দুর্গা পূজা উপলক্ষে মস্কো শহরে এক নৃত্য নাট্য সন্ধ্যার আয়োজন হয়েছিল – সেই পূজা যা বাঙালীরা সারা বিশ্ব জুড়েই নিজেরা আয়োজন করে থাকেন. রাশিয়াতে এই ধরনের কাজকর্মের একটি উদ্দেশ্য - রুশীদের ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিষয়ে আগ্রহী করে তোলা. এই বিষয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাননীয় ডঃ সইফুল হক এই অনুষ্ঠান দেখতে এসে বলেছেন:

“বিগত বছর গুলিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়া দুই দেশকে কাছে নিয়ে আসার জন্য অনেক কিছুই করা হচ্ছে. রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একই সঙ্গে বাড়ছে বেশ কয়েকটি দিকেই: পারমানবিক বিদ্যুত বিষয়ে, ব্যবসায়, অর্থনীতিতে ও শিক্ষা ক্ষেত্রে আর তার সাথে অবশ্যই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও. ২০১৩ সালের ১৫ই জানুয়ারী ঠিক হয়ে রয়েছে সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার. এর ফলে বেশী করে প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব হবে, তা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মানুষদের কাছে নিয়ে আসার জন্য ব্যবস্থা করে দেবে, তাদের মধ্যে একে অপরের সংস্কৃতি আরও বেশী করে জানার সুযোগ হবে”.

এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভিত্তি ছিল সেটাই যা এর নামে বলা হয়েছিল – “রবীন্দ্রনাথ... দুটি প্রেম”, এর মধ্যে ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি নৃত্যনাট্য অভিনয় – “চিত্রাঙ্গদা” ও “চণ্ডালিকা”. বেশী করে এই দুটি দুর্গা পূজার তিনটি মূল বিষয়ের প্রতিই দৃষ্টি আকর্ষণ করে, - সৃষ্টি,স্থিতি ও লয়. কিন্তু আরও একটি বিশেষত্বও রয়েছে, - এই কথা উল্লেখ করে এই সন্ধ্যার এক আয়োজিকা সুদেষ্ণা ঔরঙ্গাবাদকর বলেছেন:

“এই কাহিনী গুলি বেছে নেওয়া হয়েছে এই কারণেই যে, এই গুলি এখনও ভারতের জন্য বাস্তব বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে. এটা জাত পাতের বিভাগ, যা থাকার কারণেই অসাম্য, হিংসা ও পাপের সৃষ্টি হয়ে থাকে. মহান কবি ও দার্শনিক, মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই উনবিংশ শতকের শেষে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই সমস্ত রকমের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন, তার মধ্যে জাত পাতের বিভেদও ছিল, আর এই প্রতিবাদ প্রকাশ করেছিলেন নিজের সৃষ্টিতে”.

এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও মস্কো স্থিত মানুষরা. নিজেদের কি রকম লেগেছে, তা নিয়ে এদের মধ্যে একজন ডঃ চেরিয়ান ইপ্পেন রয় আমাদের সাংবাদিককে বলেছেন:

“আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল এই উত্সব. আর আমরা খুশী যে, এটা এখন মস্কোতেও পালন করা সম্ভব হচ্ছে. এই উত্সব হয়েছিল পাঁচ দিন ধরে আর আজকের অনুষ্ঠান দিয়ে তা শেষ করা হয়েছে. এই ধরনের অনুষ্ঠান এবারে প্রথম করা হল. এক ইন্টারেস্টিং নাটক, যা ভারতের জাত পাকের বিভেদ নিয়ে ভেতরের ব্যাপার দেখিয়েছে ও তার সঙ্গে মানুষের কষ্টের কথাও বলেছে. সব মিলিয়ে আমার ভালই লেগেছে. যাঁরা নেচেছেন, তাঁরা নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন. এই ধরনের অনুষ্ঠানে যেন এই রকমের খালি প্রেক্ষাগৃহ ভবিষ্যতে না হয়, সেই আশাই করব. আর আমার মতে – এই সব ক্ষেত্রে স্টেজের পিছনের পর্দায় রুশী অনুবাদ দেখানো দরকার, যাতে এই হলে যারা রুশী আসেন, তাঁরাও যেন সবটা বুঝতে পারেন. আমি আশা করব যে, পরের বারে আয়োজকরা এই বিষয়ে যত্নবান হবেন”.

সত্যই রুশী দর্শকরা বাঙালী নৃত্যনাট্য কি ভাবে নিয়েছেন, যাদের একাংশ এই প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত ছিলেন, তাদের এই ধরনের প্রশ্ন করা হলে, এক দর্শক ইভগেনি মরোজভ বলেছেন:

“আমার দুটি নৃত্যনাট্যই ভাল লেগেছে. অঙ্গ ভঙ্গী ও দারুণ ভাল নাচের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য শিল্পীরা দর্শকদের কাছে বোধহয় পৌঁছতে পেরেছেন. আমার বুঝতে কোনও অসুবিধা হয় নি: প্রেম – এটা প্রেমের মানুষের জন্যই লড়াই, সুখের জন্য লড়াই. ভালবাসা মানুষকে যেন স্বাধীন ও স্বতন্ত্রতার অনুভব দিতে পারে, কোন অধীনতার নয়. এই খানেই এর অর্থ ও উদ্দেশ্য”.

0ঐতিহ্য মেনেই অনুষ্ঠানের পরে আগে হওয়া প্রতিযোগিতার জন্য পুরস্কার বিতরণ করা হয়েছে. দর্শকরা তাড়াহুড়ো করে চলে যান নি: তাঁরা একে অপরের সঙ্গে পরিচয় করেছেন, নিজেদের মতামত বলেছেন ও এক অপরকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন. উত্সব নিশ্চয়ই ভালই হয়েছে!