কয়েকদিন আগে হওয়া “ইউরোপ – এশিয়া” আসেম সম্মেলনে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ ঘোষণা করেছিলেন যে, জ্বালানীর বাজারে নতুন বিপদের হুমকি রয়েছে. এই ধরনের হুমকির বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা নাম করেছেন “সস্তা” কার্বন যৌগের যুগ শেষ হওয়াকে.

নৈরাশ্যবাদীরা জোর দিয়ে বলছেন যে, পরবর্তী কালে জ্বালানীর দাম বাড়া অবধারিত, আর খুব সম্ভবতঃ বহু দিন পরে না হয়ে অনেক আগেই বিশ্বে জ্বালানী সংক্রান্ত শেষের সে দিন আসতে আর বাকী নেই, যার ফলশ্রুতি হবে নাটকীয়. বাস্তবে “সস্তা” জ্বালানীর যুগ শেষ হওয়ার অর্থ হল জ্বালানী নিয়ে নতুন যুদ্ধের যুগ শুরু, এই রকম মনে করে জাতীয় জ্বালানী ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর সের্গেই প্রাভোসুদভ বলেছেন:

“জ্বালানী নিয়ে যুদ্ধ কখনোই থামে নি. রসদের জন্য লড়াই কোথাও হারিয়ে যাবে না. বর্তমানে আমেরিকার লোকরা নিজেদের জ্বালানীর প্রয়োজন নিজেরাই মেটাবে ঠিক করেছে: তাতে শেল খনিজ তেল, কানাডায় পিচ মেশানো বালি, শেল গ্যাস উত্তোলন এই সব ব্যাপার. এই সবই খুব দামী সুবিধা. এমন করতে হবে, যাতে জ্বালানীর দাম বহু গুণ বেড়ে যায়. সুতরাং কিছু একটা করতেই হবে, যাতে নিকট প্রাচ্যে স্থিতিশীলতা না আসতে পারে. তাহলেই উত্তর আমেরিকার এলাকায় খনিজ তেল ও গ্যাস তোলা খুবই লাভজনক হবে. আমরা তাই দেখতে পাচ্ছি যে, নিকটপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা রয়েই যাচ্ছে. সম্ভবতঃ, তা হবে আরও বেশী করে. সেখানে অনেক কিছুই ভেবে বার করতে পারা যায়”.

স্বাভাবিক ঐতিহ্য অনুযায়ী খনিজ তেল ও গ্যাসের উত্সের একটা বিকল্প খোঁজার চেষ্টা (আর এর অর্থ হল স্বাভাবিক সরবরাহ যারা করে) বিগত সময়ে খুবই স্বাভাবিক চিন্তার বিষয় হয়েছে. সেই রকমই হয়েছে “শেল গ্যাস সংক্রান্ত বিপ্লবের” কথাও. মাটির নীচে গ্যাস খুবই ছোটখাট সব খানা খন্দে জমে রয়েছে, পলি থেকে তৈরী পাথরের গভীরে. এই ধরনের জমা সমস্ত মহাদেশেই দেখতে পাওয়া গিয়েছে. সুতরাং, বাস্তবে যে কোনও জ্বালানী বিষয়ে পর নির্ভর দেশই নিজেদের প্রয়োজনীয় জ্বালানী পেতে পারে. আগে এই গ্যাস তোলার জন্য কোনও ব্যবহার যোগ্য প্রযুক্তি ছিল না. এখন তা রয়েছে, যদিও আপাততঃ তা আদর্শের থেকে অনেক দূরে.

প্রথম দেশ, যারা নিজেদের এই জমা সম্পদ তোলার চেষ্টা করেছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র. দুই বছর আগে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, সেখানে শেল গ্যাস উত্পাদনের পরিমান পাঁচ হাজার কোটি কিউবিক মিটার ছাড়িয়েছে. এটা তেমন কিছু নয়, তবে আমেরিকার লোকরা ভেবেছে যে, এই দিক খুবই সম্ভাবনাময়. সব মিলিয়ে এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমান দুই হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে. এটা সত্যি যে, তার পরে আমেরিকার প্রশাসনকে স্বীকার করতে হয়েছে যে, স্থানীয় গ্যাস কোম্পানী গুলি নিজেদের উত্পাদনের পরিমান বাড়িয়ে বলেছে, সমাজকে আবিষ্কৃত জমা গ্যাসের পরিমান সম্বন্ধে ভুল তথ্য দিয়ে ঠকিয়েছে আর উত্পাদনের জন্য খরচও কমিয়ে বলেছে. সব মিলিয়ে, নতুন প্রযুক্তির বিজয়ের ইতিহাস দেখা গেল খুবই বেশী রাঙানো, এই কথা উল্লেখ করে জ্বালানী বিকাশ তহবিলের ডিরেক্টর সের্গেই পিকিন বলেছেন:

“বেশীর ভাগ বিনিয়োগ ছিল ঋণ করে নেওয়া, যে গুলি লাভের আশা দেখিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যা গ্যাস বেশী দামে বিক্রী করতে পারলে পাওয়া যেত. এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করা ও উত্পাদন বাড়ানোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছে. দাম কমে গিয়েছে, আর অনেক কোম্পানী, যারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশী ঋণ করেছিল, তারা এখন আর্থিক ভাবে দেউলিয়া হতে চলেছে”.

আপাততঃ শেল গ্যাস জ্বালানীর বাজারে দাম কমিয়ে দিতে পারে নি. নতুন প্রযুক্তি আদর্শের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে, তাই এটাকে জ্বালানী বাজারে লড়াই করার জন্য ব্যবহার করা যাচ্ছে না. তাও বেশী সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় খনিজ তেল ও গ্যাস উত্পাদনের বিষয়. এখানেই বহু দেশের ভূ- রাজনৈতিক স্বার্থ খুবই কঠিন গ্রন্থিতে বাঁধা. এটা কোন “উত্তপ্ত” জ্বালানী নিয়ে যুদ্ধ হবে, নাকি পক্ষরা “ঠাণ্ডা” যুদ্ধ দিয়েই ক্ষান্তি দেবে – তার সবটাই নির্ভর করছে সুবুদ্ধি নিয়ে যা ব্যবস্থা নেওয়া হবে তার ওপরে. যে কোন ক্ষেত্রেই জ্বালানীর বাজারের সেই ডাল কাটার দরকার নেই, যার উপরে সব সময়ে আরামের না হলেও, সমগ্র মানব সমাজই আজ ভরসা করে বসে রয়েছে.