চিন ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিগত কিছু কাল ধরেই এই দুই দেশের উন্নয়নের পথের তুলনামূলক সুবিধা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে. এই সমস্যা নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক একাডেমীর উপাচার্য আলেকজান্ডার লুকিন.

ভারত ও চিন: কার বিকাশ বেশী ফলপ্রসূ? এই বিষয়ে বহুদিন ধরেই দুই দেশের সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদেরা তর্ক জুড়েছেন. এই ধরনের চলতেই থাকা বিরোধ, যা চিনের নিইবো শহরে খনিজ তেল পরিশোধনের কারখানার বিস্তার নিয়ে করা হচ্ছে, তা চিনের পারিপার্শ্বিক বায়ুমণ্ডলের সমস্যার প্রতি আগ্রহের অকস্মাত্ সক্রিয়তা বৃদ্ধি ছাড়া এই বিতর্ককেই আবার উস্কে দিয়েছে. আর যদি ভারতে বলা হয়ে থাকে যে, চিনের স্বৈর তান্ত্রিক প্রশাসন সামাজিক মতামতের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে, তবে চিনে মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে ভারতের গণতন্ত্রের আভ্যন্তরীণ খানা খন্দ নিয়ে. বাস্তবে, এখানে কথা হচ্ছে দুটি উন্নয়নের মডেলের মধ্যে প্রতিযোগিতা নিয়ে – ভারতীয় ও চৈনিক.

চিনে সরকারি রাজনীতিবিদদের নিজেদের দেশের খুবই বাস্তব অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য আত্ম গরিমায় ঢলঢল অবস্থা প্রায় কিনারা পার হয়ে গড়িয়ে পড়ল বলে. বিগত কিছু সময় ধরে আরও বেশী করে বই ও প্রবন্ধ প্রকাশ করা হচ্ছে সেই সব বিষয়ে, যেখানে চিনের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য সমস্ত দেশের উন্নতির পথের থেকে বেশী ফলপ্রসূ বলেই দেখানো হচ্ছে, আর বলা হচ্ছে যে, তার উপরে ভিত্তি করে তৈরী রাষ্ট্র পশ্চিমের বিকাশের পথের এক সত্য বিকল্প পথ বলেই. ২০১১ সালে এই ধরনের বেস্ট সেলার হওয়া আরও একটি বইয়ের মধ্যে ছিল ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ও জেনেভা কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্কুলের প্রফেসর চ্ঝান ভেইভেয়া লিখিত “চিনে চমক: সভ্যতা-রাষ্ট্রের মহিমা” বইটি.

তাতে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার – এই সব হল পশ্চিমের সভ্যতার অস্ত্র, যা দিয়ে তারা বিশ্বে নিজেদের প্রভূত্ব বজায় রাখতে চাইছে. চিন কিন্তু যেন বিশ্বকে নতুন বিকাশের মডেল দেখাতে পেরেছে, যা এই প্রভূত্বকে একটা সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছে. চ্ঝান মনে করেন যে, চিন –এমনকি একটা দেশই নয়, একটা সম্পূর্ণ সভ্যতা, যা বিশ্বকে দেখাতে পেরেছে ফলপ্রসূ ও বুদ্ধি সঙ্গত উন্নয়নের পথ, যা পশ্চিম পারে নি. তবে এই কথা সত্য যে, এই পথ কি দিয়ে তৈরী তা নিয়ে অবশ্য লেখক খুব কমই বলেছে ও বাস্তবে তা বরং করেছেন নেতিবাচক উদাহরণ দিয়ে. এই রকমের একটা উদাহরণ হল ভারত ও তার ক্ষতিকারক পশ্চিমের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিণতি নিয়ে, যা ভারত দেশকে দারিদ্র, দুর্নীতি, অপরাধ ও সন্ত্রাসের পথে নিয়ে যাচ্ছে.

ভারতকে শুধু গণতন্ত্রই আধুনিক করতে সক্ষম হবে না নাম দিয়ে এক প্রবন্ধে, যা এই বছরের ২৪শে অক্টোবর প্রকাশিত হয়েছে চিনের গ্লোবাল টাইমস সংবাদপত্রে, সেখানে পর্যবেক্ষক ডিন গান তারই সঙ্গে জোর দিয়ে বলেছেন যে, “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা নিয়ে ভারতের বিজ্ঞানীরা এত বেশী গর্বিত হচ্ছেন, তা বেশী করেই দেশের উত্পাদনের উন্নতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে”. তাঁর মতে, শুধু উত্পাদন বৃদ্ধি করেই দেশের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব, যা ক্রমশ শহর কেন্দ্রিক সমাজে বেকারত্বের সৃষ্টি করেছে.

ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা নিজেদের তরফ থেকে স্বৈর তন্ত্রের বিপদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন. এই বছরে প্রকাশিত “প্যাক্স ইন্ডিকা: একবিংশ শতাব্দীতে ভারত ও বিশ্ব” নামের বইতে ভারতীয় লোকসভার সদস্য ও ভারতের প্রাক্তন উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী শশী থারুর চিনের আধুনিকীকরণের সাফল্যের প্রতি যথার্থ মর্যাদা দিয়ে মত প্রকাশ করেছেন যে, “ড্রাগন সেই জায়গায় আটকে যেতে পারে, যেখানে হাতি স্বচ্ছন্দে পার হয়ে যায়”. বেজিং, তাঁর মতে, আগে হোক বা পরেই হোক এমন এক পরিস্থিতির সামনে পড়বে, যখন এক নায়ক তন্ত্র আর কাজ করবে না. থারুর বহু মতবাদ ও গণতন্ত্রকে এক রকমের মূল্যবোধ বলে মনে করেছেন, যা ভারতের সাফল্যের কারণ হয়েছে. তিনি স্বীকার করেছেন যে, ভারতে বহু বড় সমস্যা রয়ে গিয়েছে, কিন্তু জোর দিয়ে বলেছেন যে, গণতন্ত্রই ভারতকে উপায় করে দেবে একই দেশে একেবারেই বহু রকমের জন গোষ্ঠীকে একসাথে থাকার ও ভারতীয়দের কল্যাণ বৃদ্ধি করবে.

এই বিতর্ক নিয়ে কি বলা যেতে পারে? চিনের অর্থনীতির সংশোধনে সাফল্য সত্যই তাক লাগানো. ভারতীয় অর্থনীতিও একই সঙ্গে স্থিতিশীল ভাবেই উন্নত হচ্ছে. ভারতীয় শহর গুলি আজ চিনের শহর গুলির ২০ ২৫ বছর আগের মতই দেখতে. একই সময়ে যদি বর্তমানে ভারতের পরিস্থিতিকে চিনের সঙ্গে তুলনা না করে, করা হয় ভারতেরই ২০ -২৫ বছর আগের অবস্থার সঙ্গে, তবে প্রগতি স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাবে. তাছাড়া, কিছু দিন আগের অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখিয়ে দিয়েছে যে, ভারতের অর্থনীতি, বিশেষ করে দেশের আভ্যন্তরীণ বাজারের দিকে লক্ষ্য রাখার ফলে, চিনের চেয়ে অনেক ভাল ভাবেই বিশ্বের সমস্যা থেকে রক্ষা পেয়েছে, বরং চিনই তাদের অর্থনৈতিক সংশোধনের একেবারে শুরু থেকেই প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই রপ্তানীর উপরে নির্ভর করেছে.

চিনের সংশোধনের অতি বিখ্যাত সব ফলাফল সেই মূল্যের কারণেই ম্লান হয়েছে, যা তার জন্য মূল্য হিসাবে ধরে দিতে হয়েছে – পরিবেশের ভয়াবহ অবস্থা, বহু কোটি লোকের ঘর বাড়ী ছেড়ে যেতে বাধ্য হওয়া, যা দেশের প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের অঙ্গুলি হেলনে করতে হয়েছে নতুন বৃহত্ শিল্পের জায়গা হিসাবে নিজেদের ভিটে মাটি ফেলে রেখে, শহর ও গ্রামের বাসিন্দাদের ভিতরে আয়ের বিশাল পার্থক্য, আর দেশের সমুদ্র তীরবর্তী ও ভিতরের এলাকার মধ্যে তফাত, গরীব ও ধনীর মধ্যেও প্রকট হওয়া অসাম্য ইত্যাদি দিয়ে. এই সব সমস্যা দেশের নেতৃত্ব সমাধান করছেন, কিন্তু এখানে প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষ্যণীয় হয়েছে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি.

ভারতের গণতান্ত্রিক ধরণ স্থিতিশীল. দেশ যে ভাবেই উন্নতি করুক না কেন, খুবই কষ্টকর হবে কল্পনা করা যে, সেখানে সরকারকে ফেলে দেওয়া হবে কোন রকমের বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে. বিভিন্ন দল ও জোট একে অপরকে প্রশাসনে বদল করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাল্টাবে না, তা স্থিতিশীল আর এই স্থিতিশীলতা দিয়েছে গণতন্ত্র এবং আইনের সর্বোপরি অবস্থানই. স্বৈর তান্ত্রিক চিনে যে কোন ধরনের অসন্তোষ সঙ্গে সঙ্গেই দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে লক্ষ্য করে করা হয়ে থাকে. যতদিন পর্যন্ত প্রশাসন অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও দেশের মানুষের সমৃদ্ধি বজায় রাখতে পারছে, ততদিন তাদের জন্য মনে তো হয় না যে, কিছু ভয় করার মতো রয়েছে. কিন্তু বৃদ্ধি অনন্ত কাল ধরে তো চলতে পারে না. আর যেই চিনের অর্থনীতি সমস্যার সমানে পড়বে, প্রশাসন টলমল করে উঠতে পারে. সভ্যতার বিষয়ে মূল চিন ভূখণ্ডের কাছাকাছি দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান এই পথ পার হয়ে এসে পশ্চিমের গণতান্ত্রিক পথই ধরেছে. যদি চিন তার নিজের পথেই চলে, তবে খুব একটা স্পষ্ট নয় যে, বিখ্যাত “চৈনিক পথের” থেকে কি বাকী রয়ে যাবে, এই কথাই লিখেছেন আলেকজান্ডার লুকিন.