মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সঙ্কট, কর ব্যবস্থা ও বেকারত্ব ছিল মুখ্য বিতর্কের বিষয়. পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত প্রশ্ন গুলি, তার মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের কথাও – মূল বিতর্কের মধ্যেই আলোচিত হয়েছিল. এখন, যখন নির্বাচন শেষ হয়েছে, ওয়াশিংটন ফিরে আসবে সত্যিকারের রাজনীতিতে. বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পরে ওবামা সম্ভবতঃ তাঁর পুরনো পথই ধরবেন. এই ক্ষেত্রে আবার রিপাব্লিকান দলের লোকরা তাঁদের প্রভাব মার্কিন কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে রক্ষা করে যাবে. এই ফ্যাক্টর আরও নানা কারণের সঙ্গে একসাথে রাশিয়ার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণ করবে.

বর্তমানের প্রাক্ নির্বাচনী প্রচার অনেক বেশী করেই অন্যান্য বারের প্রচারের চেয়ে আমেরিকার ভিতরের সমস্যা নিয়েই মন দিয়েছিল. অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা, কর ব্যবস্থা ঠিক করা, বেকারত্ব – এই তিনটে নতুন করে দেখা পুরনো সমস্যাই কিছুতেই না কমা সঙ্কটের সময়ে ওবামা প্রশাসনের মূল মনোযোগের বিষয় হবে. কিন্তু এর মানে এই নয় যে, পররাষ্ট্র নীতি কোনও দ্বিতীয় সারিতে চলে যাচ্ছে. তবে এটাও ঠিক যে, তা প্রধান হয়েছিল শুধু প্রাক্ নির্বাচনী প্রচারের শেষ বিতর্কের অধ্যায়ে. কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সেটাই নীতি. এটা শেষ হলে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাজের তালিকাই আবার ঠিক করা হয়. তার ওপরে আজ ওয়াশিংটন স্রেফ বিশ্বের প্রক্রিয়া গুলির উপরে অংশ না নিয়েই পারে না, এই কথা উল্লেখ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ইনস্টিটিউটের ডেপুটি ডিরেক্টর ভালেরি গারবুজভ বলেছেন:

“নির্বাচনী প্রচার পর্ব একটা নিজের তৈরী আইন অনুযায়ী হয়ে থাকে. বাদ যায় শুধু সেই ধরনের প্রচারের সময়েই, যখন কোনও যুদ্ধ হয়. যেমন এর আগের বারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে, যখন ইরাক ও আফগানিস্তান ছিল. এখন – যখন ওবামা দ্বিতীয় বার নির্বাচিত হয়েছেন, সবই আবার সমতার স্তরে ফিরবে. কিন্তু কোনও শেষ সিদ্ধান্ত করার সময় এখনও আসে নি. রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাথে আমেরিকার কংগ্রেস নির্বাচনও হয়, সম্পূর্ণ ভাবে নতুন প্রতিনিধি সভাও তৈরী হয়. সেটা সম্পূর্ণ নতুন রকমের হবে. একই সঙ্গে সেনেটের একের তৃতীয়াংশ নতুন ভাবে নির্বাচিত হয়. রিপাব্লিকান দলের লোকরা কংগ্রেসের বা প্রতিনিধি সভার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখবে. এটা ওবামার জন্য খুব একটা ভাল পরিস্থিতি নয়, কারণ অনেক কিছু ক্ষেত্রেই তাঁর হাত থাকবে বাঁধা”.

এই ফ্যাক্টরের জন্যই বারাক ওবামার আগে চার বছরে প্রথম নির্বাচনের আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি পালনে অসুবিধা হয়েছিল. প্রাথমিক ভাবে সেই বিষয়ে যে, বিশ্বের নানা রকমের বিরোধে অংশ নেওয়া ও রাশিয়া সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে, এই কথা উল্লেখ করে “রেডিও রাশিয়াকে” ওহিয়ো রাজ্য থেকে কংগ্রেস সদস্য ও ক্লিভল্যান্ড শহরের প্রাক্তন মেয়র ডেনিস কুসিনিচ বলেছেন:

“আমেরিকার সময় হয়েছে সমস্ত রকমের যুদ্ধ শেষ করে সারা বিশ্বে শুধু নিজেদের পাইলট বিহীণ বিমান পাঠানোর. রাশিয়াকে দুর্বল করার চেষ্টা শেষ করা দরকার, আমাদের প্রয়োজন হল সহযোগিতা করার, পারমানবিক অস্ত্র কমানোর, নিকট প্রাচ্যের প্রশ্নে সহযোগিতা করার. আমাদের দেশ গুলির প্রচুর ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না, যতক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমতায় সেই ধরনের গোষ্ঠীর লোকরা রয়েছে, যারা নিজেদের স্বার্থ আর লাভের জন্য প্রভাব বিস্তার করছে. আমি আশা করি না যে, এই প্রশ্নে প্রশাসন নিজেদের রাজনীতি বদলে ফেলবে”.

