মানবসমাজের সভ্যতা যুদ্ধের হুমকি রয়েছে. এই রকমের একটা ঘোষণা ১৯৯০ সালের শুরুতে বিশ্বকে বলে সাবধান করেছিলেন আমেরিকার রাজনীতিবিদ স্যামুয়েল হান্টিংটন. হান্টিংটনের মত অনুযায়ী ঠাণ্ডা যুদ্ধের শেষে মানব সমাজ আটটি সভ্যতায় বিভক্ত হতে শুরু করেছে: পশ্চিমের সভ্যতা, যার পুরোভাগে রয়েছে আমেরিকা, চিনের কনফুশিয়স ধর্মাবলম্বী সভ্যতা, জাপানের, মুসলমানদের, হিন্দুদের, লাতিন আমেরিকার, আফ্রিকার ও পূর্বের স্লাভনিক এবং অর্থোডক্স স্লাভনিক সভ্যতা, যার পুরোভাগে রয়েছে রাশিয়া. এই সভ্যতা গুলি বর্তমানে নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে থাকার জন্য. আর যেখানে তারা শারীরিক ভাবে একে অপরের সঙ্গে স্পর্শের মধ্যে আসছে, সেখানেই রক্তপাত হবে. আর এই রক্ত, প্রফেসর নির্দেশ করেছেন যে, এখনই পাত করা হচ্ছে. নিকটপ্রাচ্যে, বালকান দেশ গুলিতে, ককেশাসে, মধ্য এশিয়াতে, হিন্দুস্থানে.

সভ্যতার সংঘর্ষ সংক্রান্ত তত্ত্ব সারা বিশ্বে প্রচার করা হয়েছে. কিন্তু বাস্তবে কি পরিস্থিতি সেই রকমের? যদি আমরা দেখি সভ্যতার বর্তমান পরিস্থিতিতে, তবে দেখতে পাবো যে, সেখানে থাকা সমস্ত প্রজাতির স্বার্থ মোটেও একই ধরনের নয়. আর সভ্যতার কোন রকমের স্বার্থ বিষয়ে সহমতে আসা ও তার বাস্তবায়নের জন্য কোনও প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থাও নেই. সভ্যতার ঐক্যবদ্ধ কোনও প্রশাসন, পার্লামেন্ট, সামরিক বাহিনী, গুপ্তচর বাহিনী ইত্যাদি নেই. তাই হান্টিংটনের তত্ত্বের সততা যাচাই করার জন্য বিচার করে দেখা দরকার যে, নিকট ও মধ্য প্রাচ্যে কোনও মুসলিম বৃহত্ রাষ্ট্র গঠিত হচ্ছে কি না, যা তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব, আফগানিস্তানের ইত্যাদির মতো দেশ গুলিকে একত্রিত করতে সক্ষম. সেই রকমের কোনও গঠন অন্তত আসন্ন ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে না.

জাতিগত রাষ্ট্র, সভ্যতার সঙ্গে তুলনা করলে বরং বেশী স্থিতিশীল স্বার্থের সংখ্যা একত্র করতে সক্ষম ও তাদের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাও এই কাজের জন্য রয়েছে, যা নিয়মিত ভাবে এদের স্বার্থকে গঠন করছে, আর তারপরে বাস্তবে তা কার্যকরী করে ও প্রয়োজনে রক্ষাও করে – রাষ্ট্রের একক প্রশাসন রয়েছে, পার্লামেন্ট রয়েছে, সামরিক বাহিনী রয়েছে, গুপ্তচর ও বিশেষ বাহিনী রয়েছে. আর রাষ্ট্র সব সময়েই কাজ করে নিজের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই, যা বহু মাত্রিক ও অনেক সময়েই সভ্যতা ও অন্যান্য আকর্ষণের সঙ্গে মেলে না. তাই রাষ্ট্র প্রায়ই প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ও বিরোধের বুত্পত্তি করে, যারা এমনকি তাদের সঙ্গে প্রজাতি, ধর্ম ও অন্যান্য আরও অনেক বিষয়ে একই রকমের.

যদি হান্টিংটনের তত্ত্ব অনুযায়ী সভ্যতার সংঘর্ষ নিয়ে ভাবা হয়, তবে রাশিয়ার উচিত্ চিনের সঙ্গে বিরোধের মধ্যে থাকা. চিন – এটা অন্য ধরনের সভ্যতা, খুবই শক্তিশালী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আর এটাও ঠিক যে, তারা আবার ভৌগোলিক ভাবেই রাশিয়ার প্রতিবেশী এবং সীমান্ত ভাগ করে. তা স্বত্ত্বেও সমস্ত সোভিয়েত দেশ পতনের পরের সময় ধরে ও আজ প্রায় দুই দশক ধরেই চিনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক রয়েছে সব সময়েই ভালোর দিকে, আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ ভাবে সহযোগিতা করে থাকি. তা হচ্ছে কেন? খুবই সাধারন কারণে: রাশিয়া ও চিনের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ মূলতঃ একই রকমের বলে.

আর ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক জটিল ও তাকে কোন ভাবেই ঠিক করা যাচ্ছে না. আর এটাও হচ্ছে সেই ক্ষেত্রে, যেখানে ইউক্রেন ও রাশিয়ার সম্মিলিত ঐতিহাসিক ও প্রজাতিগত উত্স রয়েছে, তারা একই সভ্যতার মানুষ, তাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধও একই ধরনের এবং কয়েক শতক ধরেই তারা একই দেশের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ সাংসারিক ও পরিবার গত বন্ধনের মধ্যে ছিল. কারণ স্পষ্ট: রাশিয়া ও ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে. আমাদের সরকারি স্বার্থও ধাক্কা খেয়েছে জর্জ্জিয়ার ও সেখানের জনগনের স্বার্থের ক্ষেত্রে, আর তার ফলে এই ধরনের সভ্যতার ক্ষেত্রে নিকট হওয়া স্বত্ত্বেও রাশিয়ার সম্পর্ক অশান্ত.

এই সবেরই অর্থ এই নয় যে, মস্কো কিয়েভ ও তবিলিসির সঙ্গে চিরকাল ঝগড়াই করবে. রাষ্ট্রের আগ্রহ সময়ের সঙ্গে পাল্টাতে পারে. এই কথা ঠিক যে, আন্তর্প্রজাতি দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে হিংসার ঝলক রয়েছে. ঠিক একই রকম ভাবে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বের “সোনালী শত কোটি” মানুষের সঙ্গে বাকী কম ভাল করে থাকতে পারা মানুষের মধ্যে লড়াইয়ের চেহারা, যা হচ্ছে নানা প্রজাতির প্রতিনিধিদের মধ্যে ও ধর্মের মানুষদের মধ্যে. মানুষের পক্ষে একেবারেই স্বাভাবিক হল একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ও সংঘর্ষ করা. এই রকমই ছিল, আছে ও সব সময়েই থাকবে. কিন্তু আমরা যদি চাই বিশ্বের বিকাশের বিষয়ে কোন রকমের ক্ষেত্রে বুঝে উঠতে, তবে আমাদের উচিত্ হবে সেই খান থেকেই এগোনোর, যে একবিংশ শতাব্দীর প্রধান কার্যকরী চরিত্র থেকে যাচ্ছে জাতিগত রাষ্ট্র গুলিই. আর তাদেরই ব্যবহার থেকে আগামী ইতিহাসের ধারা নির্ণিত হবে.