"আরব বসন্ত" – এটা সেই বীজের অঙ্কুর, যা জর্জ বুশ জুনিয়র রোপণ করেছিলেন, যখন তিনি তাঁর “বৃহত্ নিকট প্রাচ্যের” ধারণা পেশ করেন ও এই সমস্ত এলাকার গণতান্ত্রিক করণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন. রাশিয়ার সংবাদপত্রে সাক্ষাত্কারের সময়ে এই ভাবেই নিকটপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ. উল্লেখযোগ্য হল যে, এই ঘোষণা মূলগত ভাবে সেই সমস্ত মূল্যায়নের সঙ্গে মেলে না, যা বর্তমানে নিকটপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে অবিরত দিয়েছেন ও দিয়েও যাচ্ছেন বহু বিশেষজ্ঞ, যাঁরা এটাকে একেবারেই স্বাভাবিক নাগরিক আন্দোলন বলে চালাতে চাইছেন. সের্গেই লাভরভ, তাঁর পদের দিকে লক্ষ্য করলে, বহু রাজনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকদের চেয়ে অনেক বেশী তথ্য রাখেন এই আরব বসন্তের প্রকৃতি নিয়ে. আর এটাও ঠিক যে, কূটনৈতিক ভাষা থেকে স্বেচ্ছায় সরে আসাও অনেক কিছুই বলে দেয়.

কি ধরনের বাস্তব ঘটনা ও তথ্য রাশিয়ার মন্ত্রীকে এই ধরনের ঘোষণা করতে সম্মতি দিয়েছে? প্রাচ্য বিশারদ ভিয়াচেস্লাভ মাতুজভ এই নিয়ে নিজের ধারণা ব্যক্ত করে বলেছেন:

বহু আরব দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন করানো হয়েছে এক পরিকল্পনা অনুযায়ী, যা বাইরের শক্তিরাই তৈরী করেছে. এখন খোলাখুলি ভাবেই বহু দলিল পাওয়া যাচ্ছে, যা এই তত্ত্বকে সমর্থন করে. যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, নিজের দেশের সম্বন্ধে বিশ্ব জন সমাজের ধারণার পরিবর্তন করানোর, যাতে দেখানোর জন্য ঐস্লামিক বিশ্বের সঙ্গে খোলাখুলি বিরোধের বদলে, একটা “গণতান্ত্রিক মুখোশ” পরে, আসলে নিজেদের আগের ইসলাম বিরোধী মুখকেই লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়. এর জন্য তৈরী করা হয়েছিল এক বিরাট সংখ্যায় পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত কাজকর্মের পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়নের জন্য বহুজাতিক কর্পোরেশন গুলি দায়িত্ব নিয়েছিল, এই কাজের জন্য যারা জড়ো হয়েছিল এই কারণেই তৈরী “কূটনৈতিক কারবারের জন্য ব্যবসায়িক সঙ্ঘে”. তাতে প্রবেশ করেছিল ম্যাকডোনাল্ডস, রথশিল্ড কর্পোরেশন, আমেরিকান এয়ারলাইন্স, বোয়িং ও আরও অনেক গুলি কম বিখ্যাত নয় এমন কোম্পানী. তাঁরাই অর্থ যোগান দিয়েছে আমেরিকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে নিকটপ্রাচ্যের দেশ গুলির নাগরিকদের প্রশিক্ষণের, যারা সেখান থেকে শিখে এসেছে আমেরিকার সহযোগী হোক অথবা নাই হোক, তবুও কি করে তাদের নিজেদের দেশের প্রশাসনের পতন ঘটানো যায়”.

বোঝাই যাচ্ছে যে, এখানে কথা শুধু মানুষকে শিখিয়ে দেওয়ারই হচ্ছে না. ইন্টারনেটে পাওয়া যেতে পারে যেমন, আরব ভাষায় ছোট বই, কি করে প্রতিবাদ আন্দোলন আয়োজন ও বাস্তবে করা সম্ভব, কি করে পুলিশের বিরুদ্ধে কাজ করা যায় আর কি ধরনের কাপড় জামা মিটিংয়ে পরে যাওয়া উচিত্. আর এটা হল যখন কথা হচ্ছে কম বেশী শান্তি পূর্ণ বিদ্রোহের ক্ষেত্রে. সিরিয়ার মতো ঘটনার জন্য আলোকপাত করতে পারে আমেরিকার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের করা টেলিগ্রাম, যা “উইকিলিক্স” সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে. তাতে অংশতঃ, বিবরণ দেওয়া হয়েছে বিরোধীরা কারা, কোন ধরনের আন্দোলন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করার ক্ষমতা রাখে, আর কারা পারে না.

