর মেয়াদ খুবই শীঘ্র শেষ হতে চলেছে – এই আগামী বছরেই. আর পিপলস্ পার্টি পরের বার নির্বাচনের পরেও যে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে পারবে, তা নিয়ে খুব বড় রকমের সন্দেহ রয়েছে. আর এই প্রসঙ্গ থেকে প্রশাসনের নরম হওয়াটাকে এক ধরনের কৌশলের পথ বলেও মনে হতে পারে. পাকিস্তানের প্রশাসনের উপরে বর্তমানে সবচেয়ে বড় অভিযোগ গুলির একটি দুর্নীতির প্রসঙ্গ. আর রাষ্ট্রপতির প্রসঙ্গে তদন্ত হতে দেওয়া দিয়ে প্রশাসন যেন একটা সঙ্কেত দিতে চাইছে যে, তারা সর্ব ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করা দুষ্টের সঙ্গে লড়াই করতে তৈরী. এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল: দলের উপর থেকে আগামী নির্বাচনের আগে অভিযোগের খাঁড়া সরিয়ে দেওয়া ও অন্তত কিছুটা তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা, এই রকমই মনে করে লিখেছেন বরিস ভলখোনস্কি.