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করাকে ডেমোক্র্যাটিক দলের লোকরা বলে থাকেন একটা প্রাথমিক কাজ হয়েছে ওবামার প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে. কিন্তু আজ তথাকথিত “রিসেট” করার রাজনীতি হোঁচট খাচ্ছে. অনেকটাই ওয়াশিংটনের দোষে, যারা বাস্তবে রকেট বিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনাকে প্রায় ঠাণ্ডা ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে. মানবাধিকার রক্ষা নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক দলের লোকদের ঐতিহ্য মেনেই কড়া বক্তৃতার সাথে বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রেও মত বিভেদ প্রকট হয়েছে – প্রাথমিক ভাবে সিরিয়ার ক্ষেত্রে. কিন্তু এবারে যখন প্রাক্ নির্বাচনী মোহ কমেছে, আশা করা যেতে পারে যে, মস্কো আর ওয়াশিংটনের সম্পর্কে উন্নতি হবে, এই রকম বিশ্বাস নিয়ে রাজনীতিবিদ ম্যাক্সিম মিনায়েভ বলেছেন:

“আমি মনে করি যে, এখানে সব কিছুই নির্ভর করবে যোগাযোগের চরিত্রের উপরে, যা ওবামা ও পুতিনের মধ্যে তৈরী হবে. এটা ঠিক যে, সেই ঘটনা আবার করে হওয়া, যাকে আগে নাম দেওয়া হয়েছিল “রিসেট” বলে, তা চলবে নতুন করে, তবে খুব সম্ভবতঃ রাষ্ট্রপতি ওবামার নতুন শাসনের সময়ে তা অনেক বাস্তব সম্মত হবে ও তাকে অনেক যুক্তিগ্রাহ্য স্তরে নামিয়ে আনা হবে. আর রাশিয়ার জন্য এটা অনেক বেশী সহজ হবে”.

ভারতের রাজনীতিবিদরাও আশা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফলপ্রসূ সহযোগিতার. ওবামা জিতেছেন. সেই দল যারা আমেরিকায় কাজ করছিল, তারাই কাজ চালিয়ে যাবে, - এই কথা উল্লেখ করে ভারতের সাংবাদিক বিক্রম বাহল বলেছেন:

“আমি যে রকমের ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছি, তাতে তিনটে প্রধান দিক থাকবে. একটা হল কর্ম সংস্থান সম্পর্কে. ওবামা দেশের বাইরে থেকে শ্রম সংস্থানের কথা বলেছেন. ভারত অপেক্ষায় রয়েছে এই ক্ষেত্রে প্রচুর কাজ পাওয়ার ও নিজেদের কোম্পানী গুলির মার্কিন বাজারে আরও বেশী প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার. দ্বিতীয় হল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে দিকে নিজেরা যেতে চাইছে – অর্থাত্ ভারতীয় বাজারে নিজেরা বেশী করে ঢুকতে পারা. এর অর্থ হল, নতুন আমেরিকার কোম্পানীদের ভারতে ব্যবসা বাড়ানো, নতুন সব দিকে বাণিজ্য বৃদ্ধি. এটাই মনে হচ্ছে, যে দিকে ওবামা এগোতে চাইছেন. আর সব শেষে অবশ্যই অর্থনীতি. অর্থনীতি যেমন বিশ্বের ক্ষেত্রে, তেমনই আমেরিকার ক্ষেত্রেও. আর নিরাপত্তার প্রশ্নে যা বলা যেতে পারে, তা হল এই ক্ষেত্রে ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে. আর এটা আমরা দেখতে পাবো, যখন ওবামা ভারত সফরে আসবেন, তখন. সুতরাং সব মিলিয়ে যেমন ওবামা ঘোষণা করেছেন, এখন সময় এসেছে শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ারই নয়, বরং দ্রুত সামনে এগিয়ে যাওয়ার”.