সমস্ত রকমের সম্ভাব্য সামরিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ, রক্তপাত ও নাগরিকদের হত্যা, যুদ্ধের নিয়মও ভঙ্গ করা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘণ – এই সবই গত দেড় বছর ধরে লিবিয়াতে চলছে.

গণতন্ত্রের প্রতীক, যেটির জন্য মুহম্মর গাদ্দাফিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে তা হয়েছে মুখে দাড়ি ও হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সমেত লোক, যে যথেচ্ছ চারদিকে গুলি বর্ষণ করছে.

রাশিয়ার কূটনৈতিক মিশনের নেতৃত্বে ২০১১ সাল অবধি লিবিয়াতে থাকা কূটনীতিবিদ ভ্লাদিমির চামভ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেছেন:

“দুঃখের বিষয় হল যে, পরিস্থিতি এই দেশে সবচেয়ে খারাপ পরম্পরাতেই হয়েছে. বিগত ঘটনা গুলি, তার মধ্যে বানি ওয়ালিদ শহরে যা হয়েছে, তাও কোন রকমের আশা জাগায় না. আজ পরিস্থিতিকে প্রায়ই সরল করে দেখানো হচ্ছে: বাল হয়ে থাকে প্রাক্তন জঙ্গীদের, যারা গত বছরে ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের সঙ্গে গাদ্দাফি অনুগতদের যুদ্ধ হচ্ছে. কিন্তু আমি মনে করি না যে, এটা সেই রকমের ব্যাপার. সবই অনেক জটিল. এখন যা হচ্ছে, তা হল বিভিন্ন প্রজাতির লোকদের মধ্যে লড়াই. সেই দেশে, যেখানে আগে চাওয়া হয়েছিল এক ঐক্যবদ্ধ জাতি তৈরীর, তারাই দেশের নেতা হারিয়ে যাওয়া পরে ও সামরিক শক্তি প্রয়োগে খুবই দ্রুত শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পরে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে. আর এই প্রক্রিয়া চলছেই. এমনকি নির্বাচন ও নতুন পার্লামেন্ট দেখিয়ে দিয়েছে যে, সেখানে যত না রাজনৈতিক আন্দোলন গুলির মধ্যে লড়াই, তার চেয়ে অনেক বেশী হচ্ছে প্রজাতি গুলির মধ্যে. আর এটাও ঠিক যে, সেই সব প্রজাতি, যাদের লোকসংখ্যা বেশী, তারাই এই নির্বাচনে জয়ী হয়েছে. সুতরাং আমি মনে করি না যে, পরবর্তী কালে সব হবে শান্ত ও সহজ ভাবে. বর্তমানে সেখানে মানুষের জীবন খুবই কঠিন, তার ওপরে তাঁরা সহজেই আগের সঙ্গে এখন যা হচ্ছে, তা তুলনা করতে পারছেন. সব কিছুই এখনও তাঁদের স্মৃতিতে সজীব. কি আর বলা যেতে পারে: টিউনিশিয়াতে উদ্বাস্তু হয়ে চলে গিয়েছেন প্রায় ছয় লক্ষ থেকে দশ লক্ষ লিবিয়ার লোক, পাঁচ লক্ষ লিবিয়ার লোক রয়েছেন ইজিপ্টে, তা যেমন কায়রোতে, তেমনই আলেকজান্দ্রিয়াতে. পনেরো লক্ষ অভিবাসিত লোক, যদি এই সংখ্যা গুলি সঠিক হয়, তবে এক ষাট লক্ষ দেশের পক্ষে এটা খুবই বিশাল ক্ষতি!”

এই ক্ষতি আরও অনেক বেশী নাটকীয় – তা বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকেই শক্তিশালী করছে. কিছুদিন আগের মন্ত্রীসভার নির্বাচন আরও একবার দেখিয়েছে যে, দেশে ফলপ্রসূ কেন্দ্রীয় সরকারের অনুপস্থিতি রয়েছে. কিন্তু ভ্লাদিমির চামভের মতে, এই লিবিয়ার মতো দেশের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া আপাততঃ সময়ের আগেই হয়েছে বলা হয়ে যাবে, তাই তিনি যোগ করেছেন:

“আমি মনে করি না যে, সব কিছুই শেষ হয়ে গিয়েছে. সম্ভবতঃ খুবই কঠিন সময় পার হয়ে যেতে হবে, যখন সহ্য করতে হবে, চুক্তি করতে হবে বাধ্য হয়ে. যদি তারা তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়, তবে আমার মনে হয় না যে, এতেই শেষ হবে, এক অংশ আরও দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে, তার জন্যও পরিস্থিতি তৈরী হয়ে আছে. কিন্তু মনে তো হয় না. ইরাকের উদাহরণ: সেই দেশেও বিগত সাত – আট বছর ধরে খুবই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তা স্বত্ত্বেও, রাষ্ট্র আপাততঃ রয়েছে, তা ভেঙে পড়ে নি. সম্ভবতঃ, ইরাক – ভবিষ্যতের লিবিয়ার জন্য উদাহরণ হবে: এক ধরনের সংযুক্ত রাষ্ট্র বা সঙ্ঘ তৈরী হতে পারে, কোন একটা ভিত্তিতে. কিন্তু এটা সেই লিবিয়ার জনগনই ঠিক করবেন. আর সবচেয়ে মুখ্য হল, যাতে প্রজাতিরা একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ না করেন, বরং তার চেয়ে সামাজিক – অর্থনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে কাজ করেন”.

এই ধরনের প্রশ্নই লিবিয়ার প্রতিবেশী টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টের আলোচ্য তালিকাতেও রয়েছে, তাই চামভ বলেছেন:

“সেই সব দেশে, যেখানে বিপ্লব নিয়ে বলা হয়েছিল যে, শেষ হয়েছে, আমি এখনই সেই কথাকে সমর্থন করতে রাজী নই. ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, বিপ্লব একেবারেই নির্দিষ্ট আইন অনুযায়ী এগিয়ে থাকে. এই আইন সমষ্টি জানা দরকার, তাই আমি আমার আরব বন্ধুদের ও কমরেডদের বলি: খুব মন দিয়ে ফরাসী বিপ্লবের ইতিহাস পড়ুন, তার থেকেও বেশী মন দিয়ে দেখুন রাশিয়ার দুটি বিপ্লবেরই ইতিহাস”.

চামভ মনে করেন, সন্দেহ নেই যে, তারাই আজ ঠিক কথা বলছেন, যারা বলছেন যে, লিবিয়ার ইতিহাসের নতুন পাতা ওল্টানো হয়েছে. কিন্তু কি দিয়ে এই পাতার শেষ হবে – সেটা কেউই শেষ অবধি জানেন না. আপাততঃ প্রথম লাইন গুলি থেকেই খুব নিরানন্দ লাগছে.