কিন্তু আমেরিকার লোকদের আরব ও ঐস্লামিক বিশ্বে এই ধরনের কাজ কারবার করে কি লাভ হবে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অন্তত তাদের নাটের গুরু ব্রিটিশদের উক্তি “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতি বাক্যের মধ্যেই. সেই সব প্রক্রিয়া যা আজ টিউনিশিয়া, ইজিপ্ট, লিবিয়া, ইয়েমেনে হয়েছে ও যা এখন হচ্ছে সিরিয়াতে তা কম করে হলেও বহু দিনের জন্যই বিশ্ব রাজনীতিতে এই সব দেশের প্রভাব কমিয়ে দেবে. তার ওপরে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজি নির্মাতাদের ধারণা অনুযায়ী এই ধরনের ভাগ্য, শুধু একটা দেশের কপালেই লেখা নেই. এটাই হচ্ছে সেই “বৃহত্ নিকটপ্রাচ্যের” ধারণা, যার কথা বলেছেন সের্গেই লাভরভ. এই দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে ভিয়াচেস্লাভ মাতুজভ বলেছেন”

নতুন নিকটপ্রাচ্যের সীমান্ত তৈরী নিয়ে তত্কালীন পররাষ্ট্র সচিব কণ্ডোলিজা রাইস ২০০৬ সালেই খোলাখুলি ভাবেই বলেছিলেন, যখন ইজরায়েলের বিমান বাহিনী লেবাননে বোমা বর্ষণ করছিল. তিনি তখন বলেছিলেন এই রকম:“যা আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি লেবাননে, তা আসলে নানা বংশের মধ্যে যুদ্ধের শুরু, যার ফলে “নতুন নিকটপ্রাচ্য জন্ম নেবে””. এর অর্থ হল যে, আমেরিকার পরিকল্পনার মধ্যেই শক্তি প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত রয়েছে, সীমান্তের রেখা বদলের ইচ্ছা রয়েছে ও এই এলাকার রাজনৈতিক কাঠামোই বদলে দেওয়ার ইচ্ছা লুকিয়ে আছে. তাদের ছুরির ডগায় আমরা দেখতেই পাচ্ছি যে, ইতিমধ্যেই পড়েছে টিউনিশিয়া, ইজিপ্ট, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়া, কিন্তু এতেই প্রক্রিয়া শেষ হবে না. আর তার জন্য রয়েছে আবারও দলিলে লেখা সমর্থন. পরিকল্পনাতে নাম করা হয়েছে সৌদি আরবের কথাও. তারা নতুন নিকটপ্রাচ্যের মানচিত্রে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী কর্নেল রাল্ফ পিটার্সের তৈরী, তাতে তিনটি রাষ্ট্রে বিভক্ত. এটা সুন্নী গোষ্ঠী, যাদের রুব- এল- হালি মরুভূমিতে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, মক্কা ও মদিনার জায়গায় এক রকমের “ঐস্লামিক ভ্যাটিকান” তৈরী করা আর বিশাল শিয়া মুসলিম রাষ্ট্র, যা সৌদি আরবের পূর্বের এলাকা এবং বর্তমানের ইরাক ও ইরানের অঞ্চল দিয়ে তৈরী. আজ বাহরিনে ধর্মের আভ্যন্তরীণ বিরোধ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সংঘর্ষ ঘটিয়ে. আর যদিও এই কারণে ইরানকে দোষ দেওয়া হচ্ছে, তবুও পশ্চিমের বিশেষ গুপ্তচর বাহিনীই যে এই সব ঘটনায় হস্তক্ষেপ করছে, সেই ধরনের সম্ভাবনাকেও বাদ দেওয়া যায় না. কিন্তু কথা হচ্ছে শুধু পারস্য উপসাগরীয় এলাকা নিয়েই নয়. একই ধরনের ভাগ্য অপেক্ষা করছে সমগ্র নিকট প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ক্ষেত্রেও”.

বৃহত্ নিকটপ্রাচ্যের পুনর্গঠনের পরিকল্পনা কোনও হলিউডের সিনেমাতে দেখানো নিষ্ঠুর জিনিয়াসের ধারণা বলে মনে হতে পারে. কিন্তু সত্য লুকিয়ে রয়েছে যে, এই ধারণা ইতিমধ্যেই বাস্তব আকার ধারণ করছে. এটা আমরা দেখতেই পাচ্ছি আজ প্রায় দুই বছর ধরে চলা “আরব বসন্তে”.