ন্যাটো জোটের সামরিক অপারেশনের পরিনাম এই জন্যই উল্লেখ যোগ্য যে, লিবিয়ার ১৫ হাজার কোটি ডলার, যা বিদেশী ব্যাঙ্ক গুলিতে আটক রাখা হয়েছিল, তা হারিয়ে গিয়েছে. ন্যাটো জোটের বোমা বর্ষণের ফলে এই দেশের যা ক্ষতি হয়েছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হিটলারের বিমান বাহিনী বোমা ফেলায় যত ক্ষতি হয়েছিল তার থেকে সাত গুণ বেশী হয়েছে. এই ধরনের তথ্য রয়েছে রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর নিকটপ্রাচ্য অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মী ও ইতিহাসে ডক্টরেট করা প্রফেসর আনাতোলি ইগোরিন লিখিত “মুহম্মর গাদ্দাফিকে ধ্বংস করা. লিবিয়ার ডায়েরি ২০১১- ২০১২ সাল” নামের বইতে. এই সপ্তাহের সোমবারে এই বইটি মস্কো শহরে প্রকাশ করা হয়েছে. এটা – প্রথম রাশিয়াতে ২০১১ সালের লিবিয়ার ট্র্যাজেডি নিয়ে বহুমুখী অনুসন্ধানের ফসল.

বোঝাই যায় যে, ধ্বংস – এটা যে কোন রকমের যুদ্ধেরই পরিনাম. যদিও, ন্যাটো জোট শুধু দায়িত্ব পেয়েছিল লিবিয়ার আকাশ উড়ান মুক্ত রাখার, তাই এই ধনের বিশাল আকারের ধ্বংস তা হওয়ার কথা ছিল না. কিন্তু এমনকি এই দিকে লক্ষ্য না করলেও বিদেশে থাকা ১৫ হাজার কোটি ডলার যথেষ্ট হত এর অনেক খানি ক্ষতির ভর্তুকি দিতেই. কিন্তু এই অর্থ একেবারেই কোন হদিস না রেখে হারিয়ে গিয়েছে. তাই খুবই সঙ্গত প্রশ্নের উদয় হয়: কি করে এটা হতে পারল?

এই বিষয়ে লিবিয়ার ডায়েরির লেখক আনাতোলি ইগোরিন স্বয়ং বলেছেন:

“যখন মুহম্মর গাদ্দাফির বিরুদ্ধে প্রচার শুরু হয়েছিল আর তা বোঝাই যাচ্ছিল যে, তাঁকে ক্ষমতায় ন্যাটো জোটের লোকরা রাখতে চায় না, এই সব অর্থই গলে যেতে শুরু করেছিল. কেউই জানেনা, তা কোথায় ও কি করে. সংবাদ মাধ্যমে শুধু খণ্ডিত খবর পাওয়া যাচ্ছিল যে, এই অর্থ নিয়ে নেওয়া হচ্ছিল ও তা পশ্চিমের ব্যাঙ্কের লোকরা অফ শোর এলাকা দিয়ে ঘুরিয়ে নিচ্ছিল. এখন সবাই খুঁজছে, লিবিয়ার অর্থ কোথায় গেল, কিন্তু সেগুলি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আমার মনে হয় খুবই সামান্য. প্রসঙ্গতঃ, শুধু পশ্চিমকে এই বিষয়ে দোষ দেওয়ার অর্থ হয় না. লিবিয়ার লোকরাও, বিশেষত যারা গাদ্দাফির সঙ্গে লড়াই করেছে ও পরে ক্ষমতায় এসেছে, তারাও গাড়ী ভর্তি করে ডলার ও সোনার ইঁট নিয়ে মরুভূমি হয়ে বিদেশে চলে গিয়েছিল. এই ধরনের বাস্তব ঘটনাও জানা আছে”.

প্রায় একই অবস্থানে আছেন লিবিয়াতে গণতন্ত্র সৃষ্টির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সঙ্ঘের প্রধান আবু আন- নিরান, তিনি বলেছেন:

“এই কথা সত্যি যে, লিবিয়াতে প্রায় সব কিছুই যা চুরি করা সম্ভব করা হয়ে গিয়েছে. আর এই সবই হয়েছে সারা বিশ্বের চোখের সামনেই, আর কেউ একটিও কথাও বিরোধী পক্ষে বলে নি. এটা কোন ফাঁকা অভিযোগ নয়. এর আগে এই কথাই সমর্থন করেছেন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রধান. আর এখানে কথা শুধু ১৫ হাজার কোটি ডলারের হচ্ছে না, যা বিদেশী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ছিল. এই সব অর্থ দেশের বাইরে এখনও বেরিয়েই যাচ্ছে. তার মধ্যে বেআইনি ভাবেও. এই সবই হচ্ছে প্রজাতিদের মধ্যে লড়াই ও বাস্তবে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলির সীমাহীণ ক্ষমতা থাকার ফলেই, যা তাদের পক্ষে অপছন্দের লোকদের সঙ্গে তারা যা খুশী তাই করার সম্ভাবনা করে দিয়েছে. ন্যাটো জোটের আক্রমণ, এটা এখন যেমন দেখা যাচ্ছে, লিবিয়াতে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য করা হয় নি, যা নিয়ে এক সময়ে জোটের নেতৃত্ব বলেছিল. বরং অন্তত এখন সকলেই দেখতে পাচ্ছে যে, সত্যিকারের লক্ষ্য ছিল এই দেশকে লুঠ করে নেওয়া”.

ঠিক এই কারণেই এখন খুব বেশী করেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, রাষ্ট্র হিসাবে লিবিয়ার ভাগ্য পশ্চিমের কাছে আর আগ্রহের ব্যাপার নয়. আর লিবিয়ার নতুন নেতারা আজ এক বছর হল পদ ভাগাভাগি করতেই ব্যস্ত. আর তারই মধ্যে তারা, মনে হচ্ছে যে, নিজেদের আগের সব রক্ষা কর্তাদের জিজ্ঞাসা করতে কষ্ট করেন নি যে, কোথায় গেল সেই ১৫ হাজার কোটি ডলার, যা এখন এক লহমায় গরীব হয়ে যাওয়া দেশের জন্য মোটেও বেশী হত না.