মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ঘোষণা করেছেন যে, দেশের সরকার স্যাণ্ডি ঘূর্ণিঝড়ের পরিণতি মোকাবিলার জন্য সব কিছুই আগে থেকে করেছিলেন, কিন্তু এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলাফল বর্জন করতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে.

স্যাণ্ডি ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের ফলে হওয়া ক্ষতি পূরণ করতে বীমা কোম্পানী গুলিকে ৫০০ থেকে ১ হাজার কোটি ডলার দিতে হতে পারে. তার মধ্যে সমস্যা আরও সেই কারণে হয়েছে যে, স্যাণ্ডি আমেরিকার উপরে আছড়ে পড়েছে বড়দিনের আগে বিক্রী শুরু হওয়ার সময়েই. এবারে সবাই নানা রকমের উপহার চিন্তা ভাবনা না করেই কেনার বদলে বহু শত সহস্র ডলার ব্যয় করবেন সেই সব প্রয়োজনীয় জিনিষ কেনার জন্য, যেমন বিদ্যুত উত্পাদনের জন্য জেনারেটর, নানা ধরনের আত্ম রক্ষা করার ব্যবস্থা, অর্থাত্ নতুন ধরনের দুর্যোগের জন্য তৈরী হতে.

বর্তমানে সব লোকের একটা বোধ তৈরী হচ্ছে যে, খুব সিরিয়াস ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিগত কিছু কাল ধরে খুবই নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে. এই ধরনের ভীত মানসিকতা এমনকি বীমা কোম্পানীর লোকরাও ভাগ করেছেন. কিছু বাস্তব তথ্যও রয়েছে যে, বিগত ৩০ -৪০ বছরে বীমার জন্য অর্থ ফেরত দেওয়া অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে. অর্থাত্ বিপর্যয় ঘটানোর মতো দুর্যোগ, যে গুলি খুবই বড় রকমের ক্ষতি সাধন করছে, সেই গুলি সংখ্যায় বেড়েছে. পরিবেশবিদরাও শান্ত করছেন না, তাঁরা জোর দিয়ে বলছেন যে, আবহাওয়ার থেকে কিছু ভাল আর আসা করা যায় না. যদি বিশ্বের মহা সমুদ্রে জলের উচ্চতা বাড়ে (আর তা গত ১০০ বছর ধরেই বছরে ৩ মিলিমিটার করে বেড়েছে), তবে এমনকি ছোট ঝড়েও, যা ৪০ বছর আগে লক্ষ্যই করা যেত না, তা এখন অনেক বেশী ধ্বংস নিয়ে আসছে.

গত বছরের মার্চ মাসে জাপানে একসাথে তিনটি বিপর্যয় হয়েছিল, ভূমিকম্প, তার সাথে ত্সুনামি ও তার উপরে “ফুকুসিমা” পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে দুর্ঘটনা. বিভিন্ন রকমের মূল্যায়ণ অনুযায়ী সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছিল ৩০ হাজার কোটি ডলারেরও উপরে (আর এটা জাপানের গড় বার্ষিক আয়ের ৬ শতাংশের বেশী). এই বিপর্যয়, সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, সারা বিশ্বে গত পঞ্চাশ বছরে ঘটা সমস্ত বিপর্যয়ের চেয়ে দামী হয়েছিল. কিন্তু জাপানের অর্থনীতি বিশ্ব সমাজের সহায়তা পেয়ে খুবই সফল ভাবে পতন রোধ করতে পেরেছে. তাছাড়া, বিশ্বের অর্থনীতিও টলে ওঠে নি. এর ফলে বিশেষজ্ঞদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুবিধা হয়েছে যে, মানব সমাজ যতটা মনে হয়েছিল, তার থেকে বেশী শক্তিশালী হতে পেরেছে.

অন্য একটা উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে. ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকম্প, যা ২০০৪ সালের ২৬শে জানুয়ারী হয়েছিল ভারত মহাসাগরে, তাকে বলা হয়েছিল আধুনিক ইতিহাসে এক সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে. কিন্তু যেমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তার বরং উল্টোই দেখা গিয়েছে যে, এই ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশ গুলিই যাদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তহবিল থেকে সাহায্য করতে হয়েছিল, তারাই পরবর্তী ২০০৫ সালে দেখিয়েছিল অর্থনৈতিক চমক. ফলে তথাকথিত “মহান ত্সুনামি”, যা ২০০৪ সালে হয়েছিল, তার থেকে ক্ষতি বেশী হয়েছে ২০০২ সালের চিকেন ফ্লু মহামারী থেকে ও জাপানের কোবে শহরে ১৯৯৫ সালের ভূমিকম্প থেকে. সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা মনে করেছেন যে, গত বছর গুলিতে বিশ্বের অর্থনীতি খুবই বিরল স্থিতিশীলতা দেখাতে পেরেছে বিভিন্ন ধরনের সঙ্কটের সময়ে. কিন্তু এটা আমাদের যেন শান্ত না করে দেয়, কারণ কোন একটা সীমিত সময়ের ব্যবধানের মধ্যে এই ধরনের বিপর্যয়ের সংখ্যা খালি বেড়েই যাচ্ছে. এই বিষয়ে বিশ্ব বন্য প্রাণী সংরক্ষণ তহবিলের “পরিবেশ ও জ্বালানী শক্তি” প্রকল্পের প্রধান আলেক্সেই ককোরিন বলেছেন:

“সারা বিশ্বে বেশী করেই জলবায়ু সংক্রান্ত দুর্ঘটনার পরিমান বাড়ছে সব মিলিয়ে. এটা বাস্তব. রাশিয়াতে গত ১৫ বছরে এর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে. এর কিছু অংশ সেই ধরনের বিশ্ব জোড়া তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে, মানব সমাজের পরিবেশের উপরে প্রভাব বিস্তারের ফলেই হয়েছে... বেশ কিছু বিজ্ঞানী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কমে যাওয়া দেখিয়েছেন তিন ভাগ, বা তার ভাগ বলে. এর পরে কি করা হবে? এখানে বাদ দেওয়া যা না যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘূর্ণিঝড়ের পরে কোন না কোন নিয়মের সংশোধন করা হবে. ধরা যাক গৃহ নির্মাণের ক্ষেত্রে. এটা যেমন দেশ তেমনই মানুষের জন্য দামী হবে, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরী হবে আরও বেশী শক্ত পোক্ত বাড়ী. কিন্তু পরবর্তী কালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে ভেঙে পড়বে না”.

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করার অর্থ হয় না, বরং তার চেয়ে বেশী যুক্তিসঙ্গত নিজেদের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, তার মধ্যে অর্থনৈতিক ভাবেও. অন্তত পক্ষে যদি আমরা প্রকৃতির উপরে মানব সমাজের শক্তি প্রয়োগ কমিয়ে দিই, তবে প্রকৃতিও আমাদের প্রতি আরও বেশী করে সদয় হবে.