নভেম্বর মাসের শেষে কাতার রাষ্ট্রের রাজধানী দোহা শহরে রাষ্ট্রসঙ্ঘের আবহাওয়া পরিবর্তন সংক্রান্ত সম্মেলন হতে চলেছে. বিশ্বের উষ্ণায়ন চলছে. আর তা কি করে থামানো হবে, কেউই সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না. বিভিন্ন রকমের পথের সন্ধান দেওয়া হচ্ছে এই সমস্যার সমাধানে, তার মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় - ভূ- প্রযুক্তি কৌশল (জিওইনঞ্জিনিয়ারিং). এই ব্যাপারে আবার বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, আবহাওয়া বিশারদদের মধ্যে সেই রকমের লোকও রয়েছেন, যারা মনে করেন যে, উষ্ণায়নের সঙ্গে লড়াই করার কোনও মানে হয় না. এই সমস্যার বিস্তার নিয়ে আবহাওয়ার বিশ্বজোড়া ইচ্ছাও বাতিক নিয়ে “রেডিও রাশিয়ার” সঙ্গে আলোচনা করেছেন এই নিয়ে যাঁরা খুব ভাল জানেন সেই সব বিশেষজ্ঞরা.

রাসায়নিক প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটির ভিতরে না গিয়ে, মনে করিয়ে দিই যে, বিশ্বের উষ্ণায়ন নিয়ে চলতি তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, এটা হয় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের জন্যই. এই গ্যাস মানুষের জীবন যাত্রার জন্যই তৈরী হয়, আর তা তৈরী হচ্ছে বর্তমানে বিপুল পরিমানে ও বিশ্বের পরিবেশে তা বর্জন করা হচ্ছে. কিন্তু, এই রকমের একটা মতও রয়েছে যে, মানুষ নীতিগত ভাবে বিশ্বের আবহাওয়াতে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে না, আর উষ্ণায়ন নিয়ে সমস্ত কথাবার্তাই - এটা যারা অতি রকমের অশনি সঙ্কেত দিতে ভালবাসেন, তাঁদের অথবা রাজনীতিবিদ বা কারখানার মালিকদের ব্যবসার খাতিরে “ষড়যন্ত্র” মাত্র.

রেডিও রাশিয়াকে দেওয়া এই রকমেরই একটা সাক্ষাত্কারে মস্কোর জ্বালানী ইনস্টিটিউটের বিশ্ব জ্বালানী সমস্যা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ল্যাবরেটরীর প্রধান প্রফেসর ভ্লাদিমির ক্লিমেঙ্কো বলেছেন এই কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস আবহাওয়াতে বর্জন আবহাওয়ার পরিবর্তনে কি করে, তার উত্তরে যেমন বলা যেতে পারে যে, “প্রভাব ফেলে”, তেমনই বলা যায় যে, “ফেলে না”. তাই তিনি বলেছেন:

মনে করুন যে, গত ১৫ বছরে বিশ্বে আবহাওয়াতে কার্বন ডাই অক্সাইড বর্জনের পরিমান বেড়েছে শতকরা ২০ ভাগ আর তাপমাত্রা কমেছে. তাহলে এর থেকে কি বোঝা গেল?এই আবহাওয়াতে বর্জনের উপরে তাপমাত্রার হেরফের হয় না? তা বলা যায় না, তাই এই দুটোর মধ্যে কোনও সমান চিহ্ন বসানো যেতে পারে না, আবার অন্যদিকে এই বর্জন গুলি নিজে থেকে কোনও প্রভাব ফেলে না, প্রভাব ফেলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব”.

বিশ্ব বন্য প্রকৃতি তহবিলের “আবহাওয়া ও জ্বালানী” প্রকল্পের প্রধান আলেক্সেই ককোরিন “রেডিও রাশিয়াকে” ঘোষণা করেছেন যে, মানুষের জীবন যাত্রার ফলে উত্পন্ন বস্তুই বিশ্বের পরিবেশের উপরে বাজে প্রভাব বিস্তার করছে ও এটা এহ বাহ্য বিষয়, তাই তিনি আরও বলেছেন:

অন্য ব্যাপার হল যে, এটা মোটেও একমাত্র কারণ নয়, যা আবহাওয়ার পরিবর্তনের জন্য দরকার. আরও রয়েছে প্রাকৃতিক শৃঙ্খল ও তার চক্রাকার পরিবর্তন, প্রাথমিক ভাবে মহা সমুদ্রের পরিবর্তন, এছাড়া রয়েছে অন্যান্য জৈব কারণে উদ্ভূত পরিবর্তন, অন্যান্য সব গ্রীন হাউস এফেক্ট ঘটানোর উপযুক্ত গ্যাস নির্গম হওয়া ইত্যাদি. তার উপরে আবার এই ধরনের সব রকমের বর্জন প্রক্রিয়া নানা রকম ভাবে আবহাওয়ার উপরে প্রভাব ফেলে থাকে, কিছু করে তাপমাত্রা বাড়ার জন্য, সেই গুলির সংখ্যাই বেশী, কিছু আবার উল্টো, ঠাণ্ডা করে দেয়. কিন্তু মানুষের তৈরী গ্রীন হাউস এফেক্ট যে তাপমাত্রা, আবহাওয়া বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশের প্রচুর পরিবর্তনের জন্য দায়ী, এটা একেবারে ঠিক কথা”.

এই কিছু দিন আগে পর্যন্তও বিশ্বের তাপমাত্রা বদল, উষ্ণায়ন ইত্যাদি নিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছিল মোকাবিলার. কম করতে চাওয়া হচ্ছিল গ্রীন হাউস এফেক্ট, সমস্ত রকমের সম্ভব পরিবেশ দূষণের উত্স বন্ধ করতে চাওয়া হচ্ছিল. এই কাজ করা হচ্ছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘের আবহাওয়া সংক্রান্ত কনভেনশনের আওতায় ও সেই কারণে নেওয়া পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা, যা কিয়োটো প্রোটোকলে বলা হয়েছিল, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট কার্যকরী নয়.

অন্য ধরনের সিদ্ধান্তের মধ্যে বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেছেন যে, কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে বায়ুমণ্ডলেই পরিত্রাণ পেতে হবে অথবা সরাসরি বিশ্বকেই সূর্যের অতিরিক্ত আলোর থেকে বাঁচাতে হবে. কিন্তু মানুষের প্রাকৃতিক সংযোজন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের পরিণাম আমাদের কাছে অজ্ঞাত রয়েছে.

নিজের পক্ষ থেকে প্রফেসর ভ্লাদিমির ক্লিমেঙ্কো এক চিরন্তন প্রশ্ন রেখেছেন – বিশ্বের উষ্ণায়নের সঙ্গে লড়াই করার কি প্রয়োজন রয়েছে? উত্তরে আলেক্সেই ককোরিন বলেছেন:

আমার দৃষ্টিকোণ থেকে - কোন দরকার নেই. কারণ আমার ধারণা মতো, আগামী দশ বছরে বিশ্বের তাপমাত্রা বিগত তিরিশ বছরে যে হারে বেড়েছে ও যা আমাদের এত ভয়ের কারণ হয়েছে, তার থেকে কম গতিতেই বাড়বে. এর একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল যে, সূর্যের সক্রিয়তা বর্তমানে হ্রাসের দিকে. সুতরাং, কমে যাচ্ছে তাপের পরিমানও, যা সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে. এই ভাবেই সূর্য অনেকটাই বেড়ে যাওয়া গ্রীন হাউস এফেক্টের থেকে রেহাই করে দেবে”.

এই সব ফ্যাক্টরের যোগ ফলেই ক্লিমেঙ্কো মত এই রকমের যে, পরবর্তী কালে আগামী কয়েকশো বছরে বিশ্বের তাপমাত্রা অনিবার্য ভাবেই বাড়বে. কিন্তু বিশ্বের সমগ্র সভ্যতার জন্য তার মাত্রা এক সাথেই বিপজ্জনক হবে না. একই সময়ে যদি রাশিয়ার বেশীর ভাগ অংশের জন্যই বিশ্বে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার জন্য এক গুচ্ছ ইতিবাচক ব্যাপার হয়, তবে আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার বহু দ্বীপ পূঞ্জে ও সমুদ্র তীরবর্তী রাষ্ট্র গুলিতে এর পরিনাম হতে পারে মারাত্মক. অর্থাত্ নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ক্ষেত্রেই বিশ্বের উষ্ণায়নের ফল ইতি বা নেতিবাচক হবে, তা বলা যেতে পারে.

আর সত্যিই তো, অক্টোবর মাস এখনও শেষ হল না আর মস্কোর কেন্দ্রে আজই হয়ে গেল এই বছরের প্রথম তুষার ঝড